যুগবার্তা ডেস্কঃ আবারও খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেল জাতীয় সংসদে। এবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে এমন প্রায় ৯ হাজার গ্রাহকের তথ্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এদের মধ্যে দুই হাজার গ্রাহক খেলাপি, যাদের কাছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা মন্দ ও কু-মানের খেলাপি হয়ে আটকে আছে।

বুধবার জাতীয় সংসদের বৈঠকে লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে মুহিত এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, গত ১০ বছরে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা আট হাজার ৭৯১ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ লাখ ৬ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা মন্দ ও কু মানের খেলাপি। দেশের বিভিন্ন এলাকার এক হাজার ৯৫৬ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের এ অর্থ আটকে আছে।

এর আগে অর্থমন্ত্রী সংসদে শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপির তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে থাকার তথ্য উঠে আসে। এবারের তালিকায়ও ঘুরেফিরে শীর্ষ খেলাপিদের নাম চলে এসেছে। তবে অর্থমন্ত্রীর প্রকাশ করা তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি পরিমাণে অর্থ আটকে আছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের খেলাপিদের বেশিরভাগই ইচ্ছেকৃত খেলাপি। ব্যবসা-বাণিজ্যে এমন কোনো কিছু গত কয়েক বছরে হয়নি যে, ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এই বিপুল সংখ্যক খেলাপি হবে। ঋণ নিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করা, বিদেশে পাচার করার মতো ঘটনা এখানে ঘটে। আর চট্টগ্রাম ও খাতুনগঞ্জ কেন্দ্রীক যে খেলাপি ঋণ তার সিংহভাগই ইচ্ছেকৃত। কারণ এখানকার অনেক ব্যবসায়ী ঋণের অর্থ জমি কেনাসহ রিয়েল স্টেট খাতে বিনিয়োগ করেছে। গত তিন-চার বছর ধরে রিয়েল স্টেটের দাম বাড়েনি। ফলে খেলাপি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) ব্যাংকগুলো থেকে তথ্য নিয়ে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। আর ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ১০ কোটি টাকার ওপরের ঋণ ও ঋণ খেলাপির যে তথ্য দিলেন,তা গত নভেম্বরভিত্তিক। এ তথ্যও সিআইবি থেকে নেওয়া।

দশ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে- মোহাম্মদ ইলিয়াস ব্রাদার্স, মেরিন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেম লিমিটেড, ম্যাপ স্পিনিং মিলস, বেনেটেপ ইন্ডাস্ট্রিজ, আনোয়ারা স্পিনিং মিলস, চৌধুরী নিটওয়্যারস, সিদ্দিক ট্রেডার্স, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজ, আলাপ্পা কম্পোজিট টাওয়ালস, লিজেন্ড হোল্ডিংস, হলমার্ক ফ্যাশন, মুন্নু ফেব্রিপ, ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল, ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিপ, শাহারিশ কম্পোজিট টাওয়ালস, কেয়া ইয়ার্ন শিলস, সালেহ কার্পেট মিলস, ফেয়ার ইয়ার্ন প্রোসেসিং, হেল্পলাইন রিসোর্স এবং বিসমিল্লাহ টাওয়ালস লিমিটেড। এছাড়া কম্পিউটার সোর্স, আশিক কম্পোজিট, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স, সিপ সিজন অ্যাপার্টমেন্ট, তানিয়া এন্টারপ্রাইজ, সোনালী জুট মিলস, কেয়া নিট কম্পোজিট, ওয়ালমার্ট ফ্যাশন, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ (প্রা.) লিমিটেড, কেয়ার স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, কেয়া স্পিনিং, কেয়া কটন মিলস, টেকনো ডিজাইন।

সরকারি দলের সাংসদ শামসুল হক চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বিগত দুই বছরে দেশে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা জানান। যদিও সে সংখ্যাকে লজ্জাজনক বলে মনে করেন তিনি। মুহিত বলেন, দেশে বর্তমানে করদাতার সংখ্যা ৩১ লাখ। এটা দেশের জন্য লজ্জাজনক। কারণ ১৬ কোটি মানুষের দেশে করদাতার সংখ্যা হওয়া উচিত ১ কোটি ৬০ লাখ। এটা বাড়ানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে করদাতার সংখ্যা ৫০ লাখে উন্নীত করার টার্গেটের কথাও জানান তিনি।-সমকাল