অজানা ভুবনের না জানা রহস্য!!!

15

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ মাঝে মধ্যে আমার অবুঝ মনে উদ্ভট রকমের নানা প্রশ্নের জন্ম হয়। মন সাংঘাতিক রকমের দূর্বল হলেই এমনটা হয়। ইদানীং দূর্বল হতে তেমন জোরালো কারণও লাগে না। কিছু একটা ঘটলেই দূর্বল হয়। সহজ সরল সমীকরণের দিকে না যেয়ে মন বাঁকা পথে হাঁটে। আর গন্ধ খোঁজে। গন্ধ খোঁজে রহস্যের। সব কিছুতেই খোঁজে। না খোঁজলেও চলে। এরপরও শুধু শুধু খোঁজে। বড় অদ্ভুত আচরন আমার মনের। বয়স যতই বাড়ছে, মন আমার ততই অদ্ভুত আচরন করছে।
তবে এটাও সত্যি, এই পৃথিবীটাও বড় অদ্ভুত! বড় অদ্ভুত এর আচার আচরন, সব কিছু! বড়ই রহস্যে ঘেরা! প্রতিদিন, প্রতি মূহুুর্তে সবখানে কত কিছু ঘটছে। যার সামান্যই কেবল আমরা বুঝতে পারি, জানতে পারি। বাকী সব থেকে যায় রহস্যে ঘেরা। হাজারো ঘটনা আর হাজারো প্রশ্নের পাওয়া যায় না কোন সদুত্তর। বড়রা পায় না, ছোটরাও পায় না। অবশ্য না পেলেও বড়রা তেমন প্রশ্ন করে না। কিন্তু ছোটরা করে। হাজারটা প্রশ্ন করে। আমার শোনিমও করে। সেদিন খুব মন খারাপ করে বলছিল, বাংলাদেশের বড় বড় মেয়রগণ ব্রেইনষ্ট্রোকে মরে যায় কেন?
আমি উত্তর দিতে পারিনি। জানা নেই বলেই দিতে পারিনি। এটা বাংলাদেশের কোন দুর্ভাগ্য কি না তাও জানি না। বাংলাদেশে বড় মেয়র কিংবা ছোট মেয়র বলে কিছু আছে কিনা সেটাও জানি না। কেবল জানি, বিখ্যাতরা এদেশে বেশীদিন বাঁচেন না। তাঁরা আসেনই অল্প সময়ের জন্যে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে এক সাথে একই নামে চারজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। হুমায়ুন নামের চার ব্যক্তি। হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন ফরিদী, হুমায়ুন আজাদ এবং হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তাঁরা প্রত্যেকেই যে যার জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত। অত্যন্ত সুনামের সাথেই প্রতিষ্ঠিত। তাঁদেরকে চেনেন না এমন লোক সারা বাংলায় এখনও পাওয়া মুশকিল।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী কেউকেটা আমলা থেকে প্রথমে মন্ত্রী এবং পরে সংসদের স্পীকার হয়েছেন। বেঁচে থাকলে হয়ত আরো অনেক দূর যেতে পারতেন। হুমায়ুন আজাদ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তথা প্রতিথযশা সাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যে সাংঘাতিক রকমের দখল ছিল তাঁর। বাকী দুজন মিডিয়ার মানুষ। হুমায়ুন ফরিদী তুখোড় অভিনেতা। সাড়া জাগানো অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা। বাকী জনের কথা বলাই বাহুল্য। তিনি দেশবরেন্য কিংবদন্তী হুমায়ুন আহমেদ। প্রতিটি বাঙালী হৃদয়ে তিনি আজো গেঁথে আছেন তাঁর নানান পরিচয়ে। থাকবেন আরো অনেক অনেক বছর!
দুঃখজনক হলো তাঁরা প্রত্যেকেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন অনেকটা আগেভাগেই। ক্যারিয়ার এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকাকালীন তাঁরা একে একে বিদায় নিয়েছেন। মাত্র বারো বছরের ব্যবধানে দেশসেরা এই চারজনকে বাঙালী জাতি হারিয়েছে। কাকতালীয় হলেও একই নামের চারজনকে একই সাথে পেয়ে জাতি যেমনি গর্বিত ছিল, তেমনি খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁদেরকে হারিয়ে জাতি প্রচন্ড ব্যথিত হয়েছে। আর খুঁজেছে তাঁদের একই নামের মাহাত্ম এবং অকালে অন্তরালে হারিয়ে যাবার রহস্য।
রহস্য অজানাই থেকে গেছে। রহস্য সব সময় অজানাই থেকে যায়। সমসাময়িক কালে একই নামে বাংলাদেশে আরো তিনজন ব্যক্তি ছিলেন। ছিলেন বলছি এখন একজন নেই বলে। এখন তাঁরা দুজন হয়েছেন। দুজনই তাঁদের সামাজিক অবস্থানে অত্যন্ত সুপরিচিত। একজন লেখক আনিসুল হক, অন্যজন মন্ত্রী আনিসুল হক। দুজনই প্রথিতযশা। অজানা ভুবনের না জানা রহস্য নিয়ে যত কল্পকথাই থাকুক, সবই স্রেফ কল্পকথা। একেবারেই অমূলক। পুরোটাই বাস্তবতা বিবর্জিত বলেই আমার গভীর বিশ্বাস। তবে বিশ্বাসেই স্থির থাকছি না, আল্লাহ পাকের দরবারে তাদের দুজনের জন্য দোয়াও করছি। শত বছর আয়ু দানের দোয়া।
দোয়া আনিসুল হকের জন্যেও। তিনি মেয়র আনিসুল হক। পুরো জাতিকে শোকের নদীতে ভাসিয়ে তিনি চলে গেছেন। তাঁর তিরোধানে পুরো রাষ্ট্র কষ্ট পেয়েছে। তাঁর অনেকগুলো পরিচয় ছিল। তবে সব পরিচয় হয়ত হারিয়ে গেছে মেয়র পরিচয়ের কাছে। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম তাঁকে চেনে একজন তারকাসম সফল টিভি উপস্থাপক হিসেবে। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “অন্তরালে” কিংবা “এখনই” দিয়ে তিনি বাজিমাত করেছিলেন টিভি অনুষ্ঠানের। তাঁর কথা বলা কিংবা উপস্থাপনার ধরণ একেবারেই অন্য রকম ছিল। মানুষকে কঠিনভাবে বিমোহিত করতো। এটাই তাঁর সফলতার মূল মন্ত্র ছিল। “আনন্দ মেলা” করেও তিনি সফল।
তিনি যে রাজনীতিতেও সফল হবেন এটা আমরা কখনো বুঝিনি। রাজনীতিতে আসবেন সেটাই তো ভাবনার বাইরে ছিল। তবে নব্বইয়ের দশকে একবার টিভিতে অত্যন্ত সফলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন ‘সবিনয়ে জানতে চাই’, নামক রাজনৈতিক টকশো, যাতে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের নেতারা নাগরিকদের কাঠগড়ায় হাজির হয়েছিলেন। তখনই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, যারা পারে সব পারে। তিনিও পারার দলের।
রাজনীতিতে এসেও তিনি পেরেছেন। গাবতলীর রাস্তাটা পরিষ্কার করা যাবে, কেউ ভাবেওনি, পারেওনি। তিনি পেরেছিলেন। ঢাকার মত জনবহুল নগরীতে যে পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট বানানো সম্ভব, এটা আমরা ভাবিনি। তিনি ভেবেছেন এবং বানিয়েছেন; এখন ঝকঝক করছে। কারওয়ান বাজার সাফ করার কাজ অর্ধেক হয়েছিল, থাকলে বাকিটা হতোই। উত্তরার রাস্তাঘাট সুন্দর করে ফেলেছিলেন। বিমানবন্দর সড়কের দুই ধারের দেয়ালগুলো ভেঙে দিগন্ত বড় করেছেন, সবুজ করেছেন। ওই সড়কটায় ইউলুপ বসানোর কাজ হাতে নিয়েছিলেন, যাতে যানজট না থাকে।
তার সুবিধাটা ছিল তিনি আওয়ামী লীগের মেয়র, কিন্তু আওয়ামী লীগার হিসেবে অন্যদের যে পিছুটান থাকে, সেটা তার ছিল না। দায়িত্ব পালনের সময় কাউকে পরোয়া করেননি তিনি। তার সাফল্যের মূল রহস্য ছিল দৃঢ় কমিটমেন্ট আর সাহস। সবাই বুঝে গেছেন, এই মেয়রের ঘাড় ত্যাড়া, তার সাথে পারা যাবে না। যানজট নিরসনের কাজটি মেয়রের নয়, তবু তিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে।
আনিসুল হকের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব নিজের ভাবনাকে গোঁয়ারের মত বাস্তবায়নের ক্ষমতা। মেয়র হওয়ার পর যে কোনো ঘটনায় সবার আগে ছুটে যেতেন তিনি। একবার একটা বাড়িতে আগুন লাগল, তিনি সারা রাত সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সমস্যা কখনো পাশ কাটিয়ে যাননি, মোকাবেলা করেছেন। দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপাননি। বরং অন্যের দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিতেন আগ বাড়িয়ে।
মাত্র দুই বছরের মেয়রশিপে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন আন্তরিকতা থাকলে ঢাকার মত সমস্যাসঙ্কুল, জনবহুল নগরীকেও বদলে দেয়া সম্ভব। এতেও সাংবাদিকদের তৃষ্ণা মিটতো না। তাঁর কাছে প্রত্যাশা থাকতো আরো বেশী। কড়া কড়া প্রশ্ন করতেন মাঝে মধ্যে। তবে সে সবে পাত্তা না দিয়ে সাংবাদিকদের কড়া প্রশ্নের জবাব দিতেন ততোধিক কড়া তথ্যে। আবার একান্ত আলাপচারিতায় তিনি ছিলেন সদা দিলখোলা। জায়গা মত চেপে ধরলে মুচকি মুচকি হাসতেন; আর বলতেন, কয়টা দিন সময় দেন। দেখবেন ঢাকাকে আমি আসলেই বদলে দেবো।
আসলেই তো বদলে দিয়েছিলেন! কেবল বদলে নয়, আনিসুল হক আমাদের আফসোসও বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমনি আফসোস বাড়িয়ে ছিলেন আরো একজন। তিনিও এমন করেই চলে গেছেন। আনিসুল তো সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনরূপ সময় না দিয়ে তিনি চলে গেছেন। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি মেঝেতে পড়ে গেলেন। মাথায় গুরুতর আঘাত পেলেন। সংগা হারালেন। দেশে বিদেশে অনেক চেষ্টার পরেও আর ফিরে এলো না সে সংগা। তিনি বরিশালের অত্যন্ত জনপ্রিয় মেয়র শওকত হোসেন হিরণ। শহর উন্নয়নের মূর্তিমান প্রতীক তিনি। সবার মুখেই তাঁর প্রশংসা।
এখন সবার মুখে কেবলই আফসোস। বাংলাদেশের দুটি বড় শহরের এমন দুজন সফল মেয়র এভাবে সকল শহরবাসীর আফসোস বাড়িয়ে অচিনপুরে চলে গেছেন। সদা সমস্যাময় দুটো শহরের সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসবে এই দুঃশ্চিন্তায় তটস্থ এখন শহরবাসী। চিন্তিত তারা। কোনভাবেই এর হিসাব মিলাতে পারছেন না। কেবল পারছেন মিল অমিলটা দেখতে। মিলটা কেবল এই যে দুজনেই কর্মে সফল; আবার দুজনেই ব্রেইনষ্ট্রোকে পরাজিত হয়ে চলে গেছেন। দুজনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিদেশের মাটিতে। কী জানি এই মিলের রহস্য কোথায়! কে জানে এখানে বিধাতার খেলাটাই বা কোথায়! আমরা খুবই অসহায়। কেবল মিল অমিলের এই খেলা চর্মচক্ষে দেখতে পারি। এর অন্তর্নিহিত মর্ম বুঝতে পারি না। বোঝার কোন ক্ষমতাই নেই আমাদের!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।