নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিবর্তন কাম্য নয়

38

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান: বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে চার বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু দিন আগে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবধর্মী। এতে স্থান পেয়েছে ২০১৪ সালে সরকার গঠনের থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি চার বছরের সাফল্য ও নানাবিধ কর্মকাণ্ড। বিগত সময়ে সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল এবং আগামীর দিনগুলোতে সরকারের চ্যালেঞ্জ কী— সে সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এ বছরের শেষের দিকে অর্থাত্ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অবস্থানও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ফুটে উঠেছে। আমাদের সাংবিধানিক যে বিধি ব্যবস্থা রয়েছে, তার মধ্যে থেকেই নির্বাচন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারের কথা উল্লেখ করেছেন— যা আমাদের সংবিধানের মধ্যেই সম্ভব।

আমরা দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছি, নির্বাচন কমিশনকেই নির্বাচন পরিচালনা করতে হয়। নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশন অনেক বড় হবে। আর সরকার হবে ছোট। সরকার ছোট হবে আয়তনের দিক থেকে নয় বরং ক্ষমতার দিক থেকে। এসময় সরকার কেবল রুটিনওয়ার্ক করবে। বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচন করবে না—এমন কথা তারা বরাবরই বলে আসছে। তবে আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, বিএনপি একটি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব দিবে, সে প্রস্তাব তারা জনসম্মুখে প্রকাশ করবে। কিন্তু তার কোনো কিছুই এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। নির্বাচন যেভাবেই হোক না কেন, তা সংবিধানের বিধিবিধান মোতাবেকই করতে হবে। সংবিধান পরিপন্থী উপায়ে নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিভিন্ন দিক থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল নিয়ে কথা বলি এবং আলোচনায় লিপ্ত হই। হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা টেকেনি। এ রায়ের মূল ভিত্তি হচ্ছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি আর এক মুহূর্ত পর্যন্ত অনির্বাচিত সরকার দ্বারা শাসিত হবে না। এ রায় অনুযায়ী আমরা যে ব্যবস্থাই করি না কেন, তা সংবিধান মোতাবেক হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। আমরা দেখেছি ২০১৪ সালে যখন নির্বাচন হয়, তা কম অংশগ্রহণমূলক ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দশম জাতীয় সংসদ ভালোভাবেই স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের যেখানে যেখানে সংসদীয় ব্যবস্থা বিরাজমান, তাদের নেতৃত্বই বরং আমাদের বর্তমান সংসদে চলে আসল। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে সংসদ গতিশীল হয়।

বর্তমান সরকারের আমলে সবার আয় বেড়েছে। সকল স্তরে বেতন ভাতা, এমনকি শ্রমিক পর্যায়েও সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মানও বেড়েছে। আয় বাড়া মানেই ব্যয় বেড়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটি অবাধ, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায়, এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন না হলে সমস্যার সমাধান হবে কিনা? বর্তমানে আমাদের দশম সংসদ কার্যকর রয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর কর্মকাণ্ড নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগের কথা বলেনি। বরং এর বিতর্ক একটাই, তা হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি। আসলে যারা এই নির্বাচনের দোষ খোঁজেন, তারা কিন্তু নির্বাচনে যাননি। আমাদের নবম এবং অষ্টম সংসদ অপেক্ষাকৃত ভালো সংসদ। তথাকথিত নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে নবম এবং অষ্টম সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। নবম সংসদে বিএনপি বিরোধী দল ছিল। তারা ৭৪ শতাংশ সংসদ অধিবেশনে যোগদান করেননি। আর ৪১৮টি অধিবেশনের মধ্যে বিরোধী দলের নেতা অংশগ্রহণ করেছেন মাত্র ১০টিতে। এর আগের অষ্টম সংসদেরও একই অবস্থা, সেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৬০ শতাংশ অধিবেশনে। বর্তমান সংসদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর আগের সংসদগুলো কি কার্যকর ছিল?

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের মাধ্যমে জাতির জনকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কাজেই একটি আদর্শ নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি। সেই চেতনার একটি বড় অংশই ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন বাংলাদেশ হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে আমরা দূরে অবস্থান করছি। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পুরো বাংলাদেশকে ফের পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত করার অপচেষ্টা করা হয়। গণতন্ত্রের চেতনা কেবল নির্বাচনের মধ্যেই বন্দি থাকে। ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে, সারা দুনিয়াতেই এটিই একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আমাদের দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয় না, একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। ’৭৫ থেকে ’৯৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে বিভিন্ন সংবিধানের সংশোধনী আনা হয়েছে। সংবিধানের উক্ত বিষয়গুলো ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত। রাষ্ট্রকে বিভিন্ন ধর্মীয় রূপ চরিত্র দেওয়া হয়েছে। অর্থাত্ পুরো রাষ্ট্রকেই পরিবর্তন করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শাসনকালে যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, তারাই মন্ত্রিত্ব পায়। ক্যান্টনমেন্টে গণতন্ত্র বন্দি হয়। সেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে গণতন্ত্রকে বের করে নিয়ে আসে বর্তমান সরকার। যদি এমন হতো, যে-সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করবে, তাহলে কিন্তু এতো জটিলতা থাকত না। এখানে নির্বাচন মানে সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ এবং কাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়। এটিই সংকটের মূল কারণ। নির্বাচনের মাধ্যমে যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলই ক্ষমতায় আসত তাহলে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হতো না।

বর্তমানে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা। সেগুলো দৃশ্যমান করা। আরেকটি চ্যালেঞ্জের বিষয় হচ্ছে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা। ১০/১২ জন ব্যবসায়ী কোনো পণ্য নিয়ে অসত্ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তত্পর হয়। ফলে কোনো সময় চালের, আবার কোনো সময় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। কাজেই সরকারকে খুব সর্তকতার সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যারা উপকারভোগী, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে যারা উপকার পেল, তাদের নিয়ে বেশি ভাবার দরকার নেই। বরং যারা ক্ষতিগ্রস্ত বা ভুক্তভোগী, তাদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

 লেখক পরিচিতি :উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়