লাইসেন্স নিয়ে প্রতারণা শর্তও ভঙ্গ গ্রামীণফোনের

3

যুগবার্তা ডেস্কঃ কারিগরী ও আর্থিক মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনায় ‘গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম’ অযোগ্য হয়েছিল। তারপরও ড. ইউনূসের তত্পরতায় ১৯৯৬ সালে লাইসেন্স পেয়েছিল গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম। এই মোবাইল ফোন সেবা-দানকারী কোম্পানির মালিকানায় থাকবেন গ্রামের দুঃস্থ নারীরা— এমনটিই তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বুঝিয়েছিলেন ড. ইউনূস। ফলে সরকারের বিশেষ বিবেচনায় লাইসেন্স পায় গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম। অথচ লাইসেন্স পাওয়ার পরই ‘গ্রামীণফোন’ নাম দিয়ে ব্যবসা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৯ সালে কাগজপত্রে গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম থেকে গ্রামীণফোন লিমিটেড নাম ধারণ করে তারা। এর আগে তিন বছর ১৯৯৬-৯৯ পর্যন্ত লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠানটি।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্যাডে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। পরে তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেন। ‘গ্রামীণ ফোন গ্রামের দরিদ্র নারীদের প্রতিষ্ঠান হবে, তারাই হবে এটার মালিক’- প্রধানমন্ত্রীকে এমনটাই বুঝিয়েছিলেন ড. ইউনূস। তার কথা বিশ্বাস করে দরিদ্র নারীদের উন্নয়নের বিষয়টি আমলে নিয়ে তত্কালীন টেলিযোগা-যোগমন্ত্রীকে লাইসেন্স দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে গ্রামীণ ফোন।

বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি দেশে মোবাইল ফোনের নতুন লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে কমিটি। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের কারিগরী সক্ষমতা, টেলিযোগাযোগ খাতে সেবাদানের পূর্ব অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা অন্যতম। এছাড়া সরকারের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগিতে প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবও জমা দিতে বলা হয়। এ সময় আবেদন জমা দেয় টেলিকম মালয়েশিয়া (একটেল), সেবা টেলিকম, টেলেস্ট্রা ও গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম। প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদনের সঙ্গে তাদের যোগ্যতার বিস্তারিত তুলে ধরে। দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটি এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে। পরে তারা সংক্ষিপ্ত তালিকা করে।

লাইসেন্স দেওয়ার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কারিগরী ও আর্থিক যোগ্যতার যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল, এসবের কোনটির মানদণ্ডেই গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামের আবেদন যোগ্য বিবেচিত হয়নি। কমিটির সংক্ষিপ্ত তালিকার চার নম্বরে ছিল গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম। আর তালিকার প্রথম তিন প্রতিষ্ঠান ছিল যথাক্রমে একটেল, সেবা ও টেলেস্ট্রা। এর মধ্য থেকে একটেল ও সেবাকে লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। এদিকে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ার পর শুরু হয় টেলিনরের দৌড়-ঝাঁপ। ব্যাক্তিগত প্রভাব ও সুনাম ব্যবহার করে লাইসেন্স নেওয়ার এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন ড. ইউনূস। তিনি নিজেও একাধিকবার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ড. ইউনূসের তত্পরতায় অন্য দু’প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামকেও লাইসেন্স দেয় তত্কালীন সরকার।

গ্রামীণফোনের দাবী অনুযায়ী, কোম্পানি গঠন করা হয়েছে ১৯৯৬ সালের ১০ অক্টোবর। আর একই বছরের ২৮ নভেম্বর লাইসেন্স পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ দেশে প্রথম জিএসএম (গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন) প্রযুক্তির সেলফোন সেবা চালু করে গ্রামীণফোন। আর ২০০৭ সালের ২৫ জুন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি।

গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামের লাইসেন্স পাওয়া প্রসঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন উর রশিদ আগেও সাংবাদিকদের বলেছেন, গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামের এ দরপত্রে অংশগ্রহনের যোগ্যতা ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দরপত্র গ্রহণ করাটাই অবৈধ হয়েছে। আবার দরপত্রে অংশগ্রহণের সময় ‘গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম’ নামে একটি কোম্পানী ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এ নামে তখন কোন কোম্পানী ছিল না। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা চুক্তি সই করে। লাইসেন্স হওয়ার আগে তারা মন্ত্রণালয়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে, প্রভাবান্বিত করেছে।

গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামের নামে লাইসেন্স নেওয়ার পর গ্রামীণফোন লিমিটেডের নামে এ লাইসেন্স দেওয়ার জন্য তদবির শুরু করে তারা। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ প্রস্তাবে রাজি হননি। সেসময় মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, দরপত্রে যারা অংশ নিয়েছে শুধু তাদের নামে লাইসেন্স দেওয়া যাবে। ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামের নামে লাইসেন্সটি দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালে তা গ্রামীণফোন লিমিটেড নাম ধারণ করে।

তখন মামুন উর রশিদ বলেছিলেন, এটা সরাসরি কারচুপি। লাইসেন্স পেলো এক নামে আর ব্যবসা করলো আরেক নামে। সরকারের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, ওই চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছিল এ লাইসেন্স হস্তান্তর যোগ্য নয়। ফলে ১৯৯৯ সালে গ্রামীণফোনের নামে লাইসেন্স হস্তান্তর করা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। কমিশনের অন্তর্বতী প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও এটা প্রকাশ করা হয়েছিল।-ইত্তেফাক