দেশটাকে বদলাতে চাইলে…..

29

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বেশীদিন আগের কথা নয়! মনে হয় এই তো সেদিন। আমার ছেলেবেলার কথা। আমার শোনিমের এখনকার বয়সের চাইতেও ছোট আমি। বাবা-মা ছাড়া কিছুই না করার, না বোঝার বয়স। কিছু কিছু কাজ যদিও বা তখন একা একা করতে পারি; কিন্তু প্রকৃতি ডাকলে আর উপায় নেই। ঐ দুজনার একজনকে লাগবেই। দিন হলে যেমন তেমন, রাত হলে কথাই নেই। একজনার কোলে চেপে ঘরের বাইরে উঠোন কোনে থাকা ছোট্ট চিপার ঘরে গিয়ে বসতাম। ঘটিতে পানি নিয়ে বাইরের অন্ধকারে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতো দুজনার একজনা; ঠিক ততক্ষণ, যতক্ষন না নিষ্কাশন কর্ম পুরোপুরি সম্পাদন হয়।
ছোট্ট এই ঘরটিকে চিনতাম ল্যাট্রিন নামে; আব্বা শিখিয়েছেন। শব্দটি বাংলা নয়, ইংরেজী। প্রায় দু’শ বছরের শাসন শোষনের কারনে আমরা বঙ্গবাসীরা ইংরেজীতেই অভ্যস্ত হয়েছিলাম। এই ল্যাট্রিনের অবস্থান ঘরের ভিতরে নয়, ঘর হতে অনেক দূরে। উঠোন পেরিয়ে বাড়ীর একেবারে শেষ মাথায় কোন ঝুপরির আড়ালে। প্রচন্ড নোংরা এবং একটু ভুতুরে পরিবেশ। দিনের বেলায় নিঝুম নীরব, কিন্তু রাতের বেলায় গা ঝিমঝিমে ভাব। কোথাও শেওলা পড়া ইটের দেয়াল ঘেরা, কোথায়ও বা টিন। তবে এর সংখ্যা নেহায়েতই নগণ্য। তখনকার দিনে চটের আবডাল কিংবা পাতা বাঁশের বেড়ার ল্যাট্রিনই ছিল বেশী। চারপাশে কিছু একটা থাকলেও মাথার উপর চালা থাকতো না। খোলা আকাশের আবহ উপভোগ করার চমৎকার ব্যবস্থা। সাথে বোনাস হিসেবে বাদলা দিনের জলের ঝাপটা; অঙ্গ ভিজে একাকার।
এর গঠন কাঠামোশৈলীও ছিল অভিনব। মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে ছিল এর অবস্থান; তবে তলা ছিল খোলা। মানে, ফাঁকফোকর থাকলেও মোটামুটি শরীর ঢাকার গ্যারান্টি ছিল; কিন্তু নিষ্কাশিত বস্তু একেবারে উন্মুক্ত। কার দেহ থেকে কোনটা কেমন বের হয় তা প্রদর্শনের উন্মুক্ত আয়োজন ছিল। উপর থেকে মল যখন নীচে পড়তো ধপাশ ধপাশ শব্দ করেই পড়তো। কেবল পড়ার শব্দই নয়, দেহ থেকে বের হবার শব্দও ছিল। বয়স ভেদে শব্দের ধরনও ছিল আলাদা। মজার ব্যাপার হলো শব্দটি আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। কিন্তু লিখতে পারিনা। কিংবা মুখে উচ্চারন করিনা; করতে পারিনা। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, চুপি চুপি নিজ দেহ থেকে নির্গত শব্দটি শুনলে লজ্জা পাই; আশেপাশে তাকিয়ে চেপে যাবার চেষ্টা করি। কিন্তু অন্যেরটি শুনলে রাজ্যের হাসি এসে ভর করে। খিটখিট করে হাসি।
পুরো ভারত জুড়ে এই ল্যাট্রিনের আরো একটি নাম ছিল; টাট্টি। অবশ্য এটা বেশীদিন টেকেনি। আবার ল্যাট্রিন শব্দটিও পাকিস্তান আমল থেকেই হারিয়ে যেতে শুরু করে। এর জায়গায় পায়খানা শব্দটি আসে। সম্ভবত পাকিস্তানি উর্দু বা ফারসী ভাষার আগ্রাসন। তবে শব্দটি শহরে তেমন নয়, গ্রাম বাংলায় ব্যবহৃত হতো। শহরে ছোট ছোট বাসায় ঘরের ভেতরেই এটাচ্ড পায়খানার ব্যবস্থা চালু হলে এর নাম হয় টয়লেট।
তাহলে কি পায়খানার ইংরেজী অর্থ টয়লেট? মোটেই তা নয়। টয়লেট শব্দটি ফরাসী দেশ থেকে ভারতে এসেছে। অনেক আগে ফরাসী সভ্যতায় মেয়েদের কাপড় বদলানোর জন্যে মূল ঘরের বাইরে ছোট্ট একটি ঘর ছিল। এই ঘরটির নাম টয়লেট। মোঘল আমলে ফরাসীদের অনুসরন করে রাজপ্রাসাদে এরূপ টয়লেট থাকতো আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। এদিকে বাঙালী প্রজারা তো স্বভাবে রাজা বাদশাদের চালচলনকেই ফলো করে। তাই যখনই তারা দালান করার সুযোগ পেল তখনই শোবার ঘরের পাশে ড্রেসিং রুম মানে মোঘলীয় টয়লেট বানালো। ওখানেই মেয়েরা কাপড় বদলানোর কাজ করতে লাগলো। প্রথম দিকে দালান বড় ছিল তাই ল্যাট্রিন এবং টয়লেট আলাদা ছিল। কিন্তু যখনই দালানের সাইজ ছোট হতে লাগলো তখন চাপাচাপি শুরু হলো; এবং এক পর্যায়ে টয়লেটের ভিতরই এসে ঢুকে পড়লো ল্যাট্রিন; টু ইন ওয়ান। টয়লেটের নামে বিলিন হয়ে গেল ল্যাট্রিন।
টয়লেট তো হলো। এবার গোসলের কী হবে? এর আগে বলে নেই গোসল কাকে বলে। পানিতে গলা অবধি ভিজিয়ে লম্বা সময় থাকার নামই গোসল করা। ইংরেজীতে বলে বাথিং। গ্রামেগঞ্জে পুকুর, ঝিল বা নদীতে হাজার বছর আগেও গোসল করার সুযোগ ছিল; এখনো আছে। ছেলেবেলায় আমরা পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে চোখ লাল করে ফেলতাম। কিন্তু শহরে এসব পাবে কোথায়? মোঘল আমলে রাজপ্রাসাদে চৌবাচ্চা বসিয়ে বাইরে থেকে পানি তুলে এনে গোসলখানা বানাতো। রাজ পরিবারের লোকেরা ওখানেই সখিসখা মিলে গা ভিজাতো। রাজকীয় লোকজনের রাজকীয় আয়োজন। ওদের লোকজনের অভাব ছিলনা; তাই এসব পারতো।
একদিন মোঘল সা¤্রাজ্য গেল, আসলো ইংরেজরা। তারা রাজাবাদশা না হলেও রক্ত তো রাজকীয়। তারাও ছোটছোট ঘরে ছোট ছোট চৌবাচ্চা মানে বাথটাব বসিয়ে অল্প পানিতে গলা ডুবিয়ে গোসল করতে লাগলো। পুকুরের স্বাদ বাথটাবে না মিটলেও গোসলের মূল কর্মটি সমাধা হতো এই বাথরুমেই। এসবের দেখাদেখি মধ্যবিত্তেরও সখ হলো বাইরে নয়, ঘরের ভেতরই গোসল করবে। তবে সাধ থাকলেই তো আর হবেনা, সাধ্যও থাকতে হবে। ঘরের ভেতরে তারা ব্যবস্থা করলো বটে, তবে বাথটাব দিয়ে নয়। ভাতের হাড়ি কিংবা বালতি জাতীয় পাত্র দিয়ে বাইরে থেকে পানি তুলে এনে মগ দিয়ে গা ভেজাতো। গা ধোয়ার একটি নতুন পদ্ধতি। পানির পাম্প আসার পরে মগের ব্যবহার কমলো, আসলো ঝরনা।
ঝরনায় কিছুক্ষণ গা ভেজানোর নাম আর যাই হোক গোসল নয়। ইংরেজীতে একে শাওয়ার বলে আর বাংলায় বলা যায় গা ভেজানো বা ধৌত করা। গোসল করা আর গা ধৌত করা এক জিনিস নয়। এর মাঝে বিস্তর তফাৎ। শহরের ছোট্ট বাসায় জায়গার সংকুলান হয় না বলে একদিন টয়লেটের ভেতরেই ঝরনার প্রবেশ ঘটলো। সেই থেকে একই রুমে গা ধোয়া, কাপড় বদলানো এবং হাগুমুতুর কাজও চলতে থাকলো। এখানে অন্য কাজ যেমন তেমন, গা ধোয়ার সময়ই মাঝেমধ্যে ঘটে বিপত্তি। গায়ে মাখার সময় হাত ফসকে সাবান চলে যায় প্যান বা কমোডের মাঝে। জীবনে কতবার যে এমন বিপত্তিকর অবস্থায় পড়েছি। নতুন সাবান, মাত্র কিনেছি। দুটো ঘষাও দিতে পারিনি শরীরে, অমনি হাত পিছলে সোজা নিষিদ্ধ গর্তে। চোখের সামনে দেখা যায়; গর্তের মধ্যে নতুন সাবানটি চকচক করছে। অথচ না পারছি হাত দিয়ে উঠাতে, না পারছি এর মায়া ছাড়তে।
এটা অবশ্য তত সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এই ঘরটির নাম নিয়ে। লক্ষ্য করে দেখুন তিনটি কর্ম হচ্ছে একই ঘরে। ল্যাট্রিন, টয়লেট এবং শাওয়ার রুম তিনটি এক রুম হয়ে গেল। কিন্তু নামটি ধারন করলো একেবারেই ভিন্ন; বাথরুম। বাথটাব বসিয়ে ওটাকে বাথরুম বলুন; সমস্যা নেই। কিন্তু যে রুমে বাথটাব নেই, বাথিং বা গোসল করা হয় না, তার নাম কেন হলো বাথরুম! বাথরুম না হয়ে বাকী তিনটি নামের একটি হলেও মানিয়ে নেয়া যেত। এমন অর্থহীন বেমানান নাম নিয়ে আর কত কাল!
দীর্ঘকাল তো এভাবেই পাড়ি দিলাম। দেশের এত সব আউলা ঝাউলার মাঝে এই সামান্য বেতাইল্যা জিনিস নিয়ে কে ভাবে! কামের সাথে নামের মিল না থাকা এমন হাজারটা উদাহরণ এদেশে বের করা যাবে। এটা যেমন এক ধরনের অসংগতি, তেমনি অসংগতি আছে আরো নানা জায়গায়। কিন্তু এসব নিয়ে সবার কেমন যেন উদাসীন ভাব। এভাবে না বুঝে, না জেনে সবকিছুকেই আমরা হজম করছি প্রতিনিয়ত। কিন্তু হচ্ছে বদহজম। অত্যন্ত সমৃদ্ধ বাংলাভাষা দূর্বল হচ্ছে, অর্থহীন হচ্ছে। আমরা এসব নিয়ে ভাবিও না, বুঝিও না; কিন্তু বিদেশীরা বোঝে। ওদের চোখে এসব অসংগতি সহজেই চোখে পড়ে।
কেবল পড়েনা বাংলা একাডেমির কারো চোখে। তারা বছরে একটি বইমেলা করেই দায়িত্ব শেষ করে; আর করে সরকারী টাকায় ঘন ঘন বিদেশ সফর। বিদেশে এত জায়গায় যায়; ওখানে একজনও কি গোসল করতে টয়লেটে যায়? নাকি টয়লেট করতে বাথরুমে যায়! আমরা কথায় কথায় দেশটাকে বদলাতে বলি। কেবল কথা বললেই হবে? কোন না কোন জায়গা থেকে শুরু তো করতে হবে! দেশটাকে সত্যি সত্যি বদলাতে চাইলে, কোন না কোন জায়গা দিয়ে শুরু করতে হবে। আর সেটা করতে হবে নিজ ঘর থেকেই; একেবারে বাথরুম থেকেই। অন্তত এই হোক নববর্ষের কামনা! সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা!! শুভ নববর্ষ!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।