শান্তনু দে: সেদিন কমিউনিস্টরা যে ইশতেহার বিলি করেছিলেন, তাতে ছিল শ্রমিক ইউনিয়নের স্বীকৃতি, আট-ঘণ্টার কাজের অধিকার, ন্যূনতম মজুরির জন্য লড়াই-আন্দোলনের ডাক।
গয়া কংগ্রেসের সেই ইশতেহারের কথাই পরে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯২৪) ব্রিটিশ পুলিশ তথ্য-প্রমান হিসেবে পেশ করে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে।
মার্চ, ১৯৩১। করাচি কংগ্রেস।
মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা তখনও চলছে। অভিযুক্তরা তখনও নিজেদের বক্তব্য পেশ করেননি। কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন করাচি কংগ্রেসে বিলি করে ‘ড্রাফট প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশান’ নামে প্রাথমিক কর্মসূচীগত দলিল।
আর তাতে জমিদারতন্ত্র বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে লেখা হয়: ‘ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই জমিদার, শাসক রাজন্যবর্গ, মহাজনি কারবাদিদের সমস্ত জমি, তাদের দখলে থাকা সমস্ত অরণ্যভূমি বাজেয়াপ্ত করতে হবে… দাস চুক্তিসমূহ বাতিল করতে হবে, মহাজন ও ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া কৃষকদের সমস্ত ঋণ মকুব করতে হবে।’
এভাবেই পরাধীন ভারতে শ্রমিকশ্রেণি, কৃষকদের জরুরি দাবিগুলি প্রথম তোলেন কমিউনিস্টরা।
এবং কী আশ্চর্য, প্রায় একশ বছর পরেও স্বাধীনতার ৭৩-বছর পরেও আজও তা কী ভীষণ প্রাসঙ্গিক।
১৯২০, ঠিক একশ বছর আগে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। অবশ্য তার আগেই জুলাই, ১৯০৮। ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে তিলকের ছ’বছর কারাবাসের সাজা ঘোষণা। ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ লিখছেন, প্রতিবাদে সমস্ত সুতাকল ও রেলশ্রমিকদের সর্বাত্মক ধর্মঘটে স্তব্ধ বোম্বাই। নামানো হয় সেনা। রাস্তায় শহীদ হন ১৬ জন শ্রমিক। জখম আরও ৫০ জন।
ভারতে শ্রমিকদের ধর্মঘট দেখে ‘ইনফ্লেবেল ম্যাটেরিয়াল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স’ নিবন্ধে ভ্লাদিমির লেনিন লিখলেন, ‘ইতিমধ্যে ভারতেও সর্বহারা জনগণ সচেতন রাজনৈতিক গণসংগ্রাম গড়ে তুলছেন। এবং তার ফলে ভারতে রুশ ধাঁচের ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার হালও শোচনীয় হয়েছে।’
কমরেড বি টি আর লিখছেন: ‘এই প্রথম শ্রমিকশ্রেণি সমস্ত শিল্পে তার শক্তিশালী হাতিয়ার ধর্মঘটকে ব্যবহার করল একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য এবং দেখালো সাধারণ মানুষকে জড়ো করতে পারার দক্ষতা।’
নতুন ভারত নির্মাণের প্রতিটি প্রশ্নে কমিউনিস্টরা। জমির প্রশ্নকে তোলা। জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে জমির লড়াই। তেভাগা থেকে তেলেঙ্গানা। সুরমা উপত্যকা, কেরালার উত্তর মালাবার থেকে ত্রিপুরার আদিবাসী জনগণ এবং মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি আদিবাসী বিদ্রোহ। দেশের নানা প্রান্তে বীরত্বপূর্ণ কৃষক সংগ্রাম। ভূমি সংস্কারের প্রশ্নকে জাতীয় অ্যাজেন্ডায় পরিণত করা।
নয়া উদারবাদের জমানায় শ্রমিক শ্রেণির ব্যাপকতম ঐক্য নির্মাণে ব্রতী কমিউনিস্টরা।
এই সময়ে ১৯টি সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট। বৃহস্পতিবার বিশতম ধর্মঘট।
‘আরও তীব্র, আরও অনমনীয়, আরও দীর্ঘ সংগ্রামের প্রস্তুতির জন্য এটি সূচনা মাত্র।’ একযোগে জানিয়ে দিয়েছে বিজেপি, তৃণমূলের ট্রেড ইউনিয়ন বাদে সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন।
এ লড়াই নীতি বদলের লড়াই।
এ লড়াই বিকল্প নির্মাণের লড়াই।
এ লড়াইয়ে নৌ-‌বিদ্রোহের সেই গান:
‘মন্দির মসজিদ গুরদ্বারোঁ নে বাঁট দিয়া ভগওয়ান কো
ধরতী বাঁটি, সাগর বাঁটা, মাত বাঁটো ইনসান কো।’
এ লড়াই আপসহীন শ্রেণি সংগ্রামে অবিচল থাকার প্রত্যয়। এ লড়াই মজদুর-কৃষাণের ঐক্য।
এ লড়াইয়ের শরীরিভাষা, ‘হম ভুখসে মরনে ওয়ালে/ কেয়া মত সে ডরনে ওয়ালে…’


১৯৪৫, কলকাতার রাজপথ, সেদিন ট্রাম শ্রমিকদের ধর্মঘট চলেছিল টানা ৯-দিন।-লেখক: একজন সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, কলকাতা।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।