১০০ মানে

6

শান্তনু দে: কোনও সূচক নয়। নিছক কোনও সংখ্যা নয়।
১৯২০, কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা। আবার ওই বছরই অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। এবং তা মোটেই কাকতালীয় নয়।
একশ’ মানে স্বাধীনতা ভারতের চেহারা নির্মাণে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিউনিস্টদের নির্ণায়ক ভূমিকা। জরুরি ইস্যুগুলিকে জাতীয় অ্যাজেন্ডার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। বিরাট আত্মত্যাগ। শহীদিবরন।
একশ’ মানে ১৯২১, আমোদাবাদে কংগ্রেসের অধিবেশনে কমিউনিস্টরাই প্রথম তোলেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। পরের বছর আবার, কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে। গান্ধীজির তখন পছন্দ হয়নি। আট বছর পর, শেষে ১৯২৯-এ কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে গৃহীত হয় পূর্ণ স্বরাজের স্লোগান। ১৯৩১, করাচি অধিবেশনে স্বাধীন ভারতের রূপরেখা।
২ অক্টোবর, ১৯৩৯। একশ’ মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজার পর এই বিশ্বে প্রথম শ্রমিকশ্রেণির যুদ্ধ-বিরোধী ধর্মঘট বোম্বাইয়ে। নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা।
অবশ্য তার আগেই জুলাই, ১৯০৮। ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে তিলকের ছ’বছর কারাবাসের সাজা ঘোষণা। ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ লিখছেন, প্রতিবাদে সমস্ত সুতাকল ও রেলশ্রমিকদের সর্বাত্মক ধর্মঘটে স্তব্ধ বোম্বাই। নামানো হয় সেনা। রাস্তায় শহীদ হন ১৬ জন শ্রমিক। জখম আরও ৫০ জন।
ভারতে শ্রমিকদের ধর্মঘট দেখে ‘ইনফ্লেবেল ম্যাটেরিয়াল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স’ নিবন্ধে ভ্লাদিমির লেনিন লিখলেন, ‘ইতিমধ্যে ভারতেও সর্বহারা জনগণ সচেতন রাজনৈতিক গণসংগ্রাম গড়ে তুলছেন। এবং তার ফলে ভারতে রুশ ধাঁচের ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার হালও শোচনীয় হয়েছে।’ কমরেড বি টি আর লিখছেন: ‘এই প্রথম শ্রমিকশ্রেণি সমস্ত শিল্পে তার শক্তিশালী হাতিয়ার ধর্মঘটকে ব্যবহার করল একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য এবং দেখালো সাধারণ মানুষকে জড়ো করতে পারার দক্ষতা।’
একশ’ মানে সুভাষচন্দ্র বসুর রানি ঝাঁসি বাহিনীর নেতৃত্ব থাকা লক্ষ্মী সায়গল, যিনি ছিলেন সিপিআই(এম) সদস্য। একশ মানে, সেলুলার জেল। স্মৃতিফলকে লেখা নামের আশি শতাংশই অবিভক্ত বাংলা ও পাঞ্জাবের কমিউনিস্ট। হরেকৃষ্ণ কোঙার থেকে সুধাংশু দাশগুপ্ত। যেমন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের অন্যতম সদস্য কল্পনা দত্ত থেকে গনেশ ঘোষ, সতীশ পাকড়াশি থেকে সুবোধ রায়।
১৯৪২, ভারত ছাড়ো আন্দোলন। তার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে ১৯৯২ সালের ৯ আগস্ট রাত বারোটায় সংসদের বিশেষ অধিবেশন। রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা ভাষণ দিতে গিয়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল ‘ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীর’। দেশের রাষ্ট্রপতি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর উদযাপনে সংসদে দাঁড়িয়ে বলছেন, কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল ‘ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীর’।
একশ মানে, নতুন ভারত নির্মাণের প্রতিটি প্রশ্নে কমিউনিস্টরা। জমির প্রশ্নকে তোলা। জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে জমির লড়াই, ভূমি সংস্কার। তেভাগা, তেলেঙ্গানা। ভাষার ভিত্তিতে রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক। সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা।
আবার একশ মানে, শুধু ইতিহাস চর্চা নয়, পিছনে ফিরে দেখা নয়, আজকের সময়কে মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা।
একশ’ মানে, নৌ-‌বিদ্রোহের সেই গান:
‘মন্দির মসজিদ গির্জাঘর নে বাঁট দিয়া ভগওয়ান কো
ধরতী বাঁটি, সাগর বাঁটা, মাত বাঁটো ইনসান কো।’
একশ মানে আপসহীন শ্রেণি সংগ্রামে অবিচল থাকার প্রত্যয়। শ্রেণি সংগ্রাম অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক সংগ্রাম, মতাদর্শগত সংগ্রাম। শ্রমিক-কৃষকের ঐক্য। অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে যা আজ অনেক বেশি জরুরি।
একশ মানে, ‘হম ভুখসে মরনে ওয়ালে/ কেয়া মত সে ডরনে ওয়ালে…’।-লেখক: একজন কলামিস্ট ও সাংবাদিক, কলকাতা।