হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘুদের উপর হামলার প্রতিবাদে উত্তাল ঢাকা

43

যুগবার্তা ডেস্কঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে শুক্রবার উত্তাল ছিল ঢাকা। বিভিন্ন সংগঠন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ করেছে। ঘটনা তদন্তে তারা বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে।

নাসিরনগরে হামলার ঘটনার পর থেকে সেখানে ছয়টি হিন্দু পরিবারের খোঁজ মিলছে না জানিয়ে বিক্ষোভকারিরা বলেন, বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়ে দেশান্তরী হয়েছে এমন পরিবারগুলোকে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, একটি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করতে হবে। এদিকে হামলায় জড়িতদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সচেতন হিন্দু শিক্ষার্থীবৃন্দ’, ‘সাধারণ হিন্দু শিক্ষার্থীবৃন্দ’, ‘সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ’, ‘রমনা কালি মন্দির ও আনন্দমীয় আশ্রম পরিচালনা পরিষদ’সহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের ব্যানারে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী শুক্রবার বেলা পৌনে ১২টা থেকে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন। এসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় স্থানীয় সাংসদ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের অপসারণ দাবি করে তার কুশপুতুল পুড়িয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। শিক্ষার্থী হাতে প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘হিন্দু হয়ে জন্মানোই কি আমাদের অপরাধ’, ‘দেশত্যাগই কি আমাদের একমাত্র পথ?’, ‘হিন্দুজাতির অপমান মানি না, মানব না, নাসিরনগরে হামলা কেন জবাব চাই’।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ১০টায় জগন্নাথ হলের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে যায়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া বেশ কয়েকটি সংগঠনের কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জড়ো হয়ে মিছিল করে শাহাবাগে আসেন। সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে সকাল থেকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে কর্মসূচিতে থাকা কয়েকটি সংগঠনও এ সময় শাহবাগে অবস্থান নিয়ে অবরোধে যোগ দেয়।

নাসিরনগরের মন্দিরে হামলা ও ভাংচুরের দায়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্প্রদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকসহ জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের দাবিতে শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, বাংলাদেশ সচেতন হিন্দু পরিষদ, জনতা ঐক্য পরিষদ, শ্রীশ্রী রমনা কালি মন্দির ও শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম পরিচালনা পরিষদ ও জাগো হিন্দু পরিষদ। এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। শুক্রবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এমএ মাহবুব উদ্দিন খোকনের নেতৃত্বে প্রায় দেড় শতাধিক আইনজীবী নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দির পরিদর্শন শেষে স্থানীয় গৌর মন্দিরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। সমিতির সভাপতি ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের আইনি সহায়তার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের পাশে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন আছে। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফোরাম আয়োজিত মানববন্ধনে এ দাবি জানান তিনি। সাবেক সচিব তপন মজুমদারের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বিএনপি নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, গবেষণা সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তী প্রমুখ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হামলার পেছনে আওয়ামী লিগ সমর্থকরা:
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লিগের দলীয় বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সভাপতি সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সমর্থকরা নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়ি-মন্দিরে হামলার নেপথ্যে ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। সেদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংসদ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লিগ নেতা উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সমর্থনপুষ্ট চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখির এলাকা হরিপুর বাজারে সমবেত হয়ে ট্রাক করে ১৩ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নাসিরনগরের হিন্দু পল্লীতে হামলা চালানো হয়। নাসিরনগরের এমপি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের সঙ্গে মোকতাদির ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের দ্বন্দ্বই হামলার নেপথ্য কারণ হিসেবে উদঘাটিত হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের বিরোধ দীর্ঘদিনের। উপজেলা আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় মন্ত্রী ছায়েদুল হকের কথায়। গত মার্চে ইউপি নির্বাচন কেন্দ্র করে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। এর জের ধরে ছায়েদুলকে উপদেষ্টার পদ থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করে জেলা আওয়ামী লীগ। বহিষ্কার করা হয় নাসিরনগর উপজেলা সভাপতি রাফি উদ্দিনকেও। ইউপি নির্বাচনের বিরোধের কথা তুলে ধরে নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী আবদুল গাফ্ফার বলেন, “মন্ত্রী সাহেবকে বিপদে ফেলার জন্য এ হামলা।” হামলার মূল হোতা হিসেবে হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখির কথা উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত তার এলাকা থেকে ট্রাকে করে মানুষ এসে হামলা চালায় নাসিরনগরে। শুক্রবার এসব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন তদন্ত করে নাসিরনগরে মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রেপ্তার আরও ৪:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালিয়ে ভাংচুরের ঘটনায় আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। নাসিরনগর থানার ওসি মো. আবু জাফর জানান, দুই মামলায় এ পর্যন্ত মোট ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে এখনও অভিযান চলছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, ফেইসবুকে ‘ইসলাম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে গত ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির এবং হিন্দুদের শতাধিক ঘরে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়।

আদিবাসীদের ওপর হামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি:
গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে আদিবাসীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিচাগীয় তদন্ত দাবি করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ এবং নাগরিক সমাজ নামের তিনটি সংগঠন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে শুক্রবার সকালে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি জানানো হয়। এতে বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ, আদিবাসী ফোরামের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, রবীন্দ্রনাথ সরেন, সঞ্জীব দ্রং, শক্তিপদ ত্রিপুরা প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং বলেন, গত ৬ ও ৭ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম এলাকায় পরিকল্পিতভাবে পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী মিলিতভাবে আদিবাসীদের বাড়িঘরে আগুন দেয়। পুলিশের গুলীতে চারজন আদিবাসী সাঁওতাল নিহত হন। তারা হলেন শ্যামল হেম্ব্রম, মঙ্গল মার্ডি, রমেশ টুডু ও একজন আদিবাসী নারী। তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।