হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা

8

ডেস্ক রিপোর্ট: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত নানা জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাভাষীর মানুষের মাতৃভাষা রয়েছে সংকটে। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি, প্রথা ও উত্সব বাঙালিদের মুগ্ধ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকেন্দ্র ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার কারণে তাদের মাতৃভাষা এবং নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। বাংলা ভাষার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহত্তর সিলেটে আদিবাসী তালিকায় খাসিয়া, গারো, ত্রিপুরা, মুন্ডা, সাওতাল, বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী, মৈতৈ মনিপুরীসহ ১৩টি সম্প্রদায় রয়েছে। এদের বাইরে চা-বাগানে তেলেগু, রবিদাস, কৈরীসহ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের অধিকাংশই পাহাড়, টিলার পাদদেশে, বনজঙ্গলে কিংবা সমতল ভূমিতে জীবনযাপন করছেন। দেশে অর্থনৈতিকভাবে তাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকারসহ জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষাকেও হারাতে বসেছে তারা। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক মাতৃভাষা চর্চাকেন্দ্র না থাকা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বাড়িঘরসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার সব মিলিয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মাতৃভাষার অধিকার হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কমলগঞ্জের মনিপুরী থিয়েটারের সভাপতি ও নাট্যকার শুভাশীষ সিনহা বলেন, বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ায় আমাদের মনিপুরীদের ভাষাও সংকটে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক কোনো চর্চার ব্যবস্থা না থাকলে আগামীতে আরো সংকটে পড়বে আমাদের মাতৃভাষা। লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষার প্রতিও দায়িত্ববোধ বেড়ে গেছে। তবে অনেকেই নিজস্ব ভাষা চর্চা করেন না। ফলে বাংলা ভাষা তাদের গ্রাস করছে।

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী ফিলা পত্মী বলেন, বৃহত্তর সিলেটের ৭০টি খাসিয়া পুঞ্জির মধ্যে হবিগঞ্জের আলীয়াছড়া ও জাফলংয়ের নকশিয়ার পুঞ্জিতে দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর সরকারি কোনো বিদ্যালয় নেই। তবে খাসিয়াদের চাঁদায় পরিচালিত কয়েকটি কমিউনিটি বিদ্যালয়ে নিজস্ব ভাষা চর্চার চেষ্টা চলছে। মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির জিডিসন প্রধান সুচিয়ান বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা একাডেমিক ব্যবস্থা না থাকার কারণে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এসব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে। লাউয়াছড়া উদ্যানের সাজু খাসি জানান, আমার জানামতে মাগুরছড়া ও কালেঞ্জী পুঞ্জিতে বিদ্যালয় থাকলেও বইসহ নানা সংকট রয়েছে। অন্যান্য অনেক পুঞ্জিতে এ ধরনের সুবিধাটুকুও নেই।

ডানকান ব্রাদার্স শমশেরনগর চা-বাগানের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক অপূর্ব নারায়ণ ও চা-বাগান থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘চা মজদুর’ পত্রিকার সম্পাদক সীতারাম বীন বলেন, চা-বাগানে অধিকাংশই বাংলা ভাষায় কথা বলেন। নিজস্ব মাতৃভাষা কেউ ব্যবহার না করার কারণে এবং বাড়িঘরেও চর্চা না করার কারণে আমাদের মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষা চর্চাকেন্দ্র চালু করা প্রয়োজন।

কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক দীপংকর শীল বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা তাদের মাতৃভাষা রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তবে সরকারিভাবে তাদের উত্সাহ প্রদান করলে তাদের মাতৃভাষা চর্চা ও বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী শহীদ সাগ্নিক বলেন, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে এই সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর ভাষাই হুমকির মুখে।ইত্তেফাক