হত্যা, সন্ত্রাস ও ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।
আমাদের দেশে হালে কিছু সংখ্যক ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীর আবির্ভাব হয়েছে। যারা ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের মতোই সব কিছুর মজা লোটেন, কিন্তু কোনো ব্যাপারেই তাদের নিজস্ব কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। বিনা পরিশ্রমে তারা মোটা লাভের অংক গোনেন। ধরুন গ্রামের ধান বা পাট চাষী। তারা এককালে ফসল ফলিয়ে তার ন্যায্য দাম পেত না। ফড়িয়ারা তাদের ফসল বিক্রিতে বাধা সৃষ্টি করে রাখত। ফসল ধরে রাখার ক্ষমতা থাকত না চাষীদের। তখন তারা কম দামে ফড়িয়াদের হাতে ফসল তুলে দিতে বাধ্য হতো। ফড়িয়ারা বিনা ইনভেস্টমেন্টে বেশি দামে সেই ফসল বিক্রি করে মোটা লাভের টাকা ঘরে তুলত।
আমাদের দেশে যে ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীদের আবির্ভাব হয়েছে, তারাও দেশে কোনো সংকট দেখা দিলে তা মোকাবেলা করার জন্য কোনো ঝুঁকি নেন না। মুক্তচিন্তা প্রসারে প্রাণের ঝুঁকি নেন মুক্তবুদ্ধির তরুণ ব্লগারেরা। তারা ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দেয়। তাদের যারা সমর্থন দেয় তারাও শংকিত জীবনযাপন করে। কিন্তু কোনো ঝুঁকি ও শংকা নেই এ ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীদের। মুক্তবুদ্ধির ব্লগার কিলারদের শাস্তিদানের দাবি তুলে তারা কিলারদের হুমকির সম্মুখীন হন না। আবার এ হত্যা ও সন্ত্রাস সম্পর্কে নীরবও থাকেন না। এই নিহত তরুণ ব্লগারদের জন্য মায়া-কান্না কেঁদে তারা কৌশলে সরকার, পুলিশ, পুলিশি তদন্ত সব কিছুর এমন সমালোচনা করতে শুরু করেন, তাতে কিলারদের বর্বরতা নয়, এ ব্যাপারে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, তদন্তের ত্রুটি, পুলিশের ব্যর্থতাই অতিরঞ্জিত হয় এবং তার ফলে কিলারদের প্রতি জনক্রোধ ধাবিত হওয়ার বদলে তা ধাবিত হয় সরকারের কথিত ব্যর্থতার দিকে।
ফলে এ বুদ্ধিজীবীরা কিলারদের টার্গেট হন না। আবার তাদের লেখার পাঠকরাও দোষ ধরতে পারে না যে, তারা এ বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার নন। বরং কিলারদের মুখোশ উন্মোচনের বদলে সরকারের কথিত ব্যর্থতা, নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সমালোচনাটাই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তারা বাহাদুর বুদ্ধিজীবী বলে প্রশংসিত হন। আমি এদেরই ফড়িয়া বুদ্ধিজীবী মনে করি। সম্প্রতি ঢাকায় বেশ কয়েকটি কাগজে বিদেশী নাগরিক হত্যা এবং প্রগতিশীল লেখক ও পুস্তক প্রকাশক হত্যা প্রচেষ্টা (যে হত্যা প্রচেষ্টায় দীপনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে) সম্পর্কে এ ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীদের কিছু লেখা পড়েছি। মনে হয়েছে এ কিলারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, রোষ ও ক্রোধ প্রকাশের বদলে তাদের ক্ষোভ ও রোষটা মূলত সরকারের বিরুদ্ধে।
এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং কিলারদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে দেশের মানুষকে অবহিত ও সতর্ক করার চেয়েও সরকারের ব্যর্থতাই ঢাকঢোল পিটিয়ে বড় করে তুলে ধরে জনরোষ সরকারের দিকে ধাবিত করা সম্ভবত তাদের লক্ষ্য। তাতে লাভ একটি নেপথ্য শক্তির। যারা এ হত্যাকাণ্ড ও হত্যা প্রচেষ্টাকে মূলধন করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়।
এ ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীদের অনেক লেখার মধ্যে একটি লেখা পড়লাম, যার শিরোনাম হচ্ছে, বড় ভাই নাট্যাংশ ও ওলামা শিশু লীগ। এটি সিরিয়াস লেখা নয়। সাম্প্রতিক হত্যা ও সন্ত্রাস নিয়ে একটি কৌতুক রচনা। বাংলাদেশে জঙ্গি অথবা জংলিরা যে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তা কোনো কৌতুককর ঘটনা নয়। এবং তা নিয়ে কৌতুক করা চলে তাও আমার মনে হয় না। তবু এক ফড়িয়া বুদ্ধিজীবী এ বর্বরতা নিয়ে কৌতুক লিখেছেন এবং কৌতুকের পাত্র সরকার ও পুলিশ এবং কৌতুকের বিষয় পুলিশের তদন্ত ব্যবস্থা। লেখাটিতে কিছু কৌতুককর মন্তব্যও আছে। যেমন ছাত্রলীগের মুখে দাড়ি গজালেই আলেম হওয়া যায় না।
লেখাটির বিষয় সাম্প্রতিক বিদেশী ও ব্লগার হত্যা। কিন্তু কৌতুক করা হয়েছে পুলিশ, ছাত্রলীগ, ওলামা লীগ সম্পর্কে। এ কৌতুক রচনাটি আমাদের গদ্য কার্টুনের যশস্বী লেখক আনিসুল হকের রচনাকেও টেক্কা দিতে চায় মনে হয়। আনিসুল হকের লেখা মানবতার পক্ষে। কিন্তু এ ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীর লেখাটি মানবতার শত্র“দের সাফাই গাওয়া একটি লেখা বলে যে কোনো পাঠকের কাছে মনে হবে।
লেখাটিতে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান, জিহাদি বই ও লিফলেটসহ জঙ্গিদের গ্রেফতার ইত্যাদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জব্দ করার চেষ্টা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষটি কে? বিএনপি ও জামায়াত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বিএনপি-জামায়াতকে জঙ্গি আখ্যা দেন তাতেও এ ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীর আপত্তি। তার মতে পুলিশ জেহাদি বই বলে যেসব বইপত্র ধরছে তা আসলে ইসলামি বই। জামায়াতও তাহলে একটি যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী দল নয়। ইসলামী দল। এ ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীর লেখাটি পড়লে মনে প্রশ্ন জাগবে তিনি আসলে কাদের মুখপাত্র? কৌতুকের বদলে তার লেখায় এত চাপা বিদ্বেষের প্রকাশ কেন? এবং এ বিদ্বেষ কিলার বা তাদের নেপথ্যের শক্তিশালী অপশক্তির বিরুদ্ধে নয়। বিদ্বেষ সরকারের বিরুদ্ধে। বিদ্বেষ ও কৌতুকের আড়ালে তার সহানুভূতি কোন দিকে তা বুঝতে কষ্ট হয় না।
একথা সত্য, ব্লগার রাজীব হত্যা থেকে শুরু করে অভিজিৎ ও দীপন হত্যা পর্যন্ত দেশে যে উপর্যুপরি হত্যা-সন্ত্রাস চলছে, তা প্রতিহত করার ব্যাপারে সরকার এখনও সাফল্য অর্জন করেনি। এ সন্ত্রাস দমনের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা ও আগ্রহ প্রশ্নাতীত। কিন্তু তাদের তৎপরতা শিথিল এবং পুলিশের তদন্ত খুবই মন্থর। পুলিশ তদন্ত করছে। অপরাধী সন্দেহে লোকজন ধরছে। এ সন্ত্রাসের পেছনে কারা রয়েছে এবং তাদের কী উদ্দেশ্য সে সম্পর্কেও হদিস খুঁজে পাচ্ছে; কিন্তু অপরাধ ও অপরাধী দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি। দেশের মানুষ, বিশেষ করে মুক্তবুদ্ধির মানুষ এক প্রচণ্ড ভয়ভীতির মধ্যে বাস করছে।
এ জন্য সরকারের ধীরে চলার নীতিকে দোষারোপ করা চলে। কিন্তু তার পাশাপাশি বিশ্ব পরিস্থিতির বাস্তবতাকেও বিবেচনা করতে হবে। দেশে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। তাদের কারও দণ্ডের রায় ঘোষিত হলেই এ ধরনের হত্যা-সন্ত্রাস চলে। চলে চাপাতি হত্যা ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। এ কাজে দেশের কোন দুটি রাজনৈতিক দল সিদ্ধহস্ত, তা সবার জানা। তথাপি ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীরা বর্বরতার এ হোতাদের দিকে জনগণের ক্রোধকে জাগ্রত করার চেষ্টা না করে এ বর্বরতা দমনে সরকারের কথিত ব্যর্থতাকে নিয়ে সমালোচনা ও কৌতুক করায় ব্যস্ত। তাদের এ কৌতুক কিলারদেরই সাহস ও উৎসাহ জোগায়।
সরকারের শিথিল তৎপরতার সমালোচনা আমরা অবশ্যই করব। কিন্তু সেই সঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতিকেও আমরা বিবেচনায় আনব। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সন্ত্রাস চলছে, তা দুচারজন কিলার বা কিলার গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস নয়। বিশ্বব্যাপী এখন সন্ত্রাস চলছে। এ সন্ত্রাসের যোগসূত্র রয়েছে তার সঙ্গে। এ সন্ত্রাসের পেছনে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার এবং সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চক্রান্তকারী মহলটিও রয়েছে। তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রান্তও যুক্ত।
টার্গেটেড কিলিং বন্ধ করা যে কোনো শক্তিশালী বড় রাষ্ট্রের পক্ষেও কষ্টকর। ব্রিটেনে মাত্র একজন লেখককে মৌলবাদীরা হত্যার হুমকি দিয়েছিল। তিনি সালমান রুশদী। তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্রিটিশ সরকারকে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে হয়েছিল। তারপরও রুশদীকে দীর্ঘকালের জন্য অজ্ঞাতবাসে যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশে অসংখ্য ব্লগার ও তরুণ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার টার্গেট করা হয়েছে। তাদের সবাইকে পাহারা দিয়ে রক্ষা করা অসম্ভব। এ জন্য সামাজিক প্রতিরোধ দরকার, যেমন সাম্প্রদায়িক হত্যা দমনে আমরা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। বর্তমান সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড দমনে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য ও আন্দোলন চাই। আমাদের ফড়িয়া বুদ্ধিজীবীরা সেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য না জুগিয়ে সরকারের ব্যর্থতাকেই বড় করে তুলে ধরে প্রতিরোধের সামাজিক চেতনাকে বিভক্ত করার কাজে লিপ্ত। তাতে কিলারদের অভিভাবক অপশক্তিই উৎসাহ পাচ্ছে।
ভারতে নকশাল সন্ত্রাস দমনে লেগেছিল দশ বছর। এখনও মাওবাদী সন্ত্রাস উচ্ছেদ হয়নি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জিহাদি সন্ত্রাস। পাকিস্তানে এ জিহাদিস্ট দমনে সামরিক বাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে এবং মার্কিন সহায়তায় মাঠে নেমেও কূল-কিনারা করতে পারছে না। রোজ চলছে পাইকারি হত্যা। ইরাক ও সিরিয়ায় জঙ্গি দমনে আমেরিকা ও ন্যাটোর সামরিক হামলা সফল হচ্ছে না। সেই তুলনায় সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের রেকর্ড ভালো।
গত সাধারণ নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি ও জামায়াত মিলে যে পেট্রলবোমা হামলা ও আগুনে পুড়িয়ে মারার অভিযান শুরু করেছিল, তা কি আরও ভয়াবহ সন্ত্রাস ছিল না? বর্তমান সরকারই কোনো বড় রকমের সামরিক অভিযানে না নেমে সেই সন্ত্রাস প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। আমার বিশ্বাস, বর্তমানের তরুণ লেখক ও ব্লগার হত্যার সন্ত্রাসও সরকার দমন করতে পারবে। যেহেতু এ সন্ত্রাসের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী দেশী-বিদেশী চক্র, সেহেতু সরকারকে একটু সময় দিতে হবে। ধৈর্যহারা হলে এ বর্বরতা বন্ধ হবে না। সরকার হয়তো এ সন্ত্রাস দমনে আরও কঠোর হতে চাচ্ছে না। কিন্তু তাদের কঠোর হতে হবে। সন্ত্রাস দমনে বর্তমানের ভুলভ্রান্তি ও দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে। দেশের সব পেশার- বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীদের উচিত সরকারকে সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কাজে সাহায্য করা।
সবশেষে সরকারের কাছে আমার একটি বিনীত নিবেদন। সব নষ্টের মূল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের কাজটা তাড়াতাড়ি সারুন। যত এ বিচার ও দণ্ডদান বিলম্বিত করা হবে, ততই বর্বর চাপাতি-হত্যায় দেশের অনেক নিরীহ মানুষ ও মেধাবী তরুণ প্রাণ হারাতে থাকবে। সরকার এই সত্যটি অনুধাবন করুক।