স্মৃতির পাতা থেকে:

47

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ ‘৭৭ সালের কথা। আমি তখন জোহা হলের ২৫৬ নং রুমের আবাসিক ছাত্র। সকালে হল থেকে বেরিয়ে যাই, সারাদিন পর রাতে হলে ফিরি। ছাত্র ভর্তির সময় কালে এটি নিত্যদিনের ঘটনা।
একদিন গভীর রাতে হলে ফিরে রুমে ঢুকতেই চমকে উঠি। দু’টি চেয়ার একসাথে জোড়া লাগানো। তার উপর কুকুরকুণ্ডলীর মতো চাঁদর মুড়ি দিয়ে কে যেন শুয়ে আছে। দেখতে চটের বস্তার মতো লাগছে। মনে হতেই দুপা পিছিয়ে এলাম। লাশ বস্তায় ভরে কেউ রেখে যায়নি তো?

একটু সাহস করে ডাক দিলাম, এই যে! কে আপনি? ওঠেন- ওঠেন! চাদরের নীচ থেকে টাক মাথা বের করে চোখ ঘুচি করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। লাইটের আলোতে সে কোন কিছু ঠাহর করতে পারছেনা। সম্বিত ফিরতেই হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠে। “আমিবে হালায় ঘুমায়া পড়চ্ছি। আপনি ছিছিরনি! ঢাকা থাইকা আছছি। মাফুজ ভুঁইয়া আপনেরে চিঠি দিছে।” সে পকেট থেকে একটা ছোট্ট চিঠি বের করে দিল। কমরেড মাহফুজ ভুঁইয়া। সাম্যবাদী দলের এক অংশের নেতা।
ছোট্ট একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। আমি বললাম এতো রাতে কোথায় যাবেন?
— হোটেলে
এখানে হোটেল পাবেন কোথায়? হোটেলে থাকতে হলেতো শহরে যেতে হবে।
— তাই যাবো
রাজশাহীতে কি এই প্রথম এসেছেন?
— হ্যাঁ
রাজশাহী শহর এখান থেকে ৪-৫ মাইল দূরে। খাওয়া দাওয়া করেছেন?
— না
পাশে ওয়াশরুম আছে, হাত- মুখ ধুয়ে আসুন। ডাইনিং থেকে আমার জন্য খাবার দিয়ে গেছে। আপনি খেয়ে নিন। আমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। খেয়ে পাশের বিছানায় শুয়ে পড়ুন। সে বলছিল তার কাছে চিড়া- গুড় আছে। বললাম সেটা খাবার বহু সময় পাবেন। যা বললাম তাই করেন।

কথা প্রসঙ্গে জানলাম তার নাম নাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ। বন্ধু মহলে সবাই তাকে কমরেড বলে ডাকে। ঢাকাইয়া আদি কুট্টি। ঢাকার মিরপুরে বাসা। মাথায় চুল কম। এটা হয়তো তাদের বংশগত। চুল না থাকার কারণে তার বয়সটা একটু বেশি মনে হয়। মেদহীন একহারা দেহ। কিছুদিন বক্সিং প্রাকটিস করেছে। কথা শুনে মনে হলো সোজা সরল মানুষ।

ঢাকার একটি কলেজ থেকে বি.এ. পরীক্ষা দিতে গিয়ে সে বহিষ্কার হয়। যদিও তার কোন দোষ ছিলনা। সে পরিস্থিতির শিকার। পাশের এক ছেলে নকল করছিল। স্যারকে দেখে কাগজটা ছুড়ে ফেলে দেয়। সেটা এসে নাজিমের পায়ের কাছে পড়ে। স্যার কাগজসহ খাতা কেড়ে নেয়। সেদিন কোন অনুনয় তার কাজে আসেনি।

বিষয়টি সে বাড়িতে এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছে গোপন করে যায়। রেজাল্ট হলে সবাইকে বলে সে পাশ করেছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। বাবা বেঁচে আছে তবু ছোট চাচাই তার মূলত গার্ডিয়ান। তাঁরা ভীষণ খুশি। তাদের পরিবারে প্রথম একজন গ্রাজুয়েট হয়েছে। যদিও তাদের পরিবারে শিক্ষার প্রচলন তেমন ছিলনা। সবাই ছোট খাট ব্যবসা, দোকানদারি করে। চাচাকে বলে কয়ে কোনো মতো রাজি করায়। সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএল-বি পড়বে।

তার সহজ সরল কথাবার্তা, খাবার পর প্লেট গ্লাস ধুয়ে গুছিয়ে রাখা, রুম ধোয়া মোছা দেখে আমার খুব ভালো লাগে। বললাম কমরেড, ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত এই ক’দিন আমার রুমেই থাকেন। ভর্তি হলে তখন দেখা যাবে।

‘৬৯ সালে গণ অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সে বাম রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। মিরপুর -গাবতলি থেকে পায়ে হেঁটে মিছিল নিয়ে পল্টন ময়দানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ভাসানীর জনসভা শুনে আবার পায়ে হেটে মিরপুর ফিরেছে। তখন সে উঠতি যুবক। মিছিল মিটিং তাকে দারুণ ভাবে টানে। স্বাধীনতাত্তোর কালে সাম্যবাদী দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে।

নাজিম’র ভর্তির ব্যাপারে বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর এ কিউ হাওলাদার স্যারকে একটু বলে রেখেছিলাম। পরীক্ষা দিয়ে তাড়াহুড়ো করে নাজিম হলে ফিরে আসে। এসেই ব্যাগ গুছিয়ে ফেলে। পরীক্ষা কেমন হলো জিজ্ঞেস করতেই বলে “কিছুই লিখতে পারি নাই”। আজই নাইট কোচে সে ঢাকা ফিরে যাবে।

ক’দিনেই বেচারার ইনোসেন্ট ব্যবহার, সততা, স্পষ্টবাদিতা আমাকে মুগ্ধ করে। তার ভর্তির জন্য ভিতর থেকে অধিকতর চেষ্টার তাগিদ অনুভব করি। বললাম কমরেড সপ্তাহ খানেক থাকেন। দেখি কী করতে পারি। সে তার সার্টিফিকেট, মার্কসিট, টেস্টিমোনিয়ালসহ একটা ফাইল রেখে যায়। খবর দিলেই চলে আসবে বলে জানায়।

একদিন নৈশ প্রহরী মুক্তা এসে খবর দেয় স্যার ঢাকা থেকে আপনার ফোন এসেছে। ফোন ধরতেই খাস ঢাকাইয়া ভাষায় “ছিছির ভাই নি? আমি বি কমরেড– “। সে জানতে চায় তার ভর্তির ব্যাপারে কোন আপডেট আছে কি না। তাকে আশ্বস্ত করলাম। কমরেড- হতাশ হবেন না। চেষ্টা করছি দেখা যাক, বাকিটা কপাল।

ভিসি প্রফেসর আব্দুল বারী সাহেবের ভাগ্নে এরশাদুল বারী। আইন বিভাগের শিক্ষক। তাঁকে নাজিমের ভর্তির ব্যাপারে বলতেই বললেন, ‘তোমাদের স্যারকে বলো।’ ইংগিতটা বুঝলাম, তবে তাঁর কাছে এই মুহূর্তে যাওয়াটা আমার জন্য আত্মঘাতী হবে। উল্লেখ্য যে ‘রাজাকার ড. বারী’ বিরোধী আন্দোলন তখন দানা বেঁধে উঠছে।

ডীন’র মাধ্যমে ভিসি বরাবর দরখাস্ত লিখলাম। ডীন ড. জিল্লুর রহমান স্যার ভীষণ কড়া এবং জেদি মানুষ- এক রোখাও বটে। দ্বিধা- শঙ্কা নিয়ে স্যারের চেম্বারে ঢুকলাম
। আমাকে দেখেই খুব আন্তরিক ভাবে বললেন “ওহে বাপু! তুমিতো আমার দেশি মানুষ। তা কী মনে করে? দরখাস্তটা তাঁর সামনে ধরতেই তিনি স্বাক্ষর করে পিয়ন ডেকে সীল মেরে দিলেন। আমি একটু বিনয়ের সাথে বললাম স্যার সুপারিশ কথাটা লিখলেন না ? “ওহে ছেলে সুপারিশ লিখলে তো একটা আঙ্গিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। এখন দিগন্ত প্রশারিত। হিমালয় থেকে সুন্দরবন– বাংলাদেশ।” ড. জিল্লুর রহমান স্যার কড়া- জেদি মানুষ জানতাম। আজ জানলাম ভিতরে ভিতরে তিনি এককজন রসিক মানুষও বটে।

অবশেষে নাজিম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হলো। অল্পদিনের মধ্যেই আমতলা- জয়নালের কান্টিনে রাজনীতির আড্ডায় সে কমরেড নামে পরিচিতি লাভ করে। আদি কুট্টি ভাষা ব্যবহার – সরল বাচনভঙ্গির কারণে সে সকলের প্রিয় কমরেড হয়ে ওঠে। মিছিল শুরু হলে সে দূর থেকে দৌড়ে এসে মিছিলে যোগদিত। মিটিং-এ ছিল তার নিয়মিত উপস্থিতি।

প্রথম থেকেই নাজিম কমরেড আমার রুমে থাকতো। একরাতে আমার মশারির ভিতর মশা ঢুকে পড়ে। অন্ধকারের মধ্যে আমি গামছা দিয়ে বাড়ি মেরে মশা বের করে দেবার চেষ্টা করছিলাম। ঘুমের ঘোরে শব্দ শুনে নাজিম লাফিয়ে ওঠে এবং ধর ধর ধর বলে চিৎকার দেয়। আমি বলি এই নাজিম আমি – আমি। কে শোনে কার কথা। সে লাফিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। আমি মশারির মধ্য থেকেই জোরে ধমক লাগাই। তখন তার সম্বিত ফেরে। সে একদম চুপ হয়ে যায়। বিছানায় বসে হাঁপাতে থাকে এবং বলে “আমি ভি হালায় ভাব্বার লাগছি বাইরে থেকে কেউ আপনারে এটাক করলোনি।”

ইতোমধ্যে আশেপাশের দুএকজন ঘুম থেকে উঠে এসে বারান্দা দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। শব্দটা কোন রুম থেকে এলো কেউ ঠাহর করতে পারছেনা।

কমরেড এলএল-এম. শেষ করে ঢাকায় ফিরে যায়। যাবার আগে ধরা গলায় সে বলে “ছিছির ভাই– এই ডিগ্রি আপনার–।” সেদিন তার চোখের কোণায় জল দেখেছি।

‘৮২ সালে ঢাকার শুক্রাবাদে সে একবার আমার ভাইয়ের বাসায় এসেছিলো। ঐ সময় আমি বাসায় ছিলাম না। আমার জন্য সে একটি রিস্টওয়াচ, কলম, পারফিউম রেখে যায়। সাথে ছোট্ট একটি চিরকুট “আমার চাচা কুয়েত থেকে আপনার জন্য এনেছেন।”

পরবর্তিতে ব্যস্ততার কারণে খুব একটা যোগাযোগ ছিলোনা। এইতো সেদিন! হঠাৎ সে আমার বাসার দরজায় এসে হাজির। পাশের ফ্লাটে এসেছিল। কথা প্রসঙ্গে সে শুনেছে আমি এখানে থাকি। কোন মতেই তাকে আমার বাসার ভিতরে আনতে পারলাম না। “আমি আজ খালি হাতে– অন্যদিন আসবো। বাসা চিনে গেলাম।” বিজনেস কার্ড দিয়ে গেল। মনে হলো- এতো বছর পরও রাবি’র সেই কমরেডই রয়ে গেছে। এতোটুকুও বদলায়নি।

একদিন বাসায় ফোন করলাম, এক ভদ্রমহিলা রিসিভ করলেন। “আপনি শিশির ভাই? নাম্বারটা সেফ করা আছে। ভাই আপনাদের নাজিম তো নেই।”
নেই মানে!
“প্রায় একমাস হলো উনি মারা গেছেন।”

কমরেড! মিছিলে- মিটিং- এ সব সময় তুমি আমার পাশে থাকতে। সে রাতে আমাকে বাঁচাতে তুমি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে–। অথচ তুমি আমাদের কোন সুযোগ না দিয়েই চলে গেলে না ফেরার দেশে। আমরা শোকাহত। ভালো থেক কমরেড।-লেখক: একজন সমাজকর্মী।
২১ জুলাই, ২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, ঢাকা