স্মরন:বিপ্লবে আগুনের ফুলকি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

38

অরুপ কুন্ডু: একটি সাহসের মৃত্যু হয় ২৪ সেপ্টেম্বর। অস্ত্রহাতে যারা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন,মাতৃভূমির নামে জীবন দিয়েছেন অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাদের মধ্যে অগ্রগন্য। এই দিন সেই সাহসী বীর তরুনী দেশকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে মৃত্যুকে কাছে টেনে নেয়। যার সাহস দেখে ইর্ষা করা উচিত এ যুগের মেয়েদের। যে ইর্ষা উৎসাহ দেয় যুগ যুগ ধরে নারী মুক্তির এবং ঘুনে ধরা সমাজ ভাঙ্গনের জন্য। যে ইর্ষা মানুষকে অনেকদিন মরতে দেয় না। বিখ্যাত উপন্যাসিক এমিল জোলা’রের কবরের দাঁড়িয়ে আরেক বিখ্যাত সাহিত্যিক আনাতোলা ফ্রাঁস সবাইকে বলেছিলেন,” ওনাকে ইর্ষা করো। ওনাকে ইর্ষা করেই আমরা মহৎ হতে পারি”।

১৯১৩ সালে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম হয় চট্রগ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একজন কেরানী ছিলেন। প্রীতিলতার ডাক নাম ছিল রানী।১৯২৮ সালে চট্রগ্রাম খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩০ সালে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আই.এস.সি পাশ করেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের মধ্যে থেকে ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান লাভ করেন। এবং মাসিক ২০ টাকা বৃত্তিপ্রাপ্ত মেধাবী ছাত্রীর খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। অনার্স শেষ না করেই ১৯৩২ সালে বি.এ পাশ করে চট্রগ্রামে ফিরে আসেন। তার বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়ে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে শিক্ষক হবেন। নন্দনকানন স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরূ ও করেন। কিন্তু সংসারের হাল ধরতে পারেননী। পঞ্চাশ টাকার কেরানীর চাকরী থেকে বাবাকে নিস্কৃতি দিতে পারেননী। কারন বাবা হয়ে তিনি তার মেয়ের মন বোঝেননী। মেয়ের মনে ছিল বিপ্লব। পরিবারিক বন্ধন তার কাছে ছিল তুচ্ছ। পিতা-মাতার ২য় সন্তান হয়ে নিজেকে বৃটিশদের শত্রু হিসেবে চিনিয়ে দিতে ভুল করেননী তিনি।

আর্জেন্টিনার বিপ্লবী ’চে গুয়েভারা’র জীবন ভাবনা এক হয়ে গিয়েছিল প্রীতিলতার নি:শ্বাষে বিশ্বাসে। ”আমি কোন বন্ধন মানি না। না দেশের, না পরিবারের। সব কিছু নি:শেষে ছেড়েছি বলেই সব কিছু পেয়ে গেছি আমি। পেয়েছি অসংখ্য মানুষের ভালবাসা। একান্ত অন্তরে শুনেছি বিপ্লবের অমোঘ আহব্বান”। তাইতো তিনি বিপ্লবী সূর্যসেনের প্রথম তরুনী যোদ্ধা হতে পেরেছিরেন। আগুনের ফুলকী হয়ে প্রায় দু’শো বছরের বৃটিশ শাসন অবসানে ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন।

রানী ৮ম শ্রেনীতে পড়ার সময় একই স্কুলে উষাদির সাথে মধুর সম্পর্ক হয়। উষাদির সাথে একদিন যান
”আলাপ-আড্ডা ক্লাশের ইতিহাস পাঠে”। সেই থেকেই রানীর দেশপ্রেমের চেতনা জেগে ওঠে। আর ম্যাডামের কাছ থেকে ’সুবেদা স্বাধীনতা’(ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এর জীবনী) পড়ে বিপ্লবী চেতনার সূত্রপাত হয়।

রানী তখন ইডেন কলেজে পড়ে। ছুটিতে বাড়ী এসে জানলেন চট্রগ্রামে স্কুল-কলেজে ধর্মঘট চলছে। তিনি
খাস্তগীর স্কুলের পক্ষে পিকেটিং করলেন। তখন পরিচয় হয় চট্রলার একজন ত্যাগী বিপ্লবীর সাথে। এই পরিচয় তাকে অস্ত্র হাতে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখায়। আগুন নিয়ে খেলার শিক্ষাটা সেই বিপ্লবী ভালভাবে শিখিয়ে দেন রানীকে। তিনিই রানীকে দিপালী সংঘে নিয়ে আসেন। রানী দিপালী সংঘে এসে অস্ত্র চালনা,ছদ্মবেশ ধারন,লক্ষ্ভেদ ইত্যাদির শিক্ষা নেন। স্কুলে পড়ার সময় রানী খেলাধুলা,গার্লস গাইড প্রভৃতির সাথে জড়িত ছিলেন। স্কুল জীবনের শিক্ষা তাকে দিপালী সংঘে কৃতিত্ব এনে দেয়। তাহলে রানীর ছদ্মবেশ ধারনের একটা গল্প শোনা যাক। ”চট্রগ্রাম অস্ত্রাগার লুটের মামলায় ইংরেজ সরকার চৌদ্দ জন বিপ্লবীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড,উনিশ জনকে খালাশ দিয়ে আবার তাদের যাবজ্জীবন দীপান্তরে পাঠায়”। সূর্যসেন ঠিক করলেন অত্যাচারী পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল’ক্রেক’কে হত্যা করবেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালীপদ চক্রবর্তীকে দিলেন দায়িত্ব। এই দুজন ভুল করে হত্যা করেন উচ্চপদস্ত একজন রেল পুলিশ অফিসারকে। এবং ধরা ও পড়েন এই দুজনে। বিচারে কালিপদ চক্রবর্তীর যাবজ্জীবন দীপান্তর হয় এবং রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির আদেশ হয়।

১৯৩১ সালে যেদিন রামকৃষ্ণের ফাঁসি হবে সেদিন তার বোন নমিতা এসেছিল দাদার সাথে দেখা করতে।
মুখোমুখি অনেক কথা ও বলেছিল। দুজনের মুখেই তখন আনন্দের আলো ফুটে উঠেছিল। দাদা বোনকে
বলেছিলেন”চললাম নমিতা। তোরা রইলি। বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাস”। এই নমিতা ছদ্মবেশে রানী দাদার সাথে চল্লিশবার দেখা করেছিল। অগ্রজ বিপ্লবীকে হাসিমুখে বিদায় দিয়েছিল।

১৯৩০ সালে এপ্রিল মাসে মাষ্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে সংঘঠিত ’চট্রগ্রাম অস্ত্রাগার দখল,টেলিগ্রাফ ও টেলিগ্রাম অফিস ধংস,রিজার্ভ পুলিশ লাইন অধিকার’ হয়। সারা ভারতবর্ষের অত্যাচারিত জনগন তখন মুক্তির প্রহর গুনতে থাকে। প্রীতিলতাকে ও সেসময় উন্মুল করে তোলে বিপ্লবের প্রতি।

১৯৩২ সালে ১২ জুন সন্ধ্যায় ধলঘাটের বিপ্লবীদের গোপন আস্তানায় প্রীতির সাথে সাক্ষাৎ হয় সূর্যসেন ও নির্মল সেনের সাথে। বিশ্বাসঘাতক জনগনের খবরে ব্রিটিশ পুলিশ সেখানে আক্রমন করে। নির্মল সেনের গুলিতে ক্যাপ্টেন ক্যমারন গুলিবিদ্ধ হয় এবং নির্মল সেনের বুকে গুলি লাগে। সূর্যসেন প্রীতিলতাকে নিয়ে নিরাপদে বের হয়ে যান। ইংরেজরা বাংলার বিপ্লবকে কোনদিন সহ্য করেনী। তারা বিপ্লবকে ধংস করতে চেয়েছে। কিন্তু তারা জানেনা বিপ্লব কখন ও মরে না। বিপ্লবকে মারা যায় না। বিপ্লব অমর।

সূর্যসেন পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েদের সম্মুখসারির বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বিপ্লবী নরেশ রায় ও ১৯৩২ সালের ১০ আগষ্ট তরুন বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তী নেতৃত্বে চট্রগ্রামের ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমন ব্যর্থ হয়। তখন সফলতার জন্য তৈরি করেন প্রীতিলতাকে।

১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সূর্যসেন ইউরোপীয়ান ক্লাব ধ্বংস করে ইংরেজ হত্যার চুড়ান্ত কাজ দিলেন
প্রীতিকে। সেদিনের প্রীতিকে চেনা কঠিন। পরনে ছিল মিলিটারি খাকি প্যান্ট-শার্ট,মাথায় টুপি,কোমরে রিভলভার।সহযাত্রী ছিলেন সুশীল দে,প্রফুল্ল দাস, মহেন্দ্র চৌধুরি, কালীকিংকর দে, ধিরেশ্বর রায়, শান্তি চক্রবর্তী। পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ বিপ্লবীদের নেতৃত্বে আছে অনভিজ্ঞ উনিশ বছরের এক তরুনী।

সন্ধ্যা থেকেই পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাবে সাহেব মেমদের নাচ গানের জমজমাট অনুষ্ঠান চলতে থাকে। প্রীতির নেতৃত্বে সাত সদস্যের দলটি ক্লাবের রান্নাঘরের পিছনে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকে। রান্নার বাবুর্চির পর পর তিনবার লাইটের সংকেতে এগিয়ে যায় বিপ্লবী দলটি। বিপ্লবীদের কয়জন ঢুকল সামনো থেকে গাড়ীর কোচোয়ান ছদ্মবেশে। প্রীতিসহ অন্যরা ঢুকল পিছনের রাস্তা দিয়ে। মহেন্দ্র ও সুশীল ঢুকেই একসাথে ক্লাবঘরে হাতবোমা ছুড়তে থাকে। প্রীতি ও অন্যরা একত্রে চালাতে থাকে এলোপাথাড়ী গুলি। তখন ক্লাবঘরে সাহেব মেমদের সে কী বিজাতীয় কান্না। মারা গেল অনেক ইংরেজ। কয়েক মুহূর্তে অপারেশন শেষ হয়ে যায়।

সবাইকে একত্রিত করে পিছনে পাঠিয়ে নেত্রী থাকে সবার সামনে। ক্লাব পেরিয়ে ওরা উঠে আসে বড় রাস্তায়।তখন পশ্চিমদিকের নালা থেকে এক ইংরেজ গুলি করে পালিয়ে যায়। সেই গুলিটা এসে প্রীতির দেহে লাগে। হাটু ভেঙ্গে লুটিয়ে পড়ে তার দেহ। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে শার্টের বাম পকেট থেকে পটাসিয়াম সায়ানাইডের ক্যাপসুলটা বের করে খেয়ে ফেলে। একসময় হাতটা মাটিতে পড়ে যায় নিথর ভঙ্গিতে। এরই সাথে ইতিহাসের সবুজ পাতায় উঠে যায় বাংলার প্রথম নারী শহীদের নাম … …… প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। নিজের লেখা কবিতার মত সত্য হয়ে উঠে তার আত্মদান,
”আঁধার পথে দিলাম পাড়ি
মরন- স্বপন দেখে” । -লেখক: অরুপ কুন্ডু, বানারীপাড়া পৌরসভা, বরিশাল।
তারিখ: ২১.০৯.২০২০

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।