স্বপ্নের বাহনে দুঃস্বপ্ন

2

দুর্ঘটনা আমাদের জীবনে এক নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। তার মধ্যে একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হলো কসবা-মন্দবাগের ট্রেন দুর্ঘটনা। তাৎক্ষণিক প্রাণহানি এবং অজস্র মানুষের আহত হওয়ার আহাজারিতে এখনও সেখানকার বাতাস ভারি হয়ে আছে। সব দুর্ঘটনারই মূল কারণ চালকের দায়িত্বহীনতা। এখন পর্যন্ত এই ট্রেন দুর্ঘটনায় জানা কারণ হচ্ছে, চালক সিগন্যাল মানেনি। এই সিগন্যাল না মানা আমাদের একটি জাতীয় চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু যে সড়কে, তা নয়; এটি আমাদের জাতীয় চরিত্র হিসেবেই দাঁড়িয়ে গেছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন- এসব ক্ষেত্রেও কেউ সিগন্যাল মানছে না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিষেধ সত্ত্বেও কেউ কর্ণপাত করছে না অথবা বার্তাটি তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এই যে অকালে অপঘাতে কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তার ভয়াবহতা বোঝার ক্ষমতা অশিক্ষা-কুশিক্ষায় এবং দায়িত্বহীন প্রশ্রয়দাতাদের বোঝার ক্ষমতাও নেই।

বর্তমান সরকার বুঝতে পেরেছে, রেলপথ ছাড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পরিবহন ব্যবস্থাকে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। যেটি ভারত বুঝতে পেরেছে ৭০ বছর আগে, জাপান বুঝতে পেরেছে আরও আগে। চীন বুঝতে পেরেছে বিপ্লবের পরপরই। কিন্তু ১৯৭২ সালে রেলপথের জন্য একটা সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা থাকলেও ‘৭৫-এর পর তা একেবারেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশের গড়া বড় বড় রেলের কারখানা লোপাট হয়ে যায়। এমনি লোপাট হয় যে, এসব কারখানার নাট-বল্টুও চুরি হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের আগের রেলপথ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং তার স্থলাভিষিক্ত হয় বাস, মিনিবাস, টেম্পো, এসব। দেশে মানুষের চলাচল যত বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে এসব পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনচালিত যানবাহন। যার জন্য তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে বিপুল মূল্য দিয়ে কিনে আনতে হয় এসব জ্বালানি। সরকারকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে এসব যানবাহন চালাতে হয়। এমনকি যতটুকু রেলপথ ছিল, ততটুকুও চলত এবং এখনও চলছে ডিজেল ইঞ্জিন দিয়ে। পৃথিবীর কোথাও আর ডিজেল ইঞ্জিল আছে কিনা সন্দেহ। পাশের দেশ ভারতে অথবা চীনে বহু আগে, প্রায় ৬০ বছর আগেই তারা রেল ব্যবস্থাকে বিদ্যুতায়িত করেছে। আসলে আমাদের রেল ব্যবস্থাকে বিদ্যুতায়িত না করার কারণও হচ্ছে দুর্নীতি।

আমি একবার লালমনিরহাট থেকে পাটগ্রাম যাচ্ছিলাম ট্রেনে চড়ে। তখন এরশাদ সরকারের আমল। আমার কামরায় বেশ কিছু গণমান্য লোক ছিলেন, যাদের মধ্যে এলাকার সাংসদও ছিলেন। হঠাৎ অনির্ধারিত এক স্থানে ট্রেনটা থেমে গেল এবং কিছুক্ষণ পর জনগণের হল্লা শুনতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? জানলাম, ট্রেনচালক ডিজেল চুরি করে বিক্রি করছে। জনগণের হল্লা শুনে ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল। আমাদের কামরায় বসে থাকা একজন প্রবীণ বললেন, এই ডিজেল চুরির টাকা একেবারে এখান থেকে শুরু করে রেলের ওপর মহল পর্যন্ত যায়। এর পর রেলের একজন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আমার দেখা। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের ট্রেনগুলোর কি বিদ্যুতায়ন সম্ভব নয়? তিনি আমার অজ্ঞতা দেখে হাসলেন। তারপর বললেন, রেল তো জ্বালানিতে চলে। জ্বালানিটি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বিদ্যুৎও একটি শক্তি। একসময় ট্রেন বাষ্পের শক্তিতে চলত। তারপর কয়লার শক্তিতে, তারপর তেলের শক্তিতে। এখন সারাবিশ্বে চলছে বিদ্যুতের শক্তিতে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাকে পেন্সিল দিয়ে এঁকে দেখালেন, কত সহজে এই ইঞ্জিনগুলোকে বিদ্যুতের শক্তিতে চালানো সম্ভব।

তেল একটা বড় ব্যবসা। এই ব্যবসায় মুনাফা দুই পক্ষেরই। যারা বিক্রি করে, তারাও উচ্চমূল্যে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের কাছে বিক্রি করে, মাঝখানে অনেক কমিশনভোগী এবং সব শেষে ওই চালক পর্যন্ত তা ভোগ করে থাকে। সরকারি গাড়ির তেল চুরি একটা বহুল আলোচিত বিষয়। কাজেই এই তেলকে সর্বত্র জিইয়ে রাখা দুর্নীতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর একটা বড় প্রয়োজন। তেলের জায়গায় এখন আমাদের নিজস্ব গ্যাস আছে। সেই গ্যাসও বাস, ট্রাক, ছোট-বড় গাড়ি, সিএনজি ভারত থেকে আমদানিকৃত লেগুনায় ব্যবহূত হয়ে আসছে। ফলে অতি দ্রুতই আমাদের সঞ্চিত গ্যাসে টান পড়বে। এই গ্যাস দিয়ে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চলে আসছে। আমরা শুধু রেলে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য এই গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারি, যা দিয়ে পুরো দেশের রেল ব্যবস্থাকে বিদ্যুতায়ন করা সম্ভব। আসলে পুরো জাতি একটা জায়গায় গিয়ে ফেঁসে গেছে। তা হলো, দুর্নীতির মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়ার দর্শনে। যে চালক তেল চুরিতে অভ্যস্ত, সেই চালকের পক্ষে কোনো নৈতিক অবস্থান নেওয়া, শৃঙ্খলা মেনে চলা অসম্ভব। পুরো পরিবহন শ্রমিক এবং পুলিশের মধ্যে যে আঁতাত গড়ে উঠেছে, তারও প্রতিবিধান সম্ভব হয়নি। সিগন্যাল বা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে পুলিশ কিছু টাকা, কখনও অল্প, কখনও বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। এগুলো এখন আর গোপন বিষয় নয়।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বর্তমানে সাংসদ; একবার পুলিশকে প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখে প্রহারও করেছিলেন। সেটিও গোপন থাকেনি। কিন্তু ওই ঘটনার পরও যে পুলিশে শৃঙ্খলা চলে এসেছে, তা নয়। তূর্ণা নিশীথার চালক ও সহকারী যে দায়িত্বহীনতা দেখিয়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বহুদিন আগে সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন একটা রিপোর্ট করেছিলেন উত্তরবঙ্গের কোনো একটি জায়গায় চালক ছাড়া ট্রেন কয়েকটি স্টেশন অতিক্রম করেছিল। পরে একজন অত্যন্ত সাহসী চালক চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে উঠে ট্রেনের গতিরোধ করেছিলেন। বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশের জমি রেলের। ব্রিটিশ রেলকে কেন্দ্র করে অনেক শহর গড়ে তুলেছিল। তখন রেল ছিল স্বয়ংসম্পূূর্ণ। রেলের পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থা, পানি, কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা, সিগন্যালিক সিস্টেম- এসবই ছিল রেলের নিজস্ব। রেলকে নিরাপদ রাখতেও অনেক ব্যবস্থা ছিল। সেগুলোকে অনেক জায়গায়ই আধুনিকায়ন করা হয়নি। আজকে যখন সরকার রেলপথের সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়নের পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার মধ্যে এ ধরনের একটি দুর্ঘটনা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। প্রধানমন্ত্রী উচ্চতর ট্রেনিংয়ের কথা বলেছেন; সেই সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত রেল প্রশাসন প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরে যে দুর্নীতি রেলের লাল দালানের মধ্যে সঞ্চিত হয়েছে এবং নতুন নতুন কৌশল আবিস্কৃৃত হয়েছে, সেখানে দুর্নীতিমুক্ত করা, শৃঙ্খলা মেনে চলা কী করে সম্ভব? তবুও রেলের উন্নয়নে, দেশের মানুষকে সুন্দর পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে রেলের কোনো বিকল্প নেই। সরকার ঢাকা শহরে মেট্রোরেল চালু করছে। ঢাকা ও এর আশপাশের শহরগুলোকে সংযুক্ত করার প্রয়োজন মেটাবে এই রেল। অদূর ভবিষ্যতে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি, একশ’-দেড়শ’ কিলোমিটার দূর থেকে রাজধানীতে এসে চাকরি, কাজ শেষে আবার মানুষ ফিরে যাচ্ছে তার গৃহে। যেমনটি হয় কলকাতা, মুম্বাই বা টোকিওতে। যে কলকাতা শহরে দুপুরবেলার জনসংখ্যা দুই কোটিরও বেশি, সেই জনসংখ্যা রাত্রিবেলায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ কমে যায়। কারণ বহরমপুর, শান্তিপুর, বনগাঁও অথবা বোলপুর ক্যানিং থেকে লোকজন আসে এবং তারা চলে যায়। এখানেও সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে কাজ সেরে আবার চলে যাবে। রেল ব্যবস্থা যদি সুলভ হয়, তাহলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কমে যাবে, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও হ্রাস পাবে। রেল মানুষের জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে একাকার হয়ে যাবে।

এ তো গেল অনাগত কালের কথা। কিন্তু বর্তমানে সড়কের মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারছি না আমরা। তার মধ্যে আবার রেলপথেও দুর্ঘটনা ঘটল। রেল যে একেবারে দুর্ঘটনামুক্ত পরিবহন; তা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই যে রেল দুর্ঘটনা হয় না, তাও নয়। কিন্তু সেসব জায়গায় পাঁচ সেকেন্ড পরপর ট্রেন চলে। সেখানে কম্পিউটার জটিলতা, বিদ্যুতের সংকট এবং কোনো ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে রেল দুর্ঘটনায় পড়তে পারে। কিন্তু সিগন্যাল অমান্য করার জন্য নয়। সমাজে সিগন্যাল না মানা; রেফারি না মানা একটা প্রবণতা আছে এবং এই প্রবণতাকে আবার উস্কে দিয়েছে ঢাকা শহরের সিগন্যালবিহীন ট্রাফিক ব্যবস্থা। হাজার হাজার গাড়িকে একজন ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করছে আদিম ব্যবস্থায়। এর কারণ এখনও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। লালবাতিতে গাড়ি চলে, সবুজ বাতিতে বন্ধ- এটা ঠিক না হলে সিগন্যালিং ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন। স্বপ্ন দেখি একটি চমৎকার রেল ব্যবস্থা, যাতে দেড়-দুই ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম পৌঁছতে পারি। সুশৃঙ্খল টিকিট ব্যবস্থা, সুনিশ্চিত আরামদায়ক সিট; যেখানে মাঝপথে কিছু দুর্বৃত্ত উঠে আমাদের রোমান্টিক ট্রেনযাত্রাকে বিঘ্নিত করবে না। চাই রেলে সবচেয়ে অগ্রাধিকার।-লেখকঃসাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব(সূত্র:সমকাল)