স্কটল্যান্ডের পথে পথে..

18

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ লন্ডন থেকে গ্লাসগো যাবার পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল। প্লেনে করে যাবার পরিকল্পনাটা একেবারেই ঠিক হয়নি। খুব ভাল হতো ট্রেনে করে গেলে। ছিমছাম ট্রেনে ইংল্যান্ড থেকে স্কটল্যান্ড। চারদিকের সবকিছু দেখতে দেখতে যাওয়া যেত। ইংলিশ আর স্কটিশ মাতৃভূমির অপার সৌন্দর্য্য চোখ মেলে দেখা যেত। এ যাত্রায় দেখতে পারেনি বলে সঙ্গের সাথী ডঃ মনিরুল ইসলামের সে কী বকবকানি! আফটার অল প্রফেসর সাহেবের বকবকানি। একবার শুরু হলে আর থামেন না। বকবক করেন আর প্লেনের জানালায় উঁকি মারেন।
উঁকি মেরে নীচে দেখার চেষ্টা করেন। ছোট্ট জানালায় চোখ মেলে এদিক ওদিক দেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই পারেন না। দেখতে পারেন না। দেখার উপায়ই নেই। কেবলই সাদা মেঘ আর মেঘ। মেঘ রাশির মেলা জমেছে নীচের আকাশ জুড়ে। এসবে তাঁর মেজাজ আরো গরম হয়। তিনি লেকচার শুরু করেন। মেজাজী লেকচার; “বাঙালীর কপাল পোড়া এই কারণেই। পরিকল্পনা ছাড়াই দৌঁড়ায়। কিছু করার আগে পরিকল্পনা করা জরুরী। বাঙালী ডুবলো শুধু এই পরিকল্পনার অভাবে।” বলেন আর আড়চোখে আমার দিকে তাকান। মেজাজটা তাঁর পুরোপুরি আমার উপর। আমার উপর মেজাজ দেখান আর নিচের দিকে তাকান। কিন্তু কিছুই দেখতে না পেয়ে আবার খ্যাঁচ করে ওঠেন।
খ্যাঁচ করলেও সমস্যা হয় না আমার। তাঁর এসব খ্যাঁচখ্যাঁচে আমি বেশ অভ্যস্ত। বহু বছর আগ থেকেই অভ্যস্ত। আমার সয়ে গেছে। সয়ে যাবার মূল কারণ মানুষটার সরলতা। চেহারা এবং ভাবসাবে ভারী ভারী এবং রাগী টাইপের দেখালেও স্বভাবে একেবারেই সাদামাটা এবং খুবই আমোদী টাইপের। সামান্য একটু মজা করার সুযোগ পেলেই অসামান্য রকমের মজা করেন। এমনি এই মানুষটার সঙ্গে আমার শোনিম বিহীন দূরদেশেও ক’টা দিন যে বেশ মজায় কাটবে, আনন্দে কাটবে; তা আমি ঢের জানি।
আর এটাও জানি, সবকিছু সব সময় পরিকল্পনা করে করা হয় না। করা যায়ও না। হয়ত এ জন্যেই আমার পরিকল্পনায়ও ত্রুটি ছিল। কিন্তু রাশেদের পরিকল্পনায় কোন ত্রুটি ছিলো না। রাশেদুল হক; বৃটেন প্রবাসী বাংলাদেশী। একটা বিচ্ছু। জানে না এমন কিছু নেই। আবার পারেও না এমন কিছু নেই। বৃটেনে আছে আজ সাত বছরেরও বেশী। বৃটেন বলতে শুধু ইংল্যান্ড নয়; স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড সবখানেই তার বিচরণ। সাত বছর খুব বেশী সময় হয়ত নয়। কিন্তু এই অল্প সময়ে নিজেকে তৈরী করতে বাদ রাখেনি কান কিছু থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেছে দু’বার। পিএইচডি’র প্রস্তুতিও নিচ্ছে। অমানুষিক পরিশ্রম করেই এসব করেছে। তবুও হাল ছাড়েনি।
জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রামে যে হাল ছাড়তে নেই এটা ও জানে। বেশ ভালো করেই জানে। আর জানে বলেই যুদ্ধে জয়ী হয়ে ধুমছে ব্যবসা করছে দুই ভাই মিলে। রাশেদ আর হাসান; উচ্চশিক্ষিত এবং স্মার্ট। আপন দু’ভাই। ইতিমধ্যেই দু’দুটো রেস্টুরেন্ট দিয়েছে স্কটল্যান্ডে। সমুদ্রের ধারের জমজমাট রেস্টুরেন্ট। চলছেও বেশ। বয়স এখনও ত্রিশ পার করেনি। অথচ পাক্কা ব্যবসায়ী। গার্মেন্টস ব্যবসাও করছে। বেশ জমিয়েই করছে। ঢাকা থেকে প্রতিমাসে শিপমেন্ট হচ্ছে ওদের গার্মেন্টস পণ্যের।
লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে রাশেদকে প্রথম দেখায় এতটা মনে হয়নি আমার। মনে হয়েছে পিচ্চিপাচ্চা বালক। সাইজেও খাটো। কিন্তু যখনই আমাদের দু’জনার সবগুলো লাগেজ একা হাতে টেনে দৌঁড়াতে শুরু করলো তখন অবাক হয়েছি। শুধু ঔইদিনই নয়; অবাক হয়েছি প্রতিদিন। যে ক’দিন ছিলাম প্রতিটি দিনই ওর প্রতিভা আর আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ নয়নে অবাক হয়েছি। ওর ক্যারিশম্যাটিক কৌশলে সুবোধ বালক সেজে ওকে ফলো করেছি। মনে হয়েছে ওকে ফলো করা ছাড়া আমাদের আর কিচ্ছু করার সুযোগ নেই।
নিজেদের পকেটে হাত দেবার সুযোগও নেই। কেবল সুযোগ হয়েছিল চমৎকার একটা শিক্ষানগরীকে দেখার। দারুণ সুযোগ। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো নগর। শিক্ষানগরী তো বটেই। প্রায় ছয়শত বছর আগে এই শহরে বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল ১৪৫১ সালে।
জগত সেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হবার পর থেকে আজো সুনাম অক্ষুন্ন রেখেই বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ শহরে গ্লাসগো কেলেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ ক’টি বিশ্ব র‌্যাংকিং এর উপর ধাপের বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তবে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়টি আলাদা। যেমনি এর আভিজাত্য, তেমনি এর স্থাপত্যশৈলীর আঙিনা। এর আঙিনায় কিংবা আনাচে কানাচে যতবার হেঁটেছি ততবারই ইচ্ছে হয়েছে আবার নতুন করে জন্ম নিতে। পূনর্জন্ম নিয়ে ফিরে আসতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে।
এখানে যে ক’টা দিন ছিলাম অনেকটা ছাত্র হয়েই ছিলাম। রিসার্চ কনফারেন্সের নানা প্রোগ্রামের ভীড়ে কিংবা নিজেদের রিসার্চ পেপার প্রেজেন্টেশনের ছকবাঁধা আয়োজনে নিজেদেরকে ছাত্র মনে করা ছাড়া উপায়ও ছিল না। ছাত্র জীবনে ফিরেও গিয়েছিলাম। ঘুরেও বেড়িয়েছি। বাঁধা বন্ধনহীন মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেরিয়েছি। ফ্রি সময়গুলোতে হুটখোলা দোতলা বাসে করে শহর বেড়িয়েছি। নয়ন মেলে মুগ্ধ চোখে দর্শনীয় স্থানগুলো অবলোকন করেছি। পর্যটকে গিজগিজ করছে শহরটি। হাজার বছরের কৃষ্টি আর ঐতিহ্যের শহর গ্লাসগো অপরূপ মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এত্তএত্ত পর্যটকদের তীর্থস্থান হয়ে।
তীর্থস্থান তো পুরো দেশটাই। গ্লাসগো থেকে ক্যাম্পবেলটাউন; ১২০ মাইল দূরের গ্রামীন শহর। ১৮ হাজার অধিবাসীর ছোট্ট শহর। আটলান্টিকের তীর ঘেষে স্কটল্যান্ডের একেবারে শেষ মাথার শেষ শহর। এরপরই কেবল পানি আর পানি। অথৈই জলরাশির ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের মনমোহিনী গর্জন। এখানেই ব্যবসা পেতেছে রাশেদরা। সমুদ্রের একেবারেই তীরঘেষে ওদের রেস্টুরেন্ট তাজমহল। সারাক্ষণ বৃটিশ কাষ্টমারে ভরা থাকে। অর্ধেক এলাকাবাসী আর বাকী অর্ধেক পর্যটক।
পর্যটক হিসাবেই আমরা ক্যাম্পবেলটাউন যাচ্ছি। সাত সকালেই ট্যাক্সি নিয়ে এসেছে রাশেদ।
ড্রাইভার স্কটিশ। ১৬০ কিমিঃ গতিতে গাড়ী চলছে। তবে বোঝা যায় না। দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু পথে চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। শুধু পাহাড় আর পাহাড়। এখানে সেখানে পাহাড়ের মাঝে সমুদ্র ঢুকে পড়েছে। বড় চমৎকার দৃশ্য। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝর্ণা যেমনি নেমেছে, তেমনি নেমেছে সারি সারি মেষ আর গরুর পাল। মাইলের পর মাইল জুড়ে কেবলই পশুদের পাল। পশুদের খামার।
পাশেই কৃষকের ঘর। কিষানির হাঁটাচলা। স্কটিশ আধুনিক কিষান কিষানী। পুরো এলাকা জুড়েই এমন দৃশ্য। চোখ ফেরানো যায় না। ক্যাম্পবেলটাউন থেকে কিছুটা দক্ষিণে সাউথএন্ড সিটি। আয়তনে আরো ছোট। এটা একেবারে সমুদ্রের তীর ঘেষে। এখান থেকেই আয়ারল্যান্ড দৃষ্টিগোচর হয়। প্রায় ১২ নটিক্যাল মাইল সমুদ্র সীমানার ওপারে আয়ারল্যান্ড। একেবারে দক্ষিণে বলেই এর নাম সাউথএন্ড। জায়গাটি বিখ্যাত হয়েছে কলম্বাসের প্রথম পদচিহ্নের জন্যে। পাহাড়ের সামান্য উপড়ে পাকা পাথরের গায়ে সেই চিহ্ন আজো সংরক্ষিত আছে পর্যটকদের জন্যে।
পর্তুগীজ নাবিক কলম্বাস ধর্ম প্রচারের জন্যে প্রথম বৃটেনে আসেন ঠিক এই পথ দিয়ে। শুধু তিনি নন; এ পথে হেঁটেছেন বিখ্যাত স্কটিশ কবি ও লোকগান সংগ্রাহক রবার্ট বার্নসও। ১৭৮৮ সালের কোন একদিন তিনি হাঁটতে হাঁটতে এক বৃদ্ধ মেষপালকের কন্ঠে শোনেন চমৎকার সুরের একটি গান। গানটি তিনি সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীতে নিজস্ব দুটি লাইনও মূল গানের সঙ্গে যোগ করে দেন। ১৭৯৯ সালে তাঁর রচনা হিসাবে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বহুল শ্রুত এই স্কটিশ লোকগীতি সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে একদিন। এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
জনপ্রিয় সেই গানটি মনে ধরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও। ভীষন মনে ধরে। তাঁর স্কটল্যান্ড ভিজিটের সময়ই ব্যাপারটি ঘটে। তিনি গানটি শোনেন এবং মুগ্ধ বদনে বারবার বাজিয়ে শোনাতে বলেন। শুধু সুরই নয়; গানটির কথা এবং ভাবের দ্বারাও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন তিনি। এবং এক সময় সুর এবং ভাব অবিকল ঠিক রেখে বাংলা ভাষায় সৃষ্টি করেন কালজয়ী এক নতুন সংগীত। স্কটিশ রাখালের কন্ঠে শোনা আধুনিক রবীন্দ্র সংগীত; পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়! ও সেই চোখের দেখা প্রাণের কথা সে কী ভোলা যায়! -লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।