সেই ছাত্রলীগ এখন কোথায়

যুগবার্তা ডেস্কঃ ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ছাত্র আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধ- এককথায় দেশের ইতিহাসের প্রতিটি উজ্জ্বল পর্বে ছাত্রলীগের অনেক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সংযুক্ত আছে। তবে অতীত ঐতিহ্য এখন অনেকটাই ম্লান। জনমনে প্রশ্ন- সেই ছাত্রলীগ এখন কোথায়? কেন হারাল ঐতিহ্য? সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা কেনই বা একের পর এক কলঙ্কিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন? কেন বারবার বেপরোয়া, বেসামাল ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছেন তারা?

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই সেদিন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নাম থাকলেও অল্পকাল পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামে কার্যক্রম চলে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাসই বাঙালির ইতিহাস।’ ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি’ নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬-এর ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ‘৯৬-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ সব প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন।

ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করেছেন, ১৯৯০ দশকের পর থেকেই ধূসর থেকে ধূসরতর হয় ছাত্রলীগের ঐতিহ্য, খসে পড়তে থাকে গৌরবের পালক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই সংগঠনের নেতাকর্মীরা শিক্ষাঙ্গন ও পাড়া-মহল্লা, নগরে-বন্দরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দরপত্র ছিনতাই, ঠিকাদারি বেচা-কেনা, ছাত্রাবাস দখল, ভর্তি ও সিটবাণিজ্য ইত্যাদিতে মেতে ওঠে এবং ক্রমে এসব স্বার্থের সংঘাতে নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষ, মারামারি ও খুনোখুনি হয়। দেশি অস্ত্র ছাড়া অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও তাদের কাছে ডালভাত হয়ে যায়। অনেক ছাত্রের মৃত্যু ঘটেছে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে লড়াইয়ে এবং তার চেয়েও বেশি অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে। এমনকি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধেও নাম চলে আসছে কারও কারও।

অনেকে বলছেন, ছাত্রলীগের এসব অপকর্মের কারণে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের গত নয় বছরের উন্নয়ন ও সাফল্যের অনেকটাই যেন ম্লান হতে বসেছে। এ নিয়ে খোদ সরকার সমর্থকরাও যেমন ত্যক্ত-বিরক্ত, তেমনি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে সর্বমহলে। দলীয় পদ-পদবিকে কাজে লাগিয়ে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হয়ে পড়া ছাত্রলীগের অনেক স্থানীয় নেতা অবশ্য এই সরকারের আমলেই গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়ায় সোপর্দ হয়েছে। গত বছর জুলাই মাসে লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন হোসেন মোল্লাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। সংগঠন থেকেও বহিস্কৃত হতে হয় ওই সময়ই।

ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব সংগঠনের পরিচয়ে কোনো অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে সব ঘটনার দায়ভার সংগঠনের ওপর চাপিয়ে দেওয়াকে সঠিক নয় বলেও মনে করেন নেতারা।

ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ সমকালকে বলেছেন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং আইন-শৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটালে, সে যেই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দিতে রাজি নন তারা। ‘আমরা ঘটনা শোনামাত্রই ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত ও সন্ত্রাসীদের সংঘর্ষ-হামলার দায়ভার ছাত্রলীগের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে’, বলেন তিনি।

ছাত্রলীগের দুর্গতি ও ভাবমূর্তিতে কালিমা কেন হচ্ছে, কেন অতীত গৌরবময় ঐতিহ্য তাদের উদ্বুদ্ধ করে না- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সংগঠনের লাখো সাধারণ সমর্থকের পাশাপাশি বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত, যারা এক সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অনেকেও। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে তাদের অনেকে ছাত্রলীগের বর্তমান কার্যক্রমে বিরক্ত ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংগঠনটিকে সংশোধনের এবং ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেন তারা।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠে ছাত্রলীগের বর্তমান কার্যকলাপে প্রায়ই ফুটে উঠেছে হতাশা। সম্প্রতি ছাত্রলীগের একাধিক কর্মসূচিতে সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, এমন কোনো কাজ হলে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিকভাবে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। আমাদের এত উন্নয়ন, এত অর্জন, এত কীর্তি, এত খ্যাতি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কীর্তিকে গুটিকয়েক অপকর্মকারীর হাতে জিম্মি হতে দিতে পারি না।’

সংগঠনের আরেক সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন সমকালকে বলেছেন, আজকের প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ হয়তো বা তার আগেকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। তবে কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো সেটিও বিবেচনায় এনে উত্তরণের পদক্ষেপ নিতে হবে। অনুপ্রবেশকারীরা সংগঠনের ভেতর ঢুকে স্যাবোটাজ করছে কি-না সেটিও দেখা দরকার। ছাত্রলীগের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নেতাকর্মীদের দেশগড়ার সংগ্রামে এগিয়ে যেতে হবে।

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের মাধ্যমে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো অপ্রত্যাশিত ও অত্যন্ত নিন্দনীয়। তারপরও আশা করছি, এই জায়গাগুলো অতিক্রম করে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারায় ছাত্রলীগ ফিরে আসবে।’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি :সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ র‌্যালি, রক্তদান কর্মসূচি, শিক্ষা উপকরণ, শীতবস্ত্র বিতরণসহ সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি নিয়েছে ছাত্রলীগ। তবে যানজটে জনভোগান্তির কথা বিবেচনা করে রাজধানীতে আনন্দ শোভাযাত্রা আজ বৃহস্পতিবারের বদলে আগামী শনিবার সরকারি ছুটির দিন সকাল ১০টায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সকাল সাড়ে ৬টায় ছাত্রলীগের সব সাংগঠনিক কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সাড়ে ৭টায় ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে কেক কাটা ও রাজধানী ছাড়া দেশের অন্য সব ইউনিটে আনন্দ শোভাযাত্রা, বিকেল ৪টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পর্যন্ত শোভাযাত্রা, ৮ জানুয়ারি সোমবার দুপুর ২টায় ঢাবির স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে দুস্থদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ, ৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় অপরাজেয় বাংলায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগ (জাসদ) আজ বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু চত্বরে সমাবেশ ও র‌্যালির আয়োজন করবে।-সমকাল