সি‌কিম ভ্রমন

151

অপর্ণা খানঃ অনেকেই সমুদ্র ভালোবাসে আমিও ভালোবাসি কিন্তু পাহাড়ের চেয়ে বেশী না। সম্ভব হলে আমি একটা পাহাড় কিনতাম। পাহাড়ের সৌন্দর্যে আমি এতটাই মুগ্ধ হই যে দূর্গম পথ পারি দিয়ে শত কষ্ট সহ্য করে একটানা না ঘুমিয়ে স্বল্প খাবার খাওয়ার পরও দিব্যি হাসি মুখে ঘুরে বেড়াই। পাহাড় ঘেরা শহর গ্যংটক ঘুরে এলাম। এর আগে নেপাল, ভুটান ঘুরেছি অসাধারণ ।মুগ্ধ হয়েছি বারবার। প্রকৃতির এই অসম্ভব ভয়ংকর সৌন্দর্যের কাছে মানুষের সৃষ্টি সৌন্দর্য একেবারেই ম্লান।
সিকিম সম্ভবত ১৯৭৫ এ ভারতের সাথে যুক্ত হয়। এক লক্ষ লোকের বসবাস। সিকিমের রাজধানী গ্যংটকে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন মধ্যরাত।পথের একাধারে ছোট স্রোত্বসিনী নদী ও অন্যধারে পাহাড়ের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম।ওখানকার মানুষের চেহারা অনেকটাই চাইনিজদের মত।হিন্দি ও লোকাল ভাষায় কথা বলা ছোট্ট শহরে শিক্ষার হার কিন্তু প্রায় ৮৬%.আমায় মুগ্ধ করেছে ওখানকার মানুষের সরলতা। সারারাত বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমালাম। ভোরে উঠেও বৃষ্টির শব্দ পাচ্ছিলাম। আমি বৃষ্টি ছোঁয়ার জন্য জানালার কাছে গেলাম। না বৃষ্টি নয় ঝকঝকে সোনা রোদ সকাল। সারা শহরে পাহাড়ের বুক চিরে অসংখ্য ছোট বড় ঝর্না ধারা তারই কুলকুল শব্দে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে। সারা রাত সেই মিষ্টি শব্দ আমাকে বিমোহিত করেছে।
নর্থ সিকিম লাচুং যাওয়ার পথে একটু পরে পরেই ছোট বড় অনেক ওয়াটার ফলস চোখে পড়ল। আমরা আনন্দে উচ্ছ্বসিত। কোথাও দাঁড়িয়ে পড়লাম গাড়ি থামিয়ে। যদিও সন্ধ্যা তখন ছুঁই ছুঁই রাস্তাও ভীষণ বিপদজনক সমুদ্র থেকে ৮০০০ ফিট উপরে একদিকে গভীর খাদ একটু এদিক ওদিক হলেই আর রক্ষা নেই। কিন্তু আমাদের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

আমরা ছুটে চলেছি অপার সৌন্দর্যের কাছে। আমার কাছে জীবন মানেই প্রতিদিন নতুন করে নতুন ভাবে বাঁচা। অনেক দুরে দুরে বসতি। পাহাড়ে সবুজের সমারোহ। পাহাড়ের গায়ে এত গাছপালার ভিতরে বাড়ি ঘর তাদের যাপিত জীবন দেখে মনে হচ্ছিল জীবনের সাথে কী কঠিন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা।অন্ধকারে দূর্গম পথে দূর থেকে ঘন বনের মধ্যে টিম টিম করে আলো জ্বলা দেখে গাঁ ছম ছম করে উঠে, মনে হয় এখানে মানুষ নয় অন্য গ্রহের প্রাণী থাকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই অন্ধকার রাস্তা পারি দিয়ে আমরা লাচুং পৌঁছলাম রাত তখন ৮.৩০মি।

কিছু সৌন্দর্য ছুঁয়ে উপভোগ করতে হয়, কিছু সৌন্দর্য চোখে দেখে, কিছু সৌন্দর্য শুধুকল্পনাই থেকে যায়, কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই ভালো লাগে। আমরা সিকিম থেকে গ্যংটক, গ্যাংটক থেকে লাচুং যাওয়ার পথে পাহাড়ের বুক চিরে অসংখ্য ঝর্না ধারা দেখতে দেখতে হিম শিম খাচ্ছিলাম। যেখানেই দেখেছি কিছুটা সময় গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমেছি। আসলে এতটাই বিমোহিত হয়েছি যে We couldn’t but to stop.

প্রচন্ড কনকনে বাতাস উপেক্ষা করে ছবি তুলেছি। ঐ মূহুর্তে মনেই হয়নি দু দিন ধরে আমরা non stop পথ চলেছি ।দুটো পাহাড়ের ভিতর দিয়ে কি চমৎকার লেন্ডস্কেপ। আমাদের ক্যামেরা ক্লিক করতে দেরী হয়নি। আঁকাবাকা পাহাড়ী রাস্তায় মৃদু সন্ধ্যার আলোতে যেতে বেশ লাগছিল। মনে মনে গাইলাম এ পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো। আমরা গোধূলি লগনে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে চা পান করে আবার রওনা হলাম। দীর্ঘ সময় পথ চলেও কারো যেনো ক্লান্তি নেই।

আরো কিছুদূর যেতেই রিমঝিম বৃষ্টি। ঠিক এইটেই যেনো মনে মনে চাইছিলাম। কি অপূর্ব অনুভূতি আমার মন কেমন করে উঠলো। সত্যি বলতে কি তখন মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথ ইচ্ছে হলো কলিমপং যেতে। মন গেয়ে উঠলো ঝিরি ঝিরি বাতাস কাঁদে তোমায় মনে পড়ে। সত্যি মনে পড়েছিল খুব। লাচুং পৌঁছলাম রাত তখন ৮ঃ৩০ মি। আমরা প্রচন্ড ক্ষুধার্ত।হোটেলে এসে যার যার রুমে ঢুকতেই মন ভরে গেলো। এত ছিমছাম গোছানো একটা রুম। আমরা ফ্রেস হয়েই ডাইনিং এ ছুট। হোটেলের বাহিরের দিকে রান্না ঘর সাথে ডাইনিং। রিসেপসন থেকে বেরিয়ে একটু বৃষ্টি ভিজে দৌড়ে রান্না ঘরে গেলাম। বরফ ঠান্ডা জলে হাত ধুয়ে যখন খেতে বসলাম আহা অমৃত। ধোঁয়া উঠা গরম ভাত, পাপর ভাজা, সব্জি, ডাল, মুরগীর ঝোল।আমরা বেশ তৃপ্তি সহকারে খেয়ে ঘুমোতে গেলাম।

আর সেই সুদূর বিদেশের মাটিতে হঠাৎ যদি কোনো গান বন্ধু বা ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা হয় তাহলে আনন্দের মাত্রাটা বেড়ে যায়। তেমনি দেখা পেলাম আমাদের সকলের পরিচিত মুখ উপস্থাপক, শিল্পী, কম্পোজার ছোট ভাই নির্ঝরের।

গরম জলে স্নান সেরে মৃদু বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত হলাম। কথা ছিল ভোর পাঁচটা নাগাদ উঠে রেডি হয়ে জিরো পয়েন্ট এবং ইয়ানথাং ভেলী যাব। আমরা সকলেই চা বিস্কুট খেয়ে নাস্তার প্যাকেট নিয়ে গাড়িতে বসলাম। শুরু হলো পথচলা।।লাচুং থেকে জিরো পয়েন্টে যাওয়ার পথে অপরূপ মনোরম দৃশ্য অবলোকন করতে করতে চলা, কি অপূর্ব সৃষ্টি বিধাতার। আমি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম জীবন ও পাহাড় একই প্যাটার্নে চলে। একদিকে ঝকঝকে রোদ আর অন্য দিকে জমাট কালো অন্ধকার ।পথ চলতে চলতে সেই ছোট্ট স্রোতস্বিনী নদীর বয়ে চলার কূল কূল শব্দ যেন জানিয়ে দিচ্ছে জীবন মানেই চলা থেমে থাকা নয়।দু ধারে সবুজ অরন্যরাজি আর অসংখ্য বুনো ফুল আমায় হাতছানি দিচ্ছিল। কী অসামান্য মুগ্ধতা পাহাড়ের বুক চিরে সাপের মত একে বেঁকে জলধারা গিয়ে মিশে যাচ্ছে সেই খরস্রোতা ছোট্ট নদীটিতে। কি ছন্দময় সে শব্দ। আমার মনে হচ্ছিল শুধু গান নয় প্রকৃতিও নির্দিষ্ট তাল লয় সুরেই চলে।

আমরা ইয়ানথাং ভেলী হয়ে জিরো পয়েন্ট পৌঁছলাম তখন প্রায় আটটা। দূর থেকেই পাহাড়ের চূড়ায় ঝকঝকে সাদাবরফ দেখতে পাচ্ছিলাম। আমরা উচ্ছ্বসিত সেই বরফ ছুঁয়ে দেখার জন্য। এতটাই তাড়াতাড়ি নেমে উপরে উঠতে গিয়ে ফিল করলাম আমার সাপোকেশন হচ্ছে ভাবলাম বয়স হয়েছে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি আমার অন্য সঙ্গীদের অবস্থা একই। ওরাও থেমে আছে, আমাদের এমন হলেও বন্ধু দিনার মেয়ে রুপার তো হওয়ার কথা নয়। আমার ছেলে ঋদ্বি দ্রুত উপরে উঠে।-লেখকঃ একজন রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী।