সিটি নির্বাচন কী বার্তা দিল

6

এ কে এম শাহনাওয়াজঃ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকেই ভীতি ছড়ানো হয়েছিল। মনে হচ্ছিল দুই দলই ভোটারদের মনে আতঙ্ক ছড়াতে চায়। অর্থাৎ দুই দলই যেন চায়, আতঙ্কিত হয়ে ভোটার কম সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে যাক।

দুই দলের বড় বড় নেতারা যার যার প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে বলেছেন, তারা বাইরে থেকে সন্ত্রাসী এনে ঢাকায় জড়ো করছেন। এমনিতেই সাধারণ ভোটারের বিভিন্ন কারণে নির্বাচনে আগ্রহ কমে গেছে; এর মধ্যে ছড়ানো হল ভীতি! এসব কারণেই ঢিলেঢালা নির্বাচন হয়ে গেল।

কিন্তু সৌভাগ্য, ছড়ানো আতঙ্কের তেমন বাস্তবতা চোখে পড়েনি। বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তবে তা বিস্মিত হওয়ার মতো নয়। আমার ধারণা, নগরবাসীর হিসাবও তেমন ছিল।

তবে আমি মনে করি, বিএনপি নেতৃত্বের পরিকল্পনা যদি মেধাবী হতো এবং তারা রাজনীতির ছন্নছাড়া দশা থেকে বেরোতে পারত, তাহলে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একটি ভালো লড়াই হতে পারত।

দীর্ঘদিন ধরে রুহুল কবির রিজভীর নিয়ম করে প্রতিদিন সাংবাদিকদের সামনে গৎবাঁধা কাগজ পড়ার মতো বিএনপির রাজনীতি যেন একটি বলয়ের মধ্যে আটকে গেছে। একে রাজনীতির মাঠে আত্মবিশ্বাস হারানো দশা বলা যেতে পারে।

বিএনপির জন্ম-ইতিহাস যাই হোক না কেন; এই সত্য তো অস্বীকার করা যাবে না, দেশজুড়ে বিএনপি অন্তঃপ্রাণ কর্মী-সমর্থকের অভাব নেই। অভাব শুধু দক্ষ নেতৃত্বের। তার মধ্যে লন্ডন-ঢাকা দ্বৈত নেতৃত্ব এবং একের পর এক দুর্বল সিদ্ধান্ত ঘাড়ে নিয়ে জবুথবু হয়ে পড়েছে বিএনপি।

তাই জনাব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বা আমীর খসরু মাহমুদের মতো বড় বড় নেতাদের গৎবাঁধা অভিযোগ ধারার কণ্ঠশীলন বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মনেও খুব বেশি যে নাড়া দেয়, তেমন মনে হয় না।

এ নির্বাচন বিএনপিকে একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ এনে দিয়েছিল। আমার ধারণা, এই একটি বিষয় বিএনপি নেতৃত্ব ঠিক অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বেগম জিয়ার মুক্তি ও ইত্যাদি বিষয়ে আন্দোলনে নামার কথা বলে দুই বছর পার করে দিয়েছেন তারা; কিন্তু নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে পারেননি।

দলটি এমনিতেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে। এসব বাস্তবতায় সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন একটি সুযোগ এনে দেয়; অন্তত নির্বাচনের ডামাডোলে কর্মী-সমর্থকদের মাঠে নামানো যাবে। এ উদ্দেশ্য অনেকটা সফলও হয়েছে।

এতকাল মাঠে নামলে আওয়ামী লীগ ও সরকারের পক্ষ থেকে বাধা দেয়ার অভিযোগ ছিল, যা এ দেশের রাজনীতির অংশ। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ বাধাগ্রস্ত হতো আর আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি।

তবে দুই দলের মধ্যে পার্থক্য হল, আওয়ামী লীগের নেতারা মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়েও মাঠ ছাড়তেন না। আর বিএনপি নেতারা মারের ভয়ে মাঠে নামেন না। যাই হোক, বিএনপি নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং দৃঢ়তা থাকলে নির্বাচনে জেতার বা অন্তত বড় লড়াই করার প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নামতেন।

এতে তাদের রাজনৈতিক অর্জন বেশি হতো। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থী মনোনয়ন আরও সুচিন্তিত হতে পারত।

গৎবাঁধা সরকারবিরোধী বক্তব্য বলতে বলতে খেই হারিয়েছেন বিএনপি নেতৃত্ব। তাই নির্বাচনে নেমে যেখানে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করে মাঠে নামানোর কথা, সেখানে প্রতিনিয়ত নেতিবাচক কথা বলে কর্মীদের হতাশ করে তুলেছেন। প্রথম শুরু হল ইভিএম নিয়ে নানা সন্দেহ।

ব্যালটে সিলমারা ভোটে কারচুপির বড় অভিযোগ তো বিএনপি বরাবর করে আসছিল। বিকল্প যান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও যদি এত সন্দেহ থাকে তাহলে বিএনপির পরামর্শ বা দাবি কী হতে পারে, তা স্পষ্ট করেননি বিএনপি নেতৃত্ব। মধ্য থেকে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল দুর্বল করে দিয়েছেন নেতারা।

এ যেন পরাজিত হওয়ার আগে পরাজয় মেনে নেয়া। অথচ যারা ইভিএম নিয়ে এত সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, নির্বাচনের পর তা অমূলকই মনে হয়েছে।

যারা নির্বাচনী কেন্দ্রগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন বা ভোটারদের অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছেন অথবা অন্তত টিভি চ্যানেলগুলোয় লাইভ দেখেছেন, তাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি- সর্বস্তরের মানুষ সহজে এবং আনন্দের সঙ্গে ইভিএমে ভোট দিয়েছেন। এতদিনের নেতিবাচক প্রচারণা কর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।

বিএনপির অন্যতম বড় ভুল ছিল মেয়র প্রার্থী মনোনয়ন। দু’জনই রাজনীতির মাঠে নতুন। তাবিথ আউয়াল না হয় গতবার নির্বাচন করে কিছুটা পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু ইশরাক হোসেন তো একেবারে আনকোরা। দু’জনেরই কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই।

দলকানা মানুষ যার যার দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেবেন সন্দেহ নেই। তাই জয়-পরাজয় নির্ভর করে মধ্যবর্তী সচেতন ভোটারদের ভোটের ওপর। ব্যবসায়ী তাবিথ আউয়ালের আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা প্রচারিত আছে। অন্যদিকে বিদেশে পড়াশোনা করা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক বয়সে নবীন এবং রাজনীতিতে একেবারেই অচেনা।

শুধু বাবার পরিচিতিতে ভোট পাওয়া মোটেও সহজ ছিল না। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ হলেও প্রয়াত আনিসুল হক নিজ প্রতিভায় নগরবাসীর কাছে সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন আগে থেকেই। বিএনপির এ দুই মনোনয়নের বিরুদ্ধে অনেক নেতারও ক্ষোভের অন্ত ছিল না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও দেখলাম। সেখানে বিএনপির বড় বড় বেশ কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তারা সবাই এ দুই মনোনয়ন পছন্দ করেননি। তাদের বক্তব্যে জানা গেল, লন্ডনবাসী তারেক রহমানের মনোনীত এরা।

এজন্য লন্ডনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাউন্ড-স্টার্লিং ঢালতে হয়েছে। একজন তো তারেক রহমানের ওপর ক্ষোভ ঢেলে বললেন, ব্যবসা-বাণিজ্য না করে লন্ডনে এমন বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন কীভাবে?

নির্বাচনের আগে-পরে এ ক্ষুব্ধ নেতাদের বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ তেমন চোখে পড়েনি। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নেতারাও তেমন ভূমিকা রাখেননি নির্বাচনের মাঠে।

আসলে বিএনপি নেতাদের আমরা দেখি কার্যত তারা যেন হুকুমবরদার। তাহলে তো রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। দলের বড় নেত্রী খালেদা জিয়া বয়স, অসুস্থতা আর মামলার কারণে আগামীতে কতটা নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।

আরেক নেতা লন্ডনে বসে হুকুম চালিয়ে যাচ্ছেন। শাসন ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগ সহসা বিদায় না নিলে তারেক রহমান ক্রমে শূন্য হতে থাকবেন। এক সময় তরুণ বিএনপি কর্মীদের মনে তারেক রহমানের অনেকটা জায়গা ছিল।

গত জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে এবারের মনোনয়ন বাণিজ্য প্রকাশিত হওয়ার পর এ তরুণদের অনেকের মনেই তারেক জিয়ার সেই আসন নেই। দলের বড় নেতাদের মধ্যে তো তারেক রহমানকে নিয়ে একটি বিভেদ ছিলই।

অন্যদিকে বিএনপির কোনো নেতাই দল চালানোর মতো একক নেতৃত্বগুণ নিয়ে দাঁড়াতে পারেননি। রাজনীতির পরিবারতন্ত্রের এটি হচ্ছে বড় সংকট। নিদানে পড়লে হাল ধরার লোক না থাকলে তরী ডুবন্ত অবস্থায় পতিত হয়। অমেধাবী দলীয় সিদ্ধান্ত দলকে প্রতিনিয়ত সংকটে ফেলে। বিএনপি এখন তেমন নিদানে আছে।

নির্বাচনের দিন বিএনপি নেতৃত্ব শেষবেলায় পরাজয় আঁচ করতে পেরে ধুম করে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকে ফেললেন। আমাদের মনে হয়েছে, এর চেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত আর হতে পারে না। প্রথমত, এমনিতে অতি ব্যবহারে হরতাল এখন অকার্যকর হয়ে গেছে।

নিকট অতীতেও কোনো কোনো দল হরতাল ডেকে জনজীবনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আর এ নির্বাচনে বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও নেতাদের বলা অনিয়মের অভিযোগ তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমজনতার কথা তো আরও পরে।

দিনভর টিভি চ্যানেলগুলোতে ভোটে অনিয়মের বাস্তবতা খুব কমই চোখে পড়েছে। শোনা যায়, দক্ষিণের মেয়র প্রার্থীর পারিবারিক মালিকানা আছে একটি টিভি চ্যানেলে। একমাত্র সেই চ্যানেলে কয়েকটি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের সাক্ষাৎকার দেখানো হল।

যারা দাবি করছিলেন- প্রতিপক্ষের ছেলেরা তাদের নির্বাচন কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। কোথাও ভোটারের ভোট শেষ পর্যন্ত ভোটারকে দিতে না দিয়ে নিজেরাই দিয়ে দিয়েছে। এসব অভিযোগ আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। এসব আমাদের নির্বাচনী অপসংস্কৃতির একটি পুরনো চিত্র। আমরা অমন কলঙ্কিত সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে চাই।

ফিরে তাকালেই দেখব, বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল; তখন নিজদলের পেশিশক্তি প্রতিপক্ষকে ভোটকেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করেছিল। এখন আওয়ামী লীগের পালা। আওয়ামী লীগ তাদের সাংগঠনিক শক্তির কারণে বিএনপি আমলে কোথাও কোথাও প্রতিরোধ গড়ত। এখন তো সে শক্তিও বিএনপির নেই।

নির্বাচনের আগে হাঁকডাক থাকলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপির নেতাকর্মীদের কোনো নির্বাচন কেন্দ্রের সামনে দেখা যায়নি। পেছনে তেমন ছায়া না থাকায় অনেক কেন্দ্রে এজেন্টরা যায়নি। এভাবে পরতে-পরতে সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। দুর্নীতি করলেও সিল মেরে বাক্স ভরার সুযোগ ছিল না ইভিএম পদ্ধতিতে।

প্রভাব খাটিয়ে কোথাও ভোটকেন্দ্রে ভোটারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেদের মার্কায় ভোট দিয়ে দিয়েছে। পুরো ব্যবস্থাপনাটিই নগরবাসী এবং দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট ছিল। আমার এক ছাত্র যথার্থই বলেছিল, লুকিয়ে চুরিয়ে প্রভাব খাটিয়ে দু-চার দশ হাজার ভোটারের ভোট না হয় নৌকা মার্কায় দিয়েছে।

কিন্তু পাসের ব্যবধান তো প্রায় দুই লাখ ভোটের। আর অমন এক বাস্তবতায় নির্বাচন শেষ না হতেই বিএনপি যখন গৎবাঁধা নিয়মে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল এবং নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যন করল; তখন বিস্মিত হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু আমি বিস্মিত হলাম, যখন বিএনপি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকে ফেলল।

এমন দুর্বল প্রেক্ষাপটে বর্তমান বাস্তবতায় হরতাল যে মার খাবে, এটা তো স্পষ্টই ছিল। হরতালে সচল রাজপথে বিএনপি নেতাকর্মীর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

আরও হাস্যকর লাগল, বিএনপি নেতারা নয়াপল্টনে নিজেদের পার্টি অফিসের সামনে সংক্ষিপ্ত জমায়েতে যখন বললেন, জনগণ তাদের হরতালে সাড়া দিয়েছেন; তখন সারা শহরে গাড়িঘোড়া চলছিল, দোকানপাট, অফিস আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল ছিল। রাজনীতিকদের প্রিয় শব্দ ‘জনগণ’। এরা যে কোন ‘জনগণ’ বোঝা বড় মুশকিল। বিএনপি নেতৃত্বের বোঝা উচিত ছিল, ব্যর্থ হওয়া কর্মসূচি নেতাকর্মীদের অনেক বেশি হতাশ করে।

এমন ছন্নছাড়া দশা থেকে বিএনপি যদি বের হতে না পারে তাহলে কাণ্ডারিবিহীন তরীর মতো দলটি উথাল-পাথাল ঢেউয়ে দিক্ হারাবে বারবার।-ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com-(সমকাল)