সাম্যের লড়াইঃ

20

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ আমার রাজনীতিক জীবনের প্রথম পাঠ “মেহনতী জনতার সাথে একাত্ম হও।” সাম্যবোধ থেকে সে পথে হেঁটেছি। করোনা কালে এসে হাঁটছি তার উল্টোপথে।

সোশ্যাল ডিসট্যান্স- কোয়ারেনটিন- আইসোলেশন ভারি ভারি শব্দগুলি এখন মানুষের মুখে মুখে ভাসছে। গ্রাম থেকে আমার এক বড় ভাবি ফোন করে খবর নেন। আমার কোয়ারেনটিন এর মেয়াদ শেষ হয়েছে কিনা? আমি অবাক হয়ে যাই। চরপদুমপাল গ্রামের মানুষও ইতোমধ্যে কোয়ারেনটিন এর কথা জেনে গেছে।
আজ থেকে প্রায় পনের বছর আগের কথা। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি। চাচি প্লেটে করে মুড়ি- মোয়া এনে দিলেন। বললেন “গরম না ঠাণ্ডা? কী খাবে?” সেদিন আমি অবাক হয়েছিলাম।

অথচ এই গ্রামে একদিন বিয়ে উপলক্ষে কনে দেখতে এলে, আশেপাশে কয়েক বাড়ি হাতড়ে গ্লাস প্লেট জোগাড় করতে হতো। এবাড়ি ওবাড়ি থেকে চেয়ার- টেবিল টেনে আনতে হতো। তাও আবার কোনটা হাতলওয়ালা, কোনটা হাতল ভাঙ্গা- হাতল ছাড়া- পায়া নড়বড়ে। অবাক হয়ে দেখি বিস্মিত হই। কত দ্রুত পালটে যাচ্ছে আমাদের সেই গ্রাম।

ছোটবেলায় আমরা ধাঁধা ধরতাম “নিজেরা রাঁধিবাড়ি, নিজেরা খাই। অন্যরা এলে ঘরে কপাট লাগাই।” উত্তর হলো শামুক। আমরা বোধহয় শামুক সংস্কৃতি অনুসরণ করছি। ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্স’ আমাদের সে পথেই নিয়ে যাচ্ছে।

আমার এক বন্ধু রসিকতা করে লিখেছে ‘করোনাকাল যদি প্রলম্বিত হয়, মানুষ যদি এভাবে মাস্ক পরতে থাকে, তাহলে ভবিষৎ প্রজন্ম ধারণা পাবে নাক- মুখ একদা গুপ্তঅঙ্গ ছিল। যা পরিচ্ছদে আবৃত থাকত।’

করোনা নিজে কিন্তু সাম্যবাদী। অসাম্প্রদায়িক, বর্ণ- বৈষম্যহীন, জাতপাতের ঊর্ধ্বে। তার কাছে সৈয়দ বাড়ির মোড়ল আর মেথর পট্টির ছাতিয়া- বিন্দিয়া সব সমান। লকডাউনে সবাইকে সে মুরগীর খোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সবাই ভয়ে জড়সড় – গোপাল মিস্ত্রী কাঁপে থরথর।

আমার ঠাণ্ডা জনিত এলার্জি আছে। একদা সিরাজগঞ্জে সুহৃদ ডাঃ লতিফের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন “চিকিৎসা খুব সোজা। ঠাণ্ডাবোধ করলে গরম আর গরম বোধ করলে ঠাণ্ডার ব্যবস্থা নিবেন। মাথার উপর সিলিংফ্যান দেখিয়ে বললেন গরম লাগছে তাই ফ্যান চালাচ্ছি। শীত লাগলে সোয়েটার- চাদর পরি। ব্যস! চিকিৎসাটাও ঠিক তেমনি। গলায় ঠাণ্ডা লাগলে গরম পানি পান করবেন। সেই থেকে শীত-বর্ষা- গরমে সারা বছর হাল্কা গরম পানি পান করি।

সমস্যাটা হয় কোথায়ও দাওয়াত খেতে গেলে। গরম পানি চাইলে পাশের মানুষ তাকায়। এই সময় গরম পানি! বিস্মিত হয়। কিছুদিন আগে গাইবান্ধায় এক আত্মীয় বাড়িতে গিয়েছিলাম। খাবার পর এক গ্লাস গরম পানি চাইলাম। পাশে বসা এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন “আপনার কী ব্রংকাইটিস আছে।” আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম না। দই খেয়েছি তো। গলা খুশখুশ করছে। গরম পানি খেলে ভালো লাগবে।

করোনা সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সবাই গরম পানি খাচ্ছে- গলা গড়গড়া করছে। ছোট বেলা গ্রামের কথা মনে আছে। ভোরে আশপাশ থেকে কোরান পড়ার গুণ গুণ শব্দ কানে ভেসে আসতো। ঢাকা শহরে এখন উন্নত বস্তি- ফ্লাটগুলি থেকে প্রতিদিন গড়গড় শব্দ কানে আসে।

‘৬০-র দশকের কথা। আঃ আজিজ নামে আমার এক ক্লাস মেট ছিল। ছোট খাট কালো করে চেহারা। কিন্তু পোশাক- পরিচ্ছদে বেশ স্মার্ট। কড়া ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট প্যান্ট, চোখে কালো গগলস পড়ত।

একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বন্ধু! বলতো তুমি কেন সবসময় কালো গগলস পরে থাকো? কারণ কী?
শুনবে! দুঃখে – মনের দুঃখে কালো চশমা পরি বন্ধু। বিকেলবেলা হৈমবালা গার্লস স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমার কোন পার্ট নাই। গায়ের রং কালো বলে আমার কোনো খাওয়া নেই। দুইটা বছর ধরে মাছরাঙ্গা পাখির মত ‘টাল মেরে আছি’। কোন খবর নেই! কালো রঙটার জন্য মাইর খেয়ে গেছি।
তারপর থেকে ফর্সা মানুষ দেখলেই আমার রাগ হয়- হিংসা হয়। কালো গগলস পরলে সবার গায়ের রঙ এক মনে হয়। সবাইকে কালো কালো লাগে। তখন মনটা প্রবোধ মানে।

ক্ষেতে কিষাণ- কলে মজুর, নিম্ন আয়ের মানুষগুলো আজ দারুণ ভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার। করোনা চিকিৎসার বেলায় এই চিত্র আরও প্রকট। পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য, হাসপাতালে ভর্তির জন্য, সাধারণ মানুষ সারাদিনব্যপী লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের দিন এসে রাস্তার উপর শুয়ে থাকে। চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় আদম সন্তানরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
সময় এসেছে এই জায়গায় এখন বোঝাপড়া হওয়া দরকার। লড়াইটা ভাত- কাপড়ের।

সাম্য শুধু নামাজের কাতারে আনলেই চলবেনা। ভাত-কাপড়ের বেলাতেও আনতে হবে।-লেখকঃ একজন সমাজকর্মী।
৩০ জুন, ২০২০ খ্রিঃ
লেক সার্কাস, ঢাকা