সরকার কি ব্যাচেলরদের কথা ভাবেন, নাকি বাড়িওয়ালাদের পক্ষে ছাফাই গান

আশিকুল কায়েসঃ গতরাতেই কথা চলছিল নিজেদের মধ্যে। ভেসে আসছিল করুণ আর্তনাদের কিছু দীর্ঘশ্বাস, শুধুই কি কান্না নাকি বুক ফাটা আর অসহ্য যন্ত্রনায় এক একটি দিন করে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা। সাইফ বলছিল ভাই আর সহ্য করতে পারছি না, আমরা কি মানুষ নই, এসমাজে কি আমাদের কোন মূল নেই, আমরা কি এতটাই ঘৃণার পাত্র। আমি ওর কথা মুখ বুজে শুনছিলাম, ওর কথার কোন উত্তর আমার কাছে ছিল না। সেতো অন্যায় কথা বলছে না। আমার স্তব্ধতায় গোটা রুমের মানুষদের কাছে এক রহস্যের জন্ম দেয়, তবে কি হতাশ হয়ে পড়েছি? নাকি তাদের বড় ভাই হয়ে প্রেরণার উৎস গলাটিপে হত্যা করে চলেছি।
শাওন বলে উঠলো ঢাকা শহরের মানুষদলের কাছে আমরা পশু। কে করেছে আমাদের পশুরূপী মানব। আমরা স্বাধীন দেশে বসবাস করে কেনইবা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে পারি না।
রায়হানতো আছে শুধু টাকশালের মেশিনের কথা চিন্তা করে। এসমাজে যাদের বেশি টাকা আছে তারাই নাকি রাজত্ব করে। এশহরের সব ঘরবাড়ি টাকার মেশিনে ছাপা টাকা দিয়েই তৈরি। মানুষগুলোও বেচা কেনা হয় ওই টাকা দিয়ে। আমাদের মত মানুষের অত টাকা কোথায় যে ভালবাসার জাল বুনে অন্যকাউকে কিছু বুঝাতে পারবো। সবাই টাকার কাছে পরাজয় বরণ করে।
সাইফ গতরাতে বেরিয়েছিল বিকাশের জন্য একটি এ্যাড শুটিং করতে। বেচারাটার সস্থি নেই, আজ রাতে শুটিং স্পট থেকে ফিরে ওসহ আজ সন্ধ্যায় আমরা বেরিয়েছিলাম বাসা খোজার কাজে। কেউ দেয়নি ব্যাচেলর বাসা ভাড়া। এমনিতেই কিছু মালিক তাদের বাড়িতে ব্যাচেলরদের ভাড়া দিয়ে রক্ত চুষে খাচ্ছে। একটি রুমের যে পরিমান ভাড়া হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত, বরং মালিকপক্ষ ব্যাচেলরদের ভাড়া দিয়ে দ্বিগুনহারে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা। অথচ ব্যাচেলর ওরাই যারা পাশের বাসার মাংশের ঘ্রাণ, দুই তলার বিরিয়ানি, তৃতীয় তলায় তেহেরি, চতুর্থ তলার নেহারির ঘ্রাণ নাকে লাগিয়ে সপ্তম তলায় নিজের রান্না ঘরে এসে আলু ভর্তা আর ভাত চড়িয়ে দেয়, পেটে ভাতের চাহিদা মেটানোর জন্য। ঐ বাসাওয়ালারা ব্যাচেলরদের শরীরের রক্ত চুষতে চুষতে সাদা করে ফেলেছে। ঐসব ব্যাচেলরদের যখন আর কোন উপায় থাকেনা তখন বাধ্য হয় বাসাটা ছাড়তে। নতুন কোন ভাড়াটিয়া ব্যাচেলর এসে বাসা ভাড়া সম্পর্কে আলোচনা করলে বিগত ভাড়াটিয়াদের দোহায় দিয়ে কম ভাড়া দিতে কোনভাবেই রাজি হয় না। উপরন্তু তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ছাপাই গেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার চেষ্টা করা হয়।
অবাক করে দিয়েছিল রুমের সবাইকে যখন আমরা একটি ফ্লাট ভাড়া নেওয়ার জন্য দেখতে গিয়েছিলাম। সেটা ছিল গুদাম ঘরের থেকে অভিন্ন নয়। তারপরও মনকে শান্ত করে একপ্রকার ভেবেই নিয়েছিলাম ব্যাচেলরদের জন্য এর থেকে আর ভালোবাসা কি হতে পারে। দুই রুমের ফ্লাট। তাও আবার মালিক পক্ষ রান্না ঘরে একজনকে থাকার অনুমতিও দেয়। একটি ঘরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় অন্য একটি ঘরে। মোটামুটি ৬জন ঠেসে ঠেসে থাকতে পারে এই দুই ঘরে। বিল্ডিং এর চারপাশে ফাকা জায়গা থাকা সত্বেও কোন জানালা নেই। পুরাই অন্ধকার। অক্সিজেনের দারুন স্বল্পতা। চারপাশে ফাকা জায়গা থাকা সত্বেও কেন জানালা রাখা হয়নি জানতে চাইলে বুঝতে পারলাম উনারা আর আট-দশটা বাসাওয়ালাদের মত নির্দোয় না, কেননা তারা ব্যাচেলরদের সমস্যাটা বুঝতে পারেন বলে জানালা রাখেনি। আমরাতো হতোবাক, তার মানে জানালার সাথে ব্যাচেলরদের একপ্রকার সম্পর্ক আছে। বাড়িওয়ালাই বললেন এই রুমে ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হয় বলেই জানালা রাখা হয়নি। তারমানে কতটা হেয়প্রতিপন্ন করে দেখা হয় ব্যাচেলরদেরকে।
অবশেষে মনস্থির করে বসলাম ফ্লাটটা যেভাবে হোক ভাড়া নিতে হবে। মাথা গুজার ঠাই ৫-৭ দিনের মধ্যে করতে না পারলে রাস্তার ফুটপাতে গিয়ে উঠতে হবে। সেখানেও আবার চান্দাবাজ আর ধান্দাবাজদের দ্বৈরাত্যতা আর পুলিশতো আছেই। আমাদের মত ব্যাচেলরদের কোথাও জায়গা হবে কিনা এ-কদিনেই নিশ্চিত হয়ে গেছি। বাসাওয়ালীর কাছে গিয়েছি আমরা তিনজন। ভেবেছিলাম নরম মনের কাছে আমাদের দূর্বলতা প্রকাশ করলে কিছুটা কাজ হবে। আমাদের অসহায়ত্ব একটা পাথরকেও হার মানিয়ে দেয়। পাথরের যদি প্রাণ থাকতো তাহলে আমাদের কথাগুলো শুনে নিজে নিজেই খসে পড়ে যেতো। কি আজব পৃথিবীর আজব মানুষ, প্রাণ আছে মনও আছে কিন্তু হৃদয় নেই। সর্বসাকুল্যে দুটো রুমের ভাড়া দেওয়ার কথা বলে ১৮ হাজার টাকা। সেটাও নাকি আগের ভাড়াটিয়ারা থাকা অবস্থায় বহন করেছে। কিন্তু আজ তারা কেন সেখানে নেই এর কারন হয়তো পাওয়া যাবে না। ব্যাচেলর হয়ে বলতে পারি ঐসব বাড়িওয়ালাদের রক্ত দান করতে করতে আজ তারা মৃত প্রায়, এজন্য তারা বাড়িতে নেই। অথচ একটা ফ্যামেলি বাসার ক্ষেত্রে দুই রুমের বিলাসবহুল ফ্লাটে কোনকিছু অপূর্ণ না থাকা সত্বেও ভাড়া মাত্র ১০ হাজার টাকার অধিক নয়।
দেশের সরকার কি ব্যাচেলরদের কথা ভাবেন না। নাকি তারাই বাড়িওয়ালাদের পক্ষে ছাফাই গাই। ঢাকাতে বাড়ী ভাড়ার নীতি না থাকার কারনেই ব্যাচেলরদের এত দূর্ভোগে পড়তে হয়। এই দূর্ভোগ দূরীকরণে সাধারন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, যতই মিছিল মিটিং কিংবা সেমিনার করিনা কেন, সরকার এই দূর্ভোগ সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে কোন দিন ভেবেছে কিনা আমার জানা নেই। এযাবতকাল বাড়ীভাড়ার নীতি ও ব্যাচেলরদের দূর্ভোগ নিয়ে লেখালেখি হলেও সরকার পক্ষ কেন আড়ি করে চলেন সেটা আমার বোঝে আসে না। আমার কাছে সন্দেহ লাগে বাড়ীওয়ালাদের কথায় সরকার চলে? নাকি সরকারের কথায় বাড়িওয়ালারা চলে?
সাইফ আমাকে বলেছিল ভাই, সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি চলুন আমরা প্রেসক্লাবে গিয়ে প্রতিবাদ করি। বলেছিলাম, কি হবে প্রতিবাদ করে। কে শুনবে আমাদের কথা। ষরষের মধ্যেইতো ভুতের আস্থানা থাকবে। আমরা সবাই ব্যাচেলারের পক্ষে কথা বললে সরকার যখন একটু বেকে বসবে তখন আওয়ামী ব্যাচেলরপন্থীদের আর খবর পাওয়া যাবে না।রাস্তায় পড়ে থাকবো আমরা দুজন। এটা সব দলের সরকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতো যেটা বর্তমান সরকার করে যাচ্ছে।
ব্যাচেলরদের হাহাজারি আর বাধভাঙ্গা কান্নার আওয়াজ কি সরকারি পক্ষের নিকট পৌছে না। নাকি শুনেও না শুনার ভান করে থাকেন। ব্যাচেলর অনেক কষ্টে বেঁচে আছে ঢাকা শহরে। ব্যাচেলর নামটাই যেন বাড়িওয়ালাদের নিকট অসুবিধেজনক। কতবাড়িতে ভাড়াটিয়া নাই, রুম ফাকা অথচ ব্যাচেলরদের কোনভাবেই এলাও করা হয় না। জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন তার প্রিয় ছাত্র লীগদের “শুধু ভালো কর্মী হলেই হবে না, ভাল ছাত্রও হতে হবে”। ভাল ছাত্র হতে গেলেতো দরকার সুস্থ একটা পরিবেশ। অসুস্থ পরিবেশ কোনদিন একজন ছাত্রকে ভালো ছাত্র হতে দেয় না। এটা সবারই জানা। তবে প্রধান মন্ত্রীর কথা কি একটি কথার কথা? প্রধান মন্ত্রী কি জানেন? ঢাকা শহরের ৯০ শতাংশই ছাত্র ব্যাচেলর? ছাত্রদের পক্ষে প্রধান মন্ত্রীর মুখসৃত বাণী বের হলেও আসলে এটার ভিত্তি কতটুকু তা আমার সন্দেহ হয়। সরকারের নিকট ব্যাচেলরদের পক্ষ থেকে আমার অনুরোধ দয়া করে গ্রাম থেকে উঠে আসা আলোর দিশারী ছাত্রদের নিয়ে একটু ভাবুন। যারা ঢাকা শহরে ব্যাচেলর হয়ে কষ্ট্রে দিন কাটাচ্ছে।- লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ