শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমৃত্যু বজ্রকণ্ঠ ছিলেন মেজর এম এ জলিল

36

আহমেদ জালাল : নিরবেই কেটে গেলে মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর কমান্ডার ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নেতা মেজর (অব.) এম এ জলিলের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৮৯ সালের ১৯ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। সাফল্যগাঁথা দেশপ্রেমিক এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কর্মময় জীবন। দেশের জন্য তার কি যে আত্মত্যাগ ছিলো! জাতির একজন আলোর দিশারীর ন্যায় মহান নেতা মেজর এম এ জলিল। তাঁর কর্মময় জীবনের আদর্শকে ধারণ,লালন এবং পরিচর্যা যেনো এক গভীর অন্ধকারে হাবুডুবু খাছে। দেশপ্রেমিকদের আদর্শকে চাপা রেখে কোন সভ্য সমাজ গড়া অসম্ভব। মেজর জলিল বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে নতুন ধারার বরপুত্র। এক অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে টানা সংগ্রামী এই লড়াকু সৈনিক বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক বিরল এক্সপেরিমেন্টও। এক বর্ণিল-স্বপ্নিল প্রলম্বিত চুল-শ্মশ্রƒমণ্ডিত নায়কের কথা, যিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদবিরোধী আন্দোলনের আপসহীন অগ্রসৈনিক। শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমৃত্যু বজ্রকণ্ঠ ও সংগ্রামী জননেতা। জাতীয় রাজনীতিতে বর্ণাঢ্য জীবন-বৈচিত্র্যের ব্যতিক্রমী পুরুষ। জাতীয় শত্রু-তাঁবেদার শোষক-জালিমের আতঙ্ক, মজলুমের বন্ধু। স্বজন-প্রিয়জনের প্রিয়মুখ। সহজ-সরল নিরহঙ্কার অথচ অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মহিমায় মহিমান্বিত এক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি। ১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এ রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তা বরিশাল জেলার উজিরপুরে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম মোহাম্মদ আব্দুল জলিল। তবে তিনি মেজর এম এ জলিল নামেই পরিচিত। তার পিতা জোনাব আলী চৌধুরী ও মা রাবেয়া খাতুন। উজিরপুর ডব্লিউবি ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৫৯ সালে তিনি মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের মারি ইয়ং ক্যাডেট ইনস্টিটিউশন থেকে আইএ পাস করেন এবং এর পাশাপাশি গ্রহণ করেন সামরিক শিক্ষা। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। পরে মুলতানে কর্মরত থাকাকালে তিনি ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনি অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। সামরিক বাহিনীতে চাকুরিরত অবস্থায় তিনি বি.এ পাশ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১২নং ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্ট অফিসার হিসেবে তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তিনি ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ছুটি নিয়ে বরিশালে আসেন এবং মার্চে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনের সময়ে তিনি কাজ করেছিলেন। তিনি ছিলেন এ দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ১৯৭৩ সালে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি জাসদ ত্যাগ করে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন নামে একটি দল গঠন করেন। লেখালেখিও করতেন তিনি। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সীমাহীন সময় (১৯৭৬), দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শন, সূর্যোদয় (১৯৮২), অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (১৯৮৯),Bangladesh Nationalist Movement for Unity: A Historical Necessity, A search for identity. ১৯৮৯ সালের ১৯ নভেম্বর রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মৃত্যুবরণ করেন। পরে ২২ নভেম্বর তার মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয় এবং সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়।-লেখক : নিবাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান,
৭১ এর মুখপত্র ‘দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ’।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।