শেষ হলো কুয়াকাটায় গঙ্গাস্নান

পূণ্যের আশায় ধান, দুর্বা, তেল, সিঁদুর ইত্যাদি সমুদ্রের জলে অর্পণ
কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি: হালকা হিমেল হাওয়া,পূবের আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য কেবল উঁকি দিচ্ছে, এমন সময় সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীদের উলুধ্বনিতে সরগরম হয়ে ওঠে কুয়াকাটার সৈকত। ব্যাস্ত হয়ে সাগরে নেমে পড়েছেন পুণ্য স্নানের জন্য। পূণ্যের আশায় কেউ কেউ মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে বেল পাতা, ফুল, ধান, দুর্বা, হরিতকী, ডাব, কলা, তেল, সিঁদুর ইত্যাদি সমুদ্রের জলে অর্পণ করে। আবার কেউ কেউ মাথার চুল ন্যাড়া সহ প্রাশ্চিত্ত ও পিন্ডদান করেছে। এছাড়া সাধু সন্নাসিরা সৈকতের বালিয়ারিতে দাঁড়িয়ে স্নানের আগ মুহুর্তে উচ্চস্বরে গীতা ও মন্ত্র পাঠ করেছেন। মঙ্গলবার সকালে কার্তিকের পূর্নিমা তিথিতে পুরো সৈকত জুড়ে হাজার হাজার পূন্যার্থী ও দর্শনার্থী। তাদের বিশ্বাস, এতে সংসার কর্মে আসবে সাফল্য, ভবিষৎ জীবনে আসবে সুখ।
সোমবার বিকেল থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনাসহ আশপাশের এলাকা ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্থী এবারের উৎসবে অংশ নেয়। সোমবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবহন,প্রাইভেটকার, মাইক্রো ও মোটরসাইকেল যোগে এসব লোক কুয়াকাটা সৈকতে এসে জড়ো হতে শুরু করে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয় সংগীতানুষ্ঠানের। এছাড়া সৈকতের বালিয়ারিতে বসানো হয় মেলা। পুণ্যার্থীরা কুয়াকাটার ‘রাধাকৃষ্ণ মন্দির ও তীর্থযাত্রী সেবাশ্রম’ প্রাঙ্গণে রাতভর নামকীর্তনসহ অন্যান্য ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেয়। তারা র্নিঘুম রাত কাটিয়ে হালকা ঠান্ডায় মঙ্গলবার সকালে স্নানে নেমে পড়েন সাগরের নীল জলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এ বছর ব্যাপক লোক সমাগম হয়েছে। পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের ভীড় থাকায় পর্যটন সংশিøষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বেচাকেনাও ধুম পরে যায়। খালি ছিলনা হোটেল মোটেলের রুম। অনেকেই গাছ তলায়, আবার আনেকে সৈকতে বিভিন্ন পর্যটন পায়েন্টে ঘোরাঘুরি করে র্নিঘুম রাত কাটিয়েছেন। আগত দর্শনার্থী ও পূণ্যার্থীর জন্য নিরাপদ পানি, মেডিকেল টিম, স্যানিটেশনসহ স্নান শেষে পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা করেছেন আয়োজক কমিটি। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে স্থানীয় প্রশাসনসহ র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, আনসার, স্বেচ্ছাসেবক একত্রে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে স্নান শেষে পুণ্যার্থীরা আন্দারমানিক নদী লাগোয়া পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের মদনমোহন সেবাশ্রমে সমবেত হয়ে কুঞ্জে স্থাপন করা ১৭ জোড়া রাধা-কৃষ্ণের যুগল প্রতিমা দর্শন করেন। একই সাথে মন্দির প্রাঙ্গণে নানান পণ্যের পসরা নিয়ে সাজানো ৫ দিনের মেলায় অংশ নেয়। মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়াও আশপাশের রাস্তয়ও বসেছে অসংখ্য দোকানপাট।
গঙ্গাস্নানে আসা মনিলাল দাস জানান, রাতভর নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলব্ধি করে সকালে গঙ্গা স্নান করেছি। তার নাতিকে নিয়ে সোমবার বিকেল ৫ টায় এসেছেন কুয়াকাটায়। স্নান শেষে তারা রাধা-কৃষ্ণের যুগল প্রতিমা দর্শন করেন নিজ গন্তব্যে ফিরবেন। প্রায় পঞ্চাশর্উদ্ধ মালতি মালাকার বললেন, তার ছেলে অসুস্থ হয়ে পরে ছিলো। এসময় তিনি মানত করেছিলেন কার্তিকের পূর্নিমা তিথিতে কুয়াকাটায় গিয়ে ছেলের মাথা ন্যাড়া করবেন। অসুখ ভালো হয়েছে তাই সেই মানত পালন করলাম। সৈকতের দাঁড়িয়ে স্নানের আগ মুহুর্তে উচ্চস্বরে গীতা পাঠ করছিলেন মন মোহন দে। তিনি বলেন, ভগবানের কৃপা লাভ করার জন্য পরিবার নিয়ে এখানে এসেছি। পূর্নিমা তিথি অনুসারে স্নান করলাম। আজকে নিজের কাছেও ভালো লাগছে।
কলাপাড়া শ্রী শ্রী মদন মোহন সেবাশ্রম কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. নাথুরাম ভৌমিক বলেন, রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৯ টার দিকে অধিবাসের মধ্যদিয়ে ঐতিহ্যবাহী রাস লীলা উৎসব ও মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। পাঁচদিন ব্যাপী রাস উৎসব অবিরাম চলবে। আগামী ১০ নভেম্বর কুঞ্জভঙ্গ ও মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে। তবে পুরো মন্দির এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
কুয়াকাটা পৌর মেয়র মো.আনোয়ার হাওলাদার বলেন, এবার পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় আগের তুলনায় অনেক বেশি লোকের সমাগম হয়েছে। রাস উৎসব ও গঙ্গা স্নান এখন সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মহিপুর থানার ওসি খোন্দকার মেহাম্মদ আবুল খায়ের জানান, শান্তিপূর্ন ভাবেই গঙ্গা স্নান সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শংকর চন্দ্র বৈদ্য জানান, গঙ্গাস্নান ও মেলায় আগত পূণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা, জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সমন্বয় একটি নিরাপত্তা বেষ্ঠনী তৈরী করা ছিলো বলে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।