শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মূলধারায় বাংলাদেশ

2

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকঃ আজ ১৭ মে। ১৯৮১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। এদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেদিন ধানমন্ডি ৩২-এর বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, শেখ হাসিনা তখন তার ছোট বোন শেখ রেহানা, স্বামী ও দুই সন্তানসহ তখনকার পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন বলে তারা সৌভাগ্যবশত প্রাণে বেঁচে যান।

সেদিন ঘাতকচক্র শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার স্বপ্ন, দর্শন ও আদর্শও মুছে দিতে চেয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বাংলাদেশকে ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র সফল হতে দেননি। তিনি শুধু আওয়ামী লীগকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তা নয়- পুরো বাংলাদেশকে তিনি আগলে রেখেছেন, সব ষড়যন্ত্র আর বাধা জয় করে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন।

সেদিন বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে তাকে একনজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত এলাকাজুড়ে লাখো জনতার ঢল নামে। সেদিনের গগনবিদারী মেঘ গর্জন, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রকৃতি যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বদলা নেওয়ার লক্ষ্যে গর্জে উঠেছিল আর অবিরাম মুষলধারে ভারি বর্ষণে যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছিল বাংলার মাটিতে পিতৃ হত্যার জমাটবাঁধা পাপ আর কলঙ্কের চিহ্ন। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের সব সদস্যের রক্তে ভেজা বাংলার মাটি স্পর্শ করে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় উন্মত্ত জনতা সামরিক শাসক জিয়ার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিভিন্ন স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। তিনি জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’ তিনি বলেছিলেন- ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই।’

বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে শেখ হাসিনার ভাষণে জাতির মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, সামরিক শাসকশ্রেণির একদিন নিশ্চয়ই পতন হবে। শেখ হাসিনা কিন্তু পরবর্তীকালে সামরিক শাসকদের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়ে বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে আনতে পেরেছিলেন। এভাবে তিনি এগিয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি, বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীর পুরোটা সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর দর্শনভিত্তিক সমাজ গঠনে চেষ্টা করে গেছেন এবং করে যাচ্ছেন। গণতন্ত্র, উন্নয়ন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্য বিলোপ।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের একজন বিরল নেতৃত্ব। আজ বাংলাদেশ পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশের সঙ্গে তুলনীয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের লড়াইয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেকখানি এগিয়ে গেছে। দেশে ফিরে শেখ হাসিনা অবিরাম অগণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির মোকাবিলা করে চলেছেন। শেখ হাসিনার যোগ্য ও সফল নেতৃত্বের জন্য বাংলাদেশ, এ দেশের মানুষ আজ বিশ্বে একটা সম্মানজনক অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশকে উল্টোপথে পরিচালিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের মৌলিক চরিত্রকেই বদলে ফেলা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তানি ধারায় সামরিক শাসনের সংস্কৃতির প্রবর্তন ঘটে দেশে। সাম্প্রদায়িকতা ফিরে আসে রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে। যে রেডিওতে জয়বাংলা স্লোগান বাজত, সেখানে পাকিস্তানি ধারায় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ করা হয়। একের পর এক স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা ঘটতে থাকে দেশে। জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার সাহসী ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি ফিরে আসার পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফিরে পেয়েছি। আজ বাংলাদেশের সমৃদ্ধির জন্য শেখ হাসিনাকে প্রয়োজন। আমরা তার নেতৃত্বে উন্নত রাষ্ট্রের পাশাপাশি উন্নত জাতি গঠন করতে চাই।

দীর্ঘ ২১ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর ১৯৯৬ সালের ২১ জুন আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে প্রথম উন্নয়নের ধারায় ফেরে দেশ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। পেছনে হাঁটা রাষ্ট্র আবার এগোতে থাকে সামনে। এ সময় দেশ ও জনকল্যাণের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনা অনন্য ভূমিকা রাখেন। উল্টোপথের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শনের ধারায় ফেরে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রথম যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন দরিদ্র অবহেলিত মানুষের জন্য সরকারের তরফে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বাজেটে আর্থিক বরাদ্দের সূচনা করেন। তখন খুব বেশি আর্থিক অগ্রগতি না হলেও তিনি যে শুরু করেছিলেন, তার সুফল আমরা আজ দেখছি। ২০২০ সালের এ সময় করোনায় যখন অনেকের আয় বন্ধ হয়ে সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তখন তিনি অনুদান, প্রণোদনা দিচ্ছেন। অতিসম্প্রতি তিনি সারাদেশে করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারের মধ্যে এককালীন আড়াই হাজার টাকা করে এক হাজার ২৫০ কোটি টাকার অর্থ সহায়তা বিতরণ উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের ২০১৯ সালের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও টিউশন ফি বিতরণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এভাবে বঙ্গবন্ধুর সামাজিক দর্শনের আলোকেই তিনি মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের মূল ধারায় দেশ পরিচালনা, বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও আদর্শের আলোকে রাষ্ট্র গঠনে তিনি মনোনিবেশ করছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার কাজ করছেন। আমি মনে করি, এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এটাই বাংলাদেশের মূল ধারা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদর্শিত পথ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে পথনির্দেশ মেনেই এগিয়ে চলেছেন। আমি তার সুস্থ জীবন কামনা করছি।

জয়তু শেখ হাসিনা।

সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।সমকাল