শেখ হাসিনার অন্তপ্রাণ কর্মবীর এনামুল হক

এনামুল হক আবুল। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রস্থল পল্টনের গণমানুষের মিছিলের অতি পরিচিত অনিন্দ্য সুন্দর এক মুখ। ঢাকা মহানগর রাজনীতির মূল দূর্গ তার হাতের মুঠোয়। অর্থাৎ বিএনপি অফিস অধ্যুষিত পল্টন আওয়ামী লীগের মূল নিয়ন্তার আসনে তিনি। পল্টন আওয়ামী লীগের সভআসনের আসনে তার নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রযাত্রার ওপর প্রভাব রেখেছে। গত দু’যুগ ধরে আপোষহীনভাবে দলের পক্ষে লড়ছেন এমনভাবে যেন অনবদ্য চরিত্রে রুপদান করছেন বিগত বিরোধীকালীণ সংগ্রামে, আন্দোলনে। পল্টনের মতো জনবহুল এলাকায় নেতৃস্থানীয়দের কাতারের এক শীর্ষমনি হলেও আচার-আচরণে, চলনে-বলনে, কথা-বার্তায় মার্জিত ও মিষ্টভাষী বলে কদর কুড়িয়েছেন এলাকার আপাময় জনগণের কাছে। পল্টন থানা আওয়ামী লীগের নেতা এনামুল হক আবুল নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে উজ্জ্বল উদাহরণ। ধীর স্থির প্রশান্ত মনের এ নেতা দুই যুগ ধরে ওয়ার্ডের নেতৃত্বে আসীন থেকে নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণের মাঝেও এক অসাধারণ ইমেজ গড়ে তুলেছেন। সাদাসিধে। পরিস্কার পরিচ্ছদ মানুষটার নেতৃত্বের আরেক দিক। আর ভেতরটা তার পরিপূর্ণ রাজনীতির সংগ্রামগাঁথায়। বঙ্গবন্ধু’র দেখার সৌভাগ্যটা চোখের আয়নায় এসে ধরা পড়ে স্মৃতির বন্দরের যখন দেখা মেলে।ছোট্ট বয়সে মামা সার্জেন্ট ফজলুল হকের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফেঁসে যাওয়ার কথা শুনেছেন। সরকারি কর্মকর্তা বাবা আব্দুর রহমানের মুখে। শুনেছেন বাবার মুখেই শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। স্বাধীকারের মানেটা পুরো মাত্রায় আত্রস্ত করতে না পারলেও এটা যে বাঁচার দাবী, বাঁচানের দাবী তা আঁচ করতে সময় লাগেনি বেশী দিন। ১৯৬৯ নিকটে এসে গেলে ছাত্র আন্দালন তার মনকে উজ্জীবিত করে। চোখের সম্মুখপানে অগ্নিমুখুর মিছিল,গগণবিদারী শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত রাজপথ। উত্তাল হাওয়ায় অশান্ত নগরে পরিনত হতে দেখেছে তার নিবাস শান্তিনগরকে। ওই দিনগুলোতে মমতাময়ী মায়ের চোখে কান্নার সাঁতার আর মুখে বিষাদমাখা বেদনার সুর আজও আবুলকে পিছু ফেরায়। মামাপাগল সুদর্শন তরুণ এনামুল হক সার্জেন্ট ফজলুল হক আর তাঁর মহান নেতা শেখ মুজিবের ফাঁসি হবে এমনটা শুনে নির্জীবতা নয়, বরং মনে বিদ্রোহের অগ্নিধারণ করিয়য়েছে। উতালা হয়ে সে ছুটে চলে বাবা শীর্ষ শ্রমিক নেতা আব্দুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান হলে মায়ের সঙ্গে আশায় বুক বাঁধেন তিনি। মামা সার্জেন্ট ফজলুল হক ফিরে আসবে। ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক হয়ে ওঠার সব খবর তার কানে বাজে আজও। ছাত্রজনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের তোফায়েল আহমেদ কর্তৃক “বঙ্গবন্ধু ” খেতাব লাভের দিন আবুল বাবার হাত ধরে ছুটে চলেন সেই জনমহাসমুদ্রের গর্জন তর্জন শুনতে। দূর হতে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য স্বপ্নের হয়ে থাকলেও একদিন সেই স্বপ্নের দূয়ার খুলে যায়। চার বছরের ব্যবধানে। তবে ভিন্ন পরিসরে, ভিন্ন প্রবাহে। ততদিনে পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। ১৯৭৪ সালে কৃত্রিম দূর্যোগের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে লড়ছে দেশ। লড়ছে বঙ্গবন্ধু। শত্রুদের সৃষ্ট দুর্ভীক্ষে মোকাবেলায় যখন জাতির পিতা দিকে দিকে ছুটে চলছেন, তখনই এমন একটি দিনের দেখা মিললো, যে দিনটি এনামুল হক আবুলকে রাজনীতির ময়দানে টেনে নেয় বাঁধভাঙ্গা বন্যার স্রোতধারার মতো। মোহাম্মদপুর পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে গেলেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু। তাঁকে দেখিয়ে দিলেন বাবা আব্দুর রহমান। তখনও কিশোর আবুল পীড়িতদের মাঝে রুটি ও গুর বিতরণ করছিল আপন মনে। বঙ্গবন্ধু নজর এড়ালো না তরুণটির ওপর। এগিয়ে মাথায় আদুরে হাত রেখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে উপস্থিত লোকদের কাছে জানতে চাইলেন- ছেলেটি কার, নাম কি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ-ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হয়ে লড়া বীর যোদ্ধা আব্দুর রহমান বললেন ” মুজিব ভাই” এটা আমার ছেলে, ওর নাম এনামুল হক আবুল। আবারও আদর করে বললেন, “ছেলে বাবার মতোই হবে। ” আব্দুর রহমান পূর্বপাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়নের (চডউ) সভাপতি ছিলেন। ১৯৭১ সালে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এম এ জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভুমিকা রাখেন আব্দুর রহমান। তাঁর বড় ছেলে মোস্তফা জামাল বাবুল সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লে ছোট ছেলে এনামুল হক আবুলও বাবার কাছে অস্র চালনা টেনিং নেয়। বাবার সঙ্গে কিশোর বয়সেই আবুল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পরম দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। ফিল্ড মার্শাল আইউব খান গণঅভ্যুত্থানের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিলে সার্জেন্ট ফজলুল হকও রাজনীতিতে পুরোপুরি নেমে পড়েন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে জাসদ সভাপতি মেজর (অবঃ) এম এ জলিলকে হারিয়ে ফজলুল হক সংসদ সদস্য হন। শান্তিনগরের বেড়ে ওঠা এনামুল হক আবুল ছাত্রলীগ শেষে মূল দল আওয়ামী লীগকেই বেছে নেন নিজের বাড়ন্ত বয়সে। ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ” বঙ্গবন্ধুকে ” বেঈমান ” বলে কুটক্তি করলে কর্নেল (অবঃ) শওকত আলীর নেতৃত্বে মূল অংশ বেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ গঠন করলে বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক আবুল এর কেন্দ্রীয় সদস্য নিযুক্ত হন। আওয়ামী লীগের মূল স্রোতের বাইরে কখনো নিজেকে কল্পনা না করে গোটা জীবন সক্রিয় রেখেছেন দেশরত্ম শেখ হাসিনার সকল আন্দোলন সংগ্রামে। গ্রেফতার, কারাবরণ ছাড়াও ২০০৬ সালে লগি-বৈঠার আন্দালনে অংশ নিয়ে হত্যা মামলার আসামী হন দলের সর্বোচ্চ নেতা শেখ হাসিনাসহ সিনিয়র অন্যান্য নেতার সঙ্গে। মোজাফ্ফর হোসেন পল্টুর নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সময়ে ওয়ার্ড রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। এক যুগের মতো ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মোহাম্মদ হানিফ ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার নেতৃত্বাদীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগেও তার ভুমিকা প্রশংসনীয়। ২০০৩ সালে পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়া পর্যন্ত ওয়ার্ডের সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারির নির্বাচনে মেয়র পদে তৎকালীণ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফের এবং স্থানীয় কমিশনার পদে কামাল চৌধুরীর বিজয় অর্জনে নিরলস শ্রম ব্যয় করেন এ বীর সংগঠক আবুল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বপালন করে দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন তিনি। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল শক্তি-সামর্থ্যই হলো থানা এবং ওয়ার্ড গুলোর নেতৃস্থানীয়রাই। এ দুটিতে এনামুল হক আবুল কর্মী-সমর্থের কাছে এতটাই প্রিয় হয়ে ওঠেন যে, পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে বিকল্প চিন্তাই করেনি হাইকমান্ড। উল্লেখ্য এবারই ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে সিটি করপোরেশনের ন্যায় উত্তর ও দক্কিনে বিভক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, সরাসরি সার্জেন্ট ফজলুল হক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১১ নম্বর আসামী। বাবা আব্দুর রহমানও ছিলেন বঙ্গবন্ধু কাছের মানুষ। আশার কথা হচ্ছে, গোটা পরিবার, আত্মীয় পরিমন্ডলই বঙ্গবন্ধু আর্দশের অনুসারী। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারিক আদালতের অন্যতম বিচারপতি তফাজ্জল ইসলাম ও বিডিয়ার ট্রাজেডির অন্যতম ঘটনা তদন্তকারী মেজর জেনারেল মঈনুল ইসলাম এ পরিবারের সংশ্লিষ্ট পরম আত্মীয়জন। বিজিএমইর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম এনামুল হক আবুলের আত্মীয়। আধুনিক মনস্ক, সৃজনশীলতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এনামুল হক আবুল কর্মীবান্ধব এক নেতা হিসাবে সকলের শ্রদ্ধার আসনে আসীন। চলনে, বলনে, কর্মসাধনায় অশেষ মনোবলে কখন হিংসা প্রতিহিংসার ঠাঁই দেননি। বায়তুল মোকাররম,স্টেডিয়াম, রাজারবাগ, শান্তিনগর, নয়া পল্টন, মালিবাগ, চামেলীবাগ জুড়ে তার নেতৃত্ব বিস্তৃত। মানুষের কল্যাণ কর্মীদের নিয়োজিত করার ঐকান্তিকতা তার রাজনৈতিক চরিত্রের ইতিমূলক দিক। এ প্রশ্ননে তিনি অটল ও অসামান্য প্রগতিবাদী চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন কর্মপরিধি বিস্তার ঘটিয়ে। কথা বলতে চাইলেন না, এ ভাষ্যকারের সঙ্গে। ভালো মন্দের সব দিকে তার কর্মপন্থা নির্ধারিত রাখলেও মুখ খুলতে চাইলেন না প্রথমে। না, না বলতে যা বলে ফেললেন , তার সারবস্তু এমন- ভালো- মন্দ দলীয় ফোরামে আলোচনার বিষয়, তবে কোন কর্মী যখন পথভ্রষ্ট হয়, বা কোন নেতা দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়, তখন তার বুকের খাঁজে খাঁজে কষ্টেরা বাসা বাঁধে। বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় পরিণত করতে যেভাবে সততা, শ্রম, ত্যাগ ও একনিষ্ঠার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন তা থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের আরও বেশী করে শিক্ষা নিতে হবে। এনামুল হক আবুলের সুগৃহিনী আকলিমা খান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। তিন সন্তানের বড় ছেলে আফিফ এনাম সানিডেল থেকে ও লেবেল করেছে। মেয়ে সাঈমা এনাম আফরা ভিকারুন্নেছা নুন স্কুলের (ভার্সন) ছাত্রী। ছোট ছেলে ফারাজ এনাম আরিজ পড়ছে উইলস্ লিটলে। সন্তানদের নিয়ে আশাবাদী এনামুল হক আবুল। লক্ষ রাজনীতির এলাকায় মানুষের সুখ -দুখের সঙ্গী হিসাবে সক্রিয় থাকা। জনপ্রতিনিধি হবার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে শেষে বলেন, দল যখন যাকে মনোনয়ণ দেয় তার পক্ষে কাজ করার মানেই দলের নেতৃত্বের প্রতি অবিচল থাকা। এটাই আর্দশ, এটাই শুভ। সেই শুভের বিরুদ্ধে অশুভের লড়াই মূল লক্ষ থেকেই বিচ্যুত হবার শামিল। এমন কথা বলেই ও প্রান্ত থেকে মুঠো ফোনে বললেন, গুড বাই।-লেখক: সোহেল সানি, সাংবাদিক