লড়াইয়ে মেয়েটির পাশে থাকুন

14

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমঃ রোববার রাতেই ভয়ংকর সেই ঘটনাটি জানতে পারি। শুনলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এমন সংবাদ শুনে কী করে শান্ত থাকা যায়! কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। স্বাভাবিকভাবেই কেউ এ ধরনের দুঃসংবাদ মানতে পারেন না। সে মেয়েটি যদি আবার পূর্বপরিচিত হয়, তাহলে তো সেই যন্ত্রণা সহ্য করা আরও কঠিন।

খবরটি শোনার পরপরই দ্রুত মেয়েটিকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করতে বলি। এরপর আমার এক সহকর্মীকে নিয়ে সে রাতেই হাসপাতালে যাই। ছোট্ট একটি মেয়ে। তার ওপর কী ভয়ংকর আঘাত! ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখেছি। রাতেই তার শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। সেই রেজাল্ট ‘পজিটিভ’ শোনার পর মানসিক ক্ষত আরও গভীর হতে থাকে। শিক্ষক, সহপাঠী ও স্বজনরা মিলে তার পাশে থাকার চেষ্টা করি। রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত হাসপাতালে ছিলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় মেয়েটি শুরুতে কিছুটা ট্রমাগ্রস্ত ছিল। এরপর সে বিশ্রাম নিচ্ছিল।

পরদিন সোমবার আর হাসপাতালে যাওয়া হয়নি। বিক্ষিপ্ত মন। কীভাবে মনকে প্রবোধ দেব। ছোট্ট এক শহর থেকে উ?েঠ এসেছে মেধাবী মেয়েটি। বাবা কলেজ শিক্ষক। মাও স্কুলশিক্ষক। ওর ছোট্ট আরেক বোনও এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। অসম্ভব ভালো একটি পরিবার ওদের। ওর মা-বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানালেন, অন্যায়ের সঙ্গে কখনও আপস করেনি তার সন্তান। ব্যতিক্রমী নারী সে। সামনে কোনো অনিয়ম দেখলে রুখে দাঁড়ায়। সংস্কৃতিমনা। ভালো কবিতা আবৃত্তি করে।

মঙ্গলবার আবার হাসপাতাল যাই। বেশ কিছু সময় তার পাশে ছিলাম। ও আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র অধ্যাপককে দেখে সম্মান করতে হয়, ওই রকম পরিস্থিতিতেও সে ভোলেনি তা। ওকে এরকম সময়ে এসব করতে বারবার মানা করে এলাম। বললাম, এখন এসবের দরকার নেই। তার অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠল, সত্যিকারের ফাইটার সে। চোখেমুখে দৃঢ় প্রত্যয়ের ছাপ। কোনো ভয়ডর নেই। হয়তো ভেতরে যন্ত্রণা হচ্ছে; কিন্তু ছোট্ট এই মানুষটি তা আড়াল করে ঘুরে দাঁড়ানোর যে সাহস দেখাচ্ছে, তা অনিন্দ্য সুন্দর। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রীর এই লড়াই দেখতে ভালো লেগেছে। সে ভেঙে পড়েনি। এ লড়াইয়ে সবার তার পাশে থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, তার সহপাঠীসহ সবাই তার পাশে রয়েছে। তার পরিবারও সার্বক্ষণিক তার পাশে আছে। রয়েছে পুরো দেশবাসী।

সমাজে ও ব্যক্তি মননে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বৈষম্য ও বেকারত্ব অনেককে হতাশ করে তুলছে। নারী ও শিশুরা বারবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। কারণ তাদের সহজে আক্রমণ করা যায়। আবার নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারও সঠিকভাবে হচ্ছে না। ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অথচ যে মেয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাকেই বারবার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা সবাইকে শোনাতে হচ্ছে। অনেক সময় ধর্ষক আড়ালে থাকে। আবার কেন সে ধর্ষক হয়ে উঠল, এটাও আমাদের জানা হয় না। সব মিলিয়ে চলার পথ নির্বিঘ্ন করতে হবে রাষ্ট্রকে। ঘরে-বাইরে নারীরা যাতে নিরাপদ থাকে, এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। এটা না করতে পারলে লজ্জিত হব আমরা সবাই।-সমকাল