লকডাউন ইস্যুতে ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থির

4

ডেস্ক রিপোর্ট : মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েকদিনে এ পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। এ অবস্থায় করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে গতকাল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সোমবার থেকে ‘এক সপ্তাহ লকডাউন’ খবর দেয়ার পর থেকেই দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার। লকডাউনের খবরে এ বাজারে হঠাৎ করে পণ্যের দাম কমে যায়। আসন্ন রমজান মাস ঘিরে গতকাল সকালেও বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু বিকাল গড়াতেই প্রায় প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের মণপ্রতি দাম ১০০-১৫০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে।

এদিকে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে খুচরা বাজারে। লকডাউনের খবর জেনে দুপুরের পর ভোগ্যপণ্যের বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। শুরু হয় প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কের কেনাকাটা। এ সুযোগে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে সংকট নেই। এভাবে ক্রেতাদের হুমড়ি খেয়ে পড়ার কারণে পণ্যের অতিরিক্ত দাম হাঁকছেন তারা।

টানা কয়েক মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার। পাইকারিতে প্রায় প্রতিদিনই মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। আসন্ন রমজানের আগেও ভোগ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। কিন্তু গতকাল লকডাউনের খবরে দুপুরের পর থেকেই খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের দাম কমতে শুরু করে। বিকালের মধ্যেই প্রায় প্রতিটি নিত্য ভোগ্যপণ্যের মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা পর্যন্ত কমে যায়। মূলত লকডাউনের কারণে নগদ অর্থের সংকট ও পণ্যের দাম আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পাইকারি বাজারে পণ্যের বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে। এতে দরপতন ঘটে পাইকারি বাজারে।

বাজার সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে মণপ্রতি পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৯১০ টাকায়। বিকালের মধ্যেই পাম অয়েলের লেনদেন মণপ্রতি ৩ হাজার ৮০০ টাকায় নেমে গেছে। এছাড়া সুপার পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি ৪ হাজার ২০০ থেকে কমে ৪ হাজার ১০০ টাকায়, সয়াবিনের দাম মণপ্রতি ৫০ টাকা কমে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই অবস্থা চিনির ক্ষেত্রেও। কয়েক দিন ধরে মণপ্রতি পরিশোধিত চিনি ২ হাজার ৩৭০ টাকায় বিক্রি হলেও বিকালের মধ্যে তা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ২৬০ টাকায়। ছোলা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় লেনদেন হলেও গতকাল দাম কমে যায় মণপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা। এছাড়া ডাল, গমসহ প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম দিনের ব্যবধানে দরপতনের তালিকায় রয়েছে।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, গত বছর লকডাউনের সময় ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ছিল। এ কারণে নতুন করে লকডাউন ঘোষণায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোগ্যপণ্যের দামে।

রোজার আগে বাড়তি চাহিদা সামনে রেখে পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। হঠাৎ লকডাউনের ঘোষণায় সবাই পণ্য বিক্রি করতে চাওয়ায় দাম কমেছে। এ ঘটনায় অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়বে বলে শঙ্কা জানিয়েছেন তিনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন বড় পাইকারি বাজারে নিত্য ভোগ্যপণ্য লেনদেন হয় মূলত সারা দেশের বিভিন্ন বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের চাহিদা কেন্দ্র করে। খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন বাজারের লেনদেন হওয়া ডিও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ক্রেতারা এসব বাজার থেকে ক্রয় করেন। তবে লকডাউন শুরু হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পণ্যের সরবরাহ পাওয়া, বৈশ্বিক কারণে দামে প্রভাব, আবাসিকের বাইরে (হোটেল-মোটেল-রেস্টুরেন্ট) পণ্যের চাহিদা কমে গেলে দাম কমে যায় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পাইকারি বাজারে দরপতন হলেও খুচরা বাজারে এখনই দাম কমবে বলে মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার-শ্যামবাজারসহ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুপুরের পর থেকে হঠাৎ বাজারে ক্রেতার সমাগম বেড়ে যায়। এ সুযোগে দফায় দফায় পণ্যের দাম বাড়ানোর অভিযোগও ওঠে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, রোজা উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম একটু বেশিই ছিল। ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই সাপ্তাহিক বাজার করতে আসেন। কিন্তু লকডাউনের সংবাদের পর থেকেই বাজারে ভিড় বাড়তে শুরু করে। এ সুযোগে জিনিসপত্রের দাম ৫-১০ টাকা, কোনো কোনো পণ্যে ২০ টাকাও বেড়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারাও একই কথা বলেন। ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই ক্রেতার চাপ একটু বেশি ছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকে হঠাৎ করেই চাপ সামলানো মুশকিল হয়ে যায়। রাশেদ হাসান নামে এক ক্রেতার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, এক মাসের বাজার একসঙ্গে করে নিলাম। লকডাউন কতদিন থাকে বলা তো যায় না। তবে এ সুযোগে সব পণ্যই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, লকডাউন আসছে জেনে দফায় দফায় দাম বেড়েছে মুরগির। সাদা মুরগি সকালে ছিল কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা, দুপুরে ১৭০ টাকা এবং সন্ধ্যার পর হয়ে যায় ২০০ টাকা। সোনালি মুরগির দাম সকালে ৩২০ টাকা, সন্ধ্যার পর ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এছাড়া কারওয়ান বাজারে দেশী পেঁয়াজ সকালে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২৫-২৮ টাকায়, বিকালে তা বেড়ে ৩২-৩৫ টাকায় ঠেকে। দেশী রসুনের দাম সকালে ছিল প্রতি কেজি ৫০ টাকা। বিকালে তা বিক্রি হয় ৭০-৭৫ টাকায়। দেশী আদা সকালে বিক্রি হয় ১২০ টাকায়, সন্ধ্যার পর হয়ে যায় ১২৫ টাকা।

রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চিনি, ছোলা, বেসন, আটা, মসুর ও মুগডাল সকালের তুলনায় দুপুরের পর ১০-২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। – বণিক বার্তা