রোজকার ভুল

তামান্না চৌধুরীঃ খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে আমাদের। অথচ এসব ভুলের কোনো ভিত্তি নেই। এমন কিছু ভুলের শুলুক সন্ধান করে পরামর্শ। ভুল ১ : ওজন কমাব, তাই সবজি সিদ্ধ খাই

ওজন কমানোর জন্য অনেকেই তেল ছাড়া শুধু সিদ্ধ করে সবজি খায়। তাদের ধারণা, সবজি সিদ্ধ করে খেলে ভিটামিন বেশি পাওয়া যাবে এবং তেল থেকেও কোনো চর্বি আসবে না।

অথচ সবজির মধ্যে ভিটামিন এ, কে ও ই থাকে। এই ভিটামিনগুলো রঙিন সবজিতে অনেক বেশি থাকে। চোখ, ত্বক ও হাড়ের জন্য এগুলো অপরিহার্য। তেল ছাড়া ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে শরীরে শোষণ হয় না। তাই সবজি তেল ছাড়া খেলে ওই সবজি থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন শরীরের কোনো কাজে লাগে না। তাই সবজিতে পরিমিত তেলের উপস্থিতি অপরিহার্য।

পরামর্শ : তেল ছাড়া সবজি খেলে এর ভিটামিন শরীরে কম কাজে লাগে। বিভিন্নভাবে সবজি রান্না করে তেল বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ তেল অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলে তাতে কম ক্যালরি আসে। এতে স্বাস্থ্যের উপকার হয়। সবজি মসলা দিয়ে কষিয়ে রান্না করে সামান্য তেল দিয়ে বাগার দিলে তা সুস্বাদুও হয় এবং দেহের উপকারে আসে।

ভুল ২ : শাক খেলে গ্যাস হয়, তাই শাক খাই না

শাক খেলে এসিডিটি বা গ্যাস হবে, এই ভেবে অনেকেই এই পুষ্টিকর খাবারটি থেকে বঞ্চিত হন। শাক থেকে বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলের পাশাপাশি খাদ্যআঁশ পাওয়া যায়। এই খাদ্যআঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা ছাড়া নানা ক্রনিক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। শাকে ক্যালরি কম থাকে এবং শাক রান্নায় খুব কম মসলা বা তেলের প্রয়োজন হয়। এ জন্য ভালো স্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন অল্প করে হলেও শাক খাওয়া উচিত। মূলত শাকের কারণে এসিডিটি হয় এমনটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বলা হলেও আসলে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, রাত জাগা, সকালে নাশতা না খাওয়া, খাবারের সঙ্গে পানি পান করা ইত্যাদি নানা কারণে গ্যাস বা এসিডিটি হয়ে থাকে। অনেকেই সকালে নাশতা না খেয়ে ১১-১২টার সময় শিঙাড়া চা বা কেক ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। এরপর যখন দুপুরের খাবারের সঙ্গে শাক খেয়েই পানি পান করেন তখন অনেকেরই গ্যাস হতে দেখা যায়। অনেকে শাক ছাড়াও অন্য তরকারি দিয়ে ভরপেট ভাত খেয়ে দুপুরে ঘুমায়। তাদেরও গ্যাস এসিডিটি হতে পারে।

পরামর্শ : সঠিক জীবন যাপন মেনে চললে এসিডিটি অনেকটা কমানো যায়। তার পরও যদি শাক খেলে গ্যাস বা এসিডিটি হচ্ছে বলে মনে হয়, সে ক্ষেত্রে অন্যান্য সবজি বা মাছের সঙ্গে অল্প শাক ভালোমতো রান্না করে অল্প পরিমাণে খেয়ে আস্তে আস্তে অভ্যাস করা যেতে পারে।
ভুল ৩ : তেল ছাড়া পরোটা খাই

পরোটা বলতে আমরা বুঝি আটা বা ময়দা দিয়ে কাই তৈরি করে তেল দিয়ে বা ঘি দিয়ে ভাজা। আবার সুস্বাদু পরোটা তৈরি করতে ময়ান দেওয়ার সময়ও তেলের প্রয়োজন হয়। প্রকৃতপক্ষে আটা বা ময়দার রুটি তৈরি হয় শুধু লবণ ও পানি দিয়ে। রুটি অপেক্ষাকৃত পাতলা হয় এবং তাতে পরোটার তুলনায় ক্যালরি অনেক কম থাকে। পরোটায় তেল ব্যবহার করা হয় বলে ফ্যাটও বিদ্যমান থাকে। তাই স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরোটা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে অনেকেই না বুঝে একটু টেকনিক্যালি তেল দিয়ে আটা বা ময়দা মেখে তেল ছাড়া পরোটা ভেজে খান। অথচ তেল ছাড়া কখনো পরোটা হয় না। ভাজতে তেল না লাগলেও ময়ান দিতে অবশ্যই তেল লাগে। আর এজাতীয় তেল ছাড়া পরোটায়ও ফ্যাট থাকে।

পরামর্শ : তেল ছাড়া পরোটা, তেলে ময়ান দেওয়া ও ভাজা হয়। তেল ছাড়া তাই ময়ান দিতে সামান্য তেল ব্যবহার করুন এবং সপ্তাহে একবারের বেশি এ রকম পরোটা খাওয়া ঠিক নয়। তেল ছাড়া পরোটা খেলে গ্যাস হয়। তাই সবচেয়ে ভালো হয় আটার রুটি খাওয়া।

ভুল ৪ : মাছ রান্নায় গন্ধ, তাই ভেজে রান্না করি

প্রোটিনের অনেক ভালো একটি উৎস মাছ। স্বাস্থ্য ভালো রাখার পরামর্শে দৈনিক মাছ খেতে বলা হয়ে থাকে। মাছ থেকে প্রোটিন, ভালো ফ্যাট, ভিটামিন ও মিনারেলস পাওয়া যায়। হূদরোগের ঝুঁকি কমায় এমনকি ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে মাছ। কিন্তু অনেকেই অনেক অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মাছ রান্না করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। প্রাকৃতিকভাবেই মাছভেদে কমবেশি এক ধরনের গন্ধ থাকে। এ জন্য অনেকে তেলে ভেজে তারপর তেল ও মসলায় রান্না করে খায়। এতে বরং অনেক তেল খাওয়া হয়ে যায়। ফলে মাছের উপকার অনেকটাই কমে যায়। মাছ ভাজলে তাতে তেল যুক্ত হয় আবার রান্নার জন্যও তেল লাগে। এটাই বরং স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

পরামর্শ : মাছের গন্ধ দূর করতে কাঁচা মাছ লেবুর রস ও ময়দা দিয়ে কিছুক্ষণ মেখে রাখুন। এরপর ভালো করে ধুয়ে রান্না করুন। অথবা মাছে সামান্য ভিনেগার দিয়ে ধুয়ে রান্না করলে গন্ধ থাকে না। মাছ না ভেজে বরং কষিয়ে রান্না করুন অথবা মাছ রান্নায় ধনে পাতা, টমেটো বা লেবু পাতা ব্যবহার করুন। এতে গন্ধ কমে যাবে, স্বাদ ও পুষ্টিমান ঠিক থাকবে।-লেখকঃ , প্রধান পুষ্টিবিদ, ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতাল