রিজেন্ট হাসপাতালে ‘বালতি টেস্ট’ কেলেঙ্কারি!

2

আবুল খায়েরঃ করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার নামে রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালে ‘বালতি টেস্ট’ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। টেস্ট না করেই করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করে আসছিল হাসপাতালটি। জানা গেছে, ৬ হাজার নমুনা সংগ্রহ করে তা ল্যাবরেটরিতে না নিয়ে বালতিতে রাখা হয়। পরবর্তীতে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে ১০ থেকে ২০ ভাগ রোগীর রিপোর্ট পরীক্ষা ছাড়াই পজিটিভ ও বাকিগুলো নেগেটিভ বলে চালিয়ে দেয়। অথচ এই ৬ হাজার মানুষের প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এতে অনেক রোগী পড়েন মহাবিপদে। কেউ কেউ মারাও গেছেন।

শুধু তাই নয়, রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করে পরে সেটিকে বিনা মূল্যে করা হয়েছে দেখিয়ে সরকারের কাছে প্রায় দেড় কোটি টাকার বিলও জমা দিয়েছে রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া তারা করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের নিম্নমানের হোটেলে রাখত ও খুবই মানহীন খাবার সরবরাহ করত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রিজেন্টের দুই হাসপাতাল সিলগালা, মালিক পলাতক

টেস্ট না করেই করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াসহ নানা অভিযোগে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরায় রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় এবং উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতাল ও মিরপুর রিজেন্ট হাসপাতাল। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‍্যাব। সেখানে বিপুল স্যাম্পল পাওয়া গেছে। যেগুলো বালতিতে ছিল। এছাড়া অনুমোদনহীন টেস্ট কিট ও বেশ কিছু ভুয়া রিপোর্ট পাওয়া গেছে বলে জানান র‍্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। অভিযান শেষে তিনি বলেন, রিজেন্ট হাসপাতাল ও প্রধান কার্যালয় সিলগালা করে দিয়েছি। হেড অফিসে বসেই মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি করত তারা। হেড অফিসে পাঁচ-সাত দিনের স্যাম্পল এক সঙ্গে করে ফেলে দিত। ভুয়া রিপোর্টও পেয়েছি। অনুমোদনহীন র্যাপিড কিট পাওয়া গেছে। তিনি আরো জানান, রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রোগীদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আমরা ওদের গ্রুপ কার্যালয়টিও সিলগালা করে দিয়েছি যেখানে হাসপাতালের প্রধান কার্যালয়সহ আরো কয়েকটি অফিস ছিল তাদের। তবে এর মালিক মোহাম্মদ সাহেদকে এখনো আটক করা যায়নি। তিনি পলাতক রয়েছেন। হাসপাতালটিতে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১৪ জন কোভিড-১৯ রোগী চিকিত্সাধীন ছিলেন।

র‍্যাব কর্মকর্তারা বলেন, করোনা মহামারির এই সময়ে এত বড় দুঃসাহস তাদের হলো কীভাবে? এই লুটপাটের সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা জড়িত। তাদের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৪ সালে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও হাসপাতালটি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হলো কীভাবে? সূত্র জানায়, সরকার থেকে বিনা মূল্যে কোভিড-১৯ টেস্ট করার অনুমতি নিয়ে রিপোর্টপ্রতি সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে আদায় করত রিজেন্ট হাসপাতাল। এভাবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণির আদম ব্যাপারী বিদেশগামীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করে রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট নিয়ে নিত।

অননুমোদিত কিট ও গাড়ি জব্দ

এর আগে সোমবার রাতে মোহাম্মদ সাহেদের মালিকানাধীন হাসপাতাল থেকে অননুমোদিত র‍্যাপিড টেস্টিং কিট ও একটি গাড়ি জব্দ করে র‍্যাব। এ প্রসঙ্গে র‍্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ঐ গাড়িতে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্টিকার লাগানো ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনের চোখে ধুলো দিতেই গাড়িটি ব্যবহার করা হতো। সোমবারের অভিযানে রিজেন্টের আট কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তিনি বলেন, উল্লিখিত অনিয়মের সঙ্গে হাসপাতালটির চেয়ারম্যানই জড়িত এবং তিনি নিজেই এসব ডিল করেছেন।

দুই মামলা, আসামি ১৭

জানা গেছে, রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একটি প্রতারণা ও অন্যটি মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে। প্রতারণা মামলার তদন্ত করবে দুদক। মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত করবে সিআইডি। মামলায় রিজেন্ট হাসপাতাল ও গ্রুপের মালিক ও এমডিসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে জেকেজি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সেটি বন্ধ করে দিয়েছিল।

হাসপাতাল জুড়ে অব্যবস্থাপনা

সূত্র জানায়, উত্তরার ৫০ শয্যার রিজেন্ট হাসপাতালটিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর অনুমোদন দিয়েছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। পরে ২০১৭ সালে মিরপুরে হাসপাতালটির আরেকটি শাখা খুলে তার অনুমোদন নেওয়া হয়। যদিও এসব হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৪ উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর নবায়ন করা হয়নি।

হাসপাতালের আইসিইউতে গিয়ে দেখা গেছে যেটা আছে সেটাকে নরমাল ওয়ার্ডও বলা যায় না। সেখানে পুরোনো কাঁথা-বালিশ থেকে আরম্ভ করে সব আছে। এর যে ডায়াগনসিস ল্যাব সেখানে কোনো মেশিন নেই। ফ্রিজের মধ্যে এক অংশে রি-এজেন্ট আর অন্য অংশে মাছ পাওয়া গেছে। এর যে ডিসপেনসারি সেখানে সব সার্জিক্যাল আইটেম পাঁচ-ছয় বছর আগের, মেয়াদোত্তীর্ণ। হাসপাতালটির মালিকের গাড়ির রেজিস্ট্রেশনও নেই।

কে এই সাহেদ?

জানা গেছে, হাসপাতালটির মালিক মোহাম্মদ সাহেদ বিএনপির সময় বিএনপি, আওয়ামী লীগের সময় আওয়ামী লীগ হয়ে যান। হাওয়া ভবনে তার যাতায়াত ছিল। বিএনপি সরকারের আমলে রাজাকার মীর কাসেম আলী ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। খাম্বা মামুনের সঙ্গে সে ২ বছর জেলও খেটেছে। ২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডে এমএলএম কো. বিডিএস ক্লিক ওয়ানের ব্যবসা করে সাধারণ মানুষের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৩২টি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে নিজেকে কর্নেল (অব.) পরিচয় দিয়ে মার্কেন্টাইল কোঅপারেটিভ ব্যাংক বিমানবন্দর শাখা থেকে ৩ কোটি টাকা লোন নেওয়া নিয়েও তার বিরুদ্ধে আদালতে দুটি মামলা চলছে। বিভিন্ন টিভির টকশোতে মোহাম্মদ সাহেদকে দেখা যেত। তার প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট কে সি এস লি. এর নামে ইউসিবি ব্যাংক উত্তরা শাখাসহ বিভিন্ন ব্যংকে শত শত কোটি টাকা রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, গত ৮ই মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর যখন কোনো হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিত্সা দিতে রাজি হচ্ছিল না তখন রিজেন্টসহ তিনটি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে স্বাস্থ্য বিভাগ। চুক্তির আওতায় সরকার সেখানে ডাক্তার, নার্সসহ কিছু জনবলও নিয়োগ দেয়। হাসপাতালটির করোনা রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিত্সা দেওয়ার কথা ও পরে সরকারের সেই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল।

এর আগে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ায় এবং মেয়াদ পূর্তির পরও লাইসেন্স নবায়ন না করায় রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মেডিক্যাল প্র্যাক্টিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরি রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ঐ হাসপাতালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলো।ইত্তেফাক