রাজস্ব নীতিতে আসছে বড় পরিবর্তন

4

সাদ্দাম হোসেন ইমরানঃ করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কর ছাড় দিয়ে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপের পাশাপাশি থাকবে বিশাল রাজস্বের লক্ষ্য পূরণের কলাকৌশলও।

আজ গণভবনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এতে ব্যবসায়ী সংগঠনের দেয়া কর সংক্রান্ত প্রস্তাব তুলে ধরার পাশাপাশি এনবিআরের মতামত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হবে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী যেসব দিকনির্দেশনা দেবেন, তার আলোকে রাজস্ব নীতি চূড়ান্ত করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র জানায়, প্রথাগতভাবে এনবিআরের কর্মকর্তারা প্রতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যবসায়ী সংগঠনের দেয়া রাজস্ব সংক্রান্ত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রস্তাবনা সম্পর্কে এনবিআরের নিজস্ব মতামত জানানো হয়। এবারেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এনবিআরের শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাটনীতির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আজ গণভবনে আলাদা আলাদা বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।

সূত্র আরও জানায়, অন্যবারের বাজেট প্রণয়নের প্রেক্ষাপটের তুলনায় এবারের বাজেট সম্পূর্ণ আলাদা। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। যার রেশ পড়েছে বাংলাদেশেও। রফতানি আয়ে মন্দা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। যে খাতে যাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল লক্ষ্য অর্জন বর্তমান প্রেক্ষাপটে এনবিআরের জন্য চ্যালেঞ্জিং। কারণ সরকার ঘোষিত প্রণোদনা বাস্তবায়ন করতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার কঠোর মনিটরিং ও রাজস্ব বৃদ্ধি সহায়ক নীতি গ্রহণ।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে বিনিয়োগবান্ধব রাজস্বনীতি প্রণয়ন করতে হবে। তা না হলে শুধু মনিটরিং ও রাজস্বনীতি প্রণয়ন করেও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণ করা যাবে না। এ অবস্থায় উভয় সংকটে পড়েছে এনবিআর। বিনিয়োগ বাড়াতে এনবিআর কর ছাড় দেবে, নাকি রাজস্ব আদায় বাড়াতে কঠোর নীতি প্রণয়ন করবে- তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে খোদ এনবিআরই। তাই সবাই তাকিয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর দিকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও ভ্যাট খাতের খুব বেশি পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেই। শিল্পের উৎপাদনে গতি আনতে কাঁচামালের শুল্ক হার বাড়ানো হবে না, চলতি অর্থবছরের মতোই থাকবে। ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত মধ্যবর্তী পণ্য ও মেডিকেল যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমানো হতে পারে। তবে বিলাসবহুল আইটেম যেমন গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ওপর শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে রাজস্ব বাড়ানোর স্বার্থে।

অন্যদিকে নতুন ভ্যাট আইন ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে কার্যকর হওয়া মাঠপর্যায়ে কিছু অসঙ্গতি দেখা দেয়। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে দফায় দফায় সংশোধন করা হলেও বড় পরিসরে বাজেটে সেসব অসঙ্গতি দূর করা হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, করোনা প্রভাবে সরকার লকডাউন ঘোষণা করলেও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ভ্যাট রিটার্ন জমার সময়সীমা পেছানো যায়নি। এ কারণে বেকায়দায় পড়েন ব্যবসায়ীরা। আর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস করতে হয়।

সবশেষে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে বিলম্বে রিটার্ন জমার জরিমানা ও সুদ মওকুফের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সিগারেট, মোবাইল খাতের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে আয়কর খাতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এর মধ্যে হয়েছে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, কর্পোরেট কর হ্রাস, কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি অন্যতম। গত ৫ বছর যাবৎ করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে। এ কারণে ব্যবসায়ীসহ সব মহল থেকে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে এই সীমা বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বড় একটি অংশ কর জালের বাইরে চলে যাবে, তাই এনবিআর এটির বিপক্ষে।

অন্যদিকে প্রণোদনা প্যাকেজ ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় এবার ব্যাংকের কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর বিষয় ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তবে এ নিয়েও দ্বিধায় রয়েছে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকের কর্পোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমানো হয়। এ দুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

আরও জানা গেছে, সংকট কাটাতে কালো টাকা অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা থাকবে বাজেটে। নতুন নতুন খাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের কর দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হতে পারে। যেমন চলতি বাজেটে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়। মাত্র ১০ শতাংশ আয়কর দিয়ে কালো টাকা এই দুই খাতে বিনিয়োগ করলে অর্থের উৎস সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো প্রশ্ন করবে না। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এ সুযোগ বহাল রয়েছে।সমকাল