রাজনীতির লকডাউন উঠছে না

2

হাবিবুর রহমান খান ও হাসিবুল হাসানঃ রাজনৈতিক অঙ্গনের ‘লকডাউন’ আপাতত শিথিল হচ্ছে না। ফলে এখনই মাঠে গড়াচ্ছে না রাজনীতি। সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন কিংবা ম্লোগান- রাজনীতির এই চিরচেনা ছবিটি পাল্টে গেছে।

করোনাভাইরাস রাজপথের রাজনীতিকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে টেনে নিয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে কবে মুক্তি মিলবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর। রোববার থেকে অফিস-গণপরিবহনসহ প্রায় সব কিছু সীমিত পরিসরে খুললেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মাঠে নামতে আরও সময় চায় রাজনৈতিক দলগুলো।

নেতারা মনে করেন, মহামারী নিয়ন্ত্রণে এলে আগামী মাস থেকে সীমিত পরিসরে শুরু হতে পারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। এর আগে ই-রাজনীতি অর্থাৎ ভার্চুয়াল মাধ্যমেই সীমিত পরিসরে কর্মকাণ্ড চলবে।

আপাতত করোনা মহামারীতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা চালাবেন তারা। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ঝুলে আছে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। সব মিলে দলগুলোর কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগ জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং এখনও এই কাজ অব্যাহত রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে এর চেয়ে বড় কাজ আর কি হতে পারে। এটাও তো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাজের মধ্যেই পড়ে। তবে মাঠের রাজনীতি বা সংগঠন গোছানোর যে কাজ, সেটা এখনই শুরু করা সম্ভব নয়। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের জনসমাগমের ওপর বিধিনিষেধ এখনও বহাল আছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমানে কঠিন সময় যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের মতো মহামারীতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে দেশের মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোও এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৎপর। এ পরিস্থিতিতে মাঠে দলীয় রাজনীতি নেই- এটা সত্যি তবে আমরা বসে নেই।

তিনি বলেন, রাজনীতি হচ্ছে জনগণের জন্য। জনগণের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোই রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। জনগণের দল হিসেবে বিএনপি সেই কাজটিই করছে। আপাতত আমরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থগিত রেখে নেতাকর্মীদের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছি। সাধ্যমতো আমরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পুরোদমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়া কঠিন। তবে এ কঠিন পরিস্থিতিতেও আমরা সীমিত পরিসরে কাজ করে যাচ্ছি। সংক্রমণের আশঙ্কায় আমরা ভার্চুয়াল মাধ্যমে আমাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি।

করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মানবিক কর্মসূচি নিয়ে সংকটে পড়া অসহায় মানুষদের পাশে থাকতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাস সংকট না কাটা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তাদের মানবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। এর আগে পুরোপুরিভাবে মাঠের সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও ফিরতে চান না তারা।

দলীয় সূত্রে ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা সংকটের শুরুতেই গণভবন থেকে সার্বিক বিষয় মনিটরিং করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মন্ত্রী, এমপি, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, দলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। করোনাভাইরাসের কারণে বাসা থেকেই সরব ভূমিকা পালন করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। দলীয় সভাপতির ধানমণ্ডির অফিসে বসে নিয়মিত সারা দেশের জেলা-উপজেলা ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তারা। দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় নানান দিকনির্দেশনা।

তবে করোনা সংকটের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখায় আওয়ামী লীগের অনেক কাজ জমে রয়েছে। ২০-২১ ডিসেম্বর জাতীয় সম্মেলনের আগে ও পরে কয়েক দফায় মিলিয়ে তৃণমূলের প্রায় অর্ধেক সাংগঠনিক জেলার ও উপজেলার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে এখনও অর্ধেক বাকি। তাছাড়া সম্মেলন হলেও অনেক জেলা-উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। অন্যদিকে সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ ও মৎস্যজীবী লীগের জাতীয় সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। একই অবস্থা ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগেরও। এছাড়া করোনা সংকটের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে আরও তিন সহযোগী সংগঠন। সেগুলো হল- মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও তাঁতী লীগ।

একই পরিস্থিতি মাঠের বিরোধী দল বিএনপিরও। করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থগিত রেখেছে দলটি। আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। দলীয় কর্মকাণ্ডও নেই আগের মতো। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেয়া হচ্ছে প্রযুক্তির সহায়তা। ভার্চুয়াল মাধ্যমে কয়েকবার স্থায়ী কমিটির সভাও করেছে। দলের মহামচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অনলাইনে নিয়মিত ব্রিফিং করছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নেতারা। দলীয় কর্মকাণ্ড না থাকলেও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে দলটি। সারা দেশে অসহায় মানুষকে সাধ্যমতো সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন নেতারা।

তবে করোনার মধ্যে ঈদের সময় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ কয়েক নেতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে চেয়ারপারসনের বৈঠকের পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেছে। যা মাঠের রাজনীতি শুরু হলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা।

ভার্চুয়াল মাধ্যমে সীমিত পরিসরে কর্মকাণ্ড চালালেও সাংগঠনিক কাজে স্থবিরতা নেমে এসেছে দলটিতে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে তৃণমূল পুনর্গঠন। অঙ্গসংগঠনগুলোর বেশির ভাগ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও তা করোনার কারণে পুনর্গঠন আটকে আছে। যেসব আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোর মেয়াদ শেষ হলেও কাউন্সিল করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপি নয়- অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চিত্রও প্রায় একই। দলীয় বা সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ড নেই দলগুলোর। দলের কর্মকাণ্ড শুরু হলেই ঝুলে থাকা কাজগুলো শেষ হবে বলে নেতারা মনে করছেন।যুগান্তর