রাজনীতিতেও চাই শুদ্ধি অভিযান

0

আবু সাঈদ খানঃ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অপসারণের মধ্য দিয়ে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত। ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী দুর্নীতি ও ক্যাসিনো-সংশ্নিষ্টতায় খালেদ, মিজান, শামীম, সম্রাট প্রমুখকে গ্রেফতার করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নিজের ঘর’ থেকেই ‘উইপোকা’ দমন অভিযান শুরু করেছেন, যা বহুল প্রশংসিত।

এখন সবাই জানতে ও বুঝতে চাইছে- অভিযান কতদূর যাবে, দুর্নীতির রুই-কাতলারা কি ধরা পড়বে, তারা কি শাস্তি পাবে, লুটে নেওয়া অর্থ কি উদ্ধার হবে ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন; এর একাংশ দুর্নীতিগ্রস্ত। দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে তাদের লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগপত্র ও তদন্তে অনিয়ম, দুদকের সীমাবদ্ধতা ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বহুল আলোচিত। এটি বোধগম্য যে, পুলিশ ও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সজাগ থাকত, দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো নজরদারিতে রাখত, অপরাধীদের যথাযথ বিচার হতো; তবে দুর্নীতি এত সর্বগ্রাসী হয়ে উঠত না। তাই দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে হলে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন পুলিশ ও প্রশাসনে; আরও বেশি প্রয়োজন রাজনীতিতে।

রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক। রাজনীতি ঠিক না হলে কোনো কিছুই ঠিক হবে না। রাজনীতি পরিশুদ্ধ না হলে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিশুদ্ধ হবে না। এমনকি শিক্ষাঙ্গনের অরাজকতাও দূর হবে না। শিক্ষাঙ্গনে যা ঘটছে তা রোগের লক্ষণ, যা চূড়ান্ত বিচারে রাজনীতি থেকে উৎসারিত।

রাজনীতিতে যখন টাকার খেলা, পেশির দাপট; অঙ্গ সংগঠন কি তা থেকে দূরে থাকতে পারে? তারা যা দেখছে, শুনছে, তাই অনুসরণ করছে। এটি সত্য যে, রাজনীতি ঠিক পথে থাকলে ওরা বিপথে যেত না। রাজনৈতিক অঙ্গনে আদর্শবাদের চর্চা থাকলে ছাত্রকর্মীরা তাতে অনুপ্রাণিত হতো।

বুয়েটে আবরার হত্যার পর শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের প্রস্তাব উঠেছে। ইতিমধ্যে বুয়েট কর্তৃপক্ষ ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। বিশিষ্টজনের অনেকেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলছেন; কেউ আবার সংস্কারের কথা, শুদ্ধি অভিযানের কথা বলছেন। ইতিমধ্যে শোভন ও রাব্বানীকে অপসারণের মধ্য দিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। শুধু ছাত্রলীগে নয়; সব ছাত্র সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান দরকার। দরকার সংস্কারও। তবে রাজনৈতিক দলে শুদ্ধি ও সংস্কার আরও জরুরি মনে করি।

রাজনীতিকরাই বলছেন, রাজনীতি রাজনীতিকদের কাছে নেই। রাজনীতিতে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, কালো টাকার মালিক, পেশিধরদের দাপট বেড়েছে। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। তবে রাজনীতিতে সব পেশার মানুষের জন্য দ্বার অবারিত। কিন্তু তাদেরকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে। আগে ছাত্র আন্দোলন বা জনস্বার্থের কোনো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতা তৈরি হতো, তাদের জেল-জুলুম সইতে হতো। তখন নেতার মর্যাদা নিরূপণ হতো- কে কত ত্যাগ করেছেন, জেল-জুলুম সয়েছেন, জনগণের মাঝে কাজ করেছেন; এসব কিছু। এখন কার কত টাকা, কার কত বড় গাড়ি বা বাড়ি। এসব থাকা দোষের নয়, তবে নেতৃত্বের মানদণ্ড হবে রাজনৈতিক ভূমিকা ও ব্যুৎপত্তি। ব্যক্তি যে পেশার লোকই হোন না কেন, আগে রাজনীতিক হতে হবে; তারপর মনোনয়ন, এমপি ও মন্ত্রীগিরি। কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা। হঠাৎ মনোনয়ন বাগিয়ে সামরিক-বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ীরা এমপি, এমনকি মন্ত্রী হচ্ছেন; তারপর রাজনীতিক। এখন তো দল বা অঙ্গ সংগঠনের পদও খরিদ করা যায়। রাজনীতির অভিধানে বাংলাদেশ দুটি পরিভাষা সংযোজন করেছে- মনোনয়ন বাণিজ্য ও পদ বাণিজ্য। এই পদ বাণিজ্য ও মনোনয়ন বাণিজ্যই দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক, পেশিধরদের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে বা দিচ্ছে। এটি কোনো বিশেষ দলের ব্যাপার নয়, সামগ্রিক রাজনীতির চিত্র।

রাজনীতিতে পেশি সর্বদাই ছিল। তা ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছিল সামরিক শাসনামলের নির্বাচনগুলোতে। টাকার ব্যাপক ছড়াছড়ি তখন থেকেই। ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ধারণা করা গিয়েছিল, পেশির দৌরাত্ম্য থাকবে না, টাকার খেলা কমবে। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর নির্বাচনে পেশির দৌরাত্ম্য কমেছিল। কিন্তু টাকার ব্যবহার অব্যাহত ছিল। ‘৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি বেশ কিছু টাকাওয়ালাকে মনোনয়ন দেয়। ওই নির্বাচনে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের টাকার অভাব ছিল, বিএনপির টাকার দাপট ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনুসরণ করে এবং দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে হায়ার করা টাকাওয়ালাদের মনোনয়ন দেয়। এই প্রক্রিয়ায় টাকাওয়ালারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে নেতৃত্বে জায়গা করে নেন। ছিটকে পড়েন ত্যাগী, আদর্শবান, পরীক্ষিত নেতারা।

নির্বাচনে পেশি ও টাকার খেলা অবারিত থাকলে দলের নেতৃত্বে দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক ও পেশিশক্তিধরদের উত্থান বন্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনে সব প্রার্থীর নাম সংবলিত একই পোস্টার ও একই পুস্তিকায় প্রার্থী পরিচিতি; গেট-ব্যানার-ফেস্টুন বন্ধ; নির্বাচনী ক্যাম্পের সংখ্যা কমিয়ে আনা ইত্যাদি পদক্ষেপ নিলে টাকার খেলা কমে আসত। বাম দলগুলো এসব প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এসব প্রস্তাব কানে তুলছে না। তবে এতে ক্যাডার, মাতব্বর, পুলিশ-প্রশাসনের মাথা ও ভোট কেনা বন্ধ হবে না। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই আসল কথা। প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুশীলন।

লক্ষ্য করার ব্যাপার, দেশে কতটুকু গণতন্ত্র আছে কি নেই, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। এটি প্রয়োজনীয় বিতর্ক। তবে কোন দলে কতটুকু গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে অগণতান্ত্রিক ধারা রয়েছে। দলীয় প্রধানের ক্ষমতা অগাধ। তিনি এককভাবে কমিটি করেন, অঙ্গ দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন, যে কাউকে কোনো পদ থেকে বাদ দিতে পারেন বা কাউকে বসাতেও পারেন। সেদিক থেকে আওয়ামী লীগের কমিটি গণতান্ত্রিক। কিন্তু চর্চায় সাযুজ্য আছে। দলে কে কোন পদে থাকবেন, সহযোগী সংগঠনের কে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হবেন, তা দলীয় প্রধানের এখতিয়ার। সব দলের অভ্যন্তরেই গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সীমিত। ভিন্নমত চর্চার অবকাশ নেই।

দল ও সহযোগী সংগঠনের শাখাগুলোর নিয়মিত সম্মেলন হয় না, কমিটির সভা হয় না। নেতাদের একক নেতৃত্বে দল পরিচালিত হয়। পরিবারতন্ত্রের দাপট সর্বত্র। সংসদ সদস্য, মেয়র, উপজেলা বা ইউনিয়নের সভাপতি মারা গেলে তার পত্নী, ভাই বা সন্তানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তখন মাঠের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অনেক সময়ে বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ীও হন। সে যাই হোক, দেশের প্রায় সব দলই সামন্ত-আমলাতান্ত্রিক জোয়ালে বন্দি। ব্যতিক্রম নয় বাম দলগুলোও। সেখানে দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। তারা কারণে-অকারণে বিভক্ত হচ্ছে।

সর্বস্তরে গণতন্ত্রের চর্চা হলে পরিবারতন্ত্রের দাপট কমে আসত। এমপি বা মেয়রের পরিবারের কোনো সদস্যকে রাজনীতি করতে হলে তাকেও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হতো। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মনোনয়ন ও সর্বস্তরে নেতা নির্বাচিত হলে দুর্নীতিবাজরা সহজে নেতৃত্বে আসতে পারতেন না; মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ হতো, রাজনীতিতে আদর্শবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতো। আর রাজনীতির আদর্শবাদী নেতৃত্বই অর্থনৈতিক দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে।

তাই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে রাজনীতিকে অনিয়ম-অগণতান্ত্রিকতা-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে- রাজনীতি ঠিক না হলে সমাজ ঠিক হবে না, উন্নয়নের দুর্নীতি দূর হবে না, ছাত্রলীগ-যুবলীগও ঠিক হবে না। সঙ্গত কারণেই পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি রাজনীতিতেও চাই সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান।-লেখক: একজন সাংবাদিক। -( সূত্র: সমকাল)