রাজধানীতে বাড়ছে কবরস্থান সংকট

মৃত্যুর পর সাড়ে তিন হাত কবরের জায়গাটুকুর স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই রাজধানীবাসীর। দুই কোটি মানুষের জন্য ঢাকায় গোরস্থান আছে মাত্র দশটি। যা অনেক আগেই পূরণ হয়ে গেছে। এখন ওইসব গোরস্থানে অস্থায়ীভাবে কবর দেওয়া হচ্ছে। একটি কবরের ওপর পড়ছে আরেকটি কবর। ফলে গোরস্থানে কবর দিয়ে আসার পর হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয়জনের স্মৃতি। এমনকি গোরস্থানগুলোতে এক কবরের ওপর একাধিক মৃত ব্যক্তির নামফলক ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে ৩০ হাজারের মতো কবরের জায়গা থাকলেও তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন একটি কবরের ওপর অস্থায়ীভাবে আরেকটি কবর দেওয়া হচ্ছে। কবরস্থান ঘুরে দেখা যায়, অসংখ্য কবরের মাঝে কোনটি কার তা বোঝার উপায় নেই। একটি আরেকটির গায়ে লেগে আছে। নতুন জায়গা অবশিষ্ট নেই।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে গোরস্থান না করায় রাজধানীতে কবর সংকট বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১৬টি ইউনিয়ন। ওইসব এলাকাগুলোতে প্রায় ১৫ লাখ লোক বসবাস করে। কবরস্থানের সমস্যা সমাধানে ডিএসসিসি’র সঙ্গে যুক্ত হওয়া নতুন আট ইউনিয়নের প্রতি জোর দেওয়ার কথা বলছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।

সংস্থাটির উপ-সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা লত্ফুর রহমান জানান, ডিএসসিসি’র সঙ্গে যুক্ত হওয়া নতুন পাঁচটি অঞ্চলের প্রত্যেকটিতে অন্তত দুটি কবরস্থান ও পুরো এলাকায় দুটি শ্মশানঘাট করার পরিকল্পনা আছে। ওইসব অঞ্চলে যেসব কবরস্থান আছে সেগুলো আমরা নিব। প্রয়োজনে এর সঙ্গে আরো জমি অধিগ্রহণ করা হবে। বর্তমানে যেসব কবরস্থান আছে সেগুলোর মধ্যে জুরাইন কবরস্থানের আকার অনেকখানি বাড়ানো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা করে জায়গা দেওয়া হয়েছে। আজিমপুর কবরস্থানে পুরাতন মসজিদ ভেঙে নতুন মসজিদ করায় কিছু জায়গা বাড়বে। রাজধানীতে কবর সংকটের সুযোগে গড়ে উঠছে বেসরকারি গোরস্থান। এম আই এস হোল্ডিং লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান কবরের জন্য প্লট বিক্রি করেছে। ঢাকার অদূরে পূর্বাচলের ৩০ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন গাজীপুর কালীগঞ্জ উপজেলার পানজোড়া মৌজায় এই কবরস্থান গড়ে তোলার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। মৃত্যুর আগেই স্থায়ী কবরের জায়গা কিনে রাখছেন অনেকেই।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলায় প্রায় ২০০টি কবর বুকিং পেয়েছেন তারা। সাত ফুট দৈর্ঘ্য এবং সাড়ে তিন ফুট প্রশস্ত একটি স্থায়ী কবর তিন লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট দশটি সরকারি গোরস্থান আছে। আজিমপুর কবরস্থান, জুরাইন কবরস্থান, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, বনানী কবরস্থান, খিলগাঁও কবরস্থান, রায়েরবাজার কবরস্থান, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর ও ১২ নম্বর সেক্টরে রয়েছে দুটি কবরস্থান। এছাড়া ধলপুর কবরস্থান ও মুরাদপুর শিশু কবরস্থান নামে আরো দুটি কবরস্থান রয়েছে।

ডিএনসিসি’র সমাজকল্যাণ বিভাগের কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন জানান, রায়েরবাজারে আমরা বড় কবরস্থান করেছি। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত এলাকাতে আরো কয়েকটি কবরস্থানসহ শ্মশানঘাট করা হবে। সনাতন ধর্মের লোকদের জন্য রাজধানীতে দুটি শ্মশানঘাট রয়েছে। এ দুটোই দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতায় কোনো শ্মশানঘাট নেই। কর্তৃপক্ষ বলছে, মাত্র দুটি শ্মশানঘাট থাকলেও মৃতদেহ সত্কারে তেমন অসুবিধা হয় না।

খ্রিস্টান ধর্মীয় লোকদের জন্য তেজগাঁও হোলি রোজারি চার্চের পাশে, মোহাম্মদপুর এবং ওয়ারী এবং তেজগাঁও তিনটি স্থানে ৩ হাজার লোকের মরদেহ সত্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

উত্তর সিটির আওতাধীন বনানী কবরস্থানে রয়েছে ২২ হাজার কবরের জায়গা। তাও অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। রায়েরবাজারে প্রায় ৮১ একর জায়গার ওপর কবরস্থান তৈরি করেছে সংস্থাটি। সেখানে প্রায় ৯০ হাজার কবর দেওয়ার জায়গা আছে। রাজধানীর সরকারি কবরস্থানগুলোতে অস্থায়ীভাবে দুই বছর পর পর যোগ হয় নতুন আরেকটি মৃত ব্যক্তির কবর।

মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের মৃতদেহ সত্কারের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোর চিত্রও একই রকম। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তেজগাঁও গির্জার পাশে প্রতি বছর প্রায় ১০০ নতুন কবরের জায়গার জন্য আবেদন জানানো হয়। তাই পাঁচ বছর পর পর পুরনো কবরেই পুনরায় সমাহিত করতে হয় নতুন মরদেহ। এর বাইরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিছু পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে। তবে সেসব কবরে নিকটাত্মীয়দের বাইরে কাউকে দাফন দেওয়া হয় না। রাজধানীতে স্থায়ীভাবে কোনো কবর ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে না। এ কারণে ঢাকায় বসবাসরত অস্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য কবরের সংকট রয়েই গেছে।

সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে দক্ষিণের জুরাইন ও আজিমপুর এবং ২০১২ সাল থেকে ঢাকা উত্তরের ছয়টি কবরস্থানে স্থায়ীভাবে আর কবরের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। তবে দুই সিটি কর্পোরেশনের কবরগুলোতে কবর সংরক্ষণ করতে হলে ৫ বছরের জন্য এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১০ বছরের জন্য তিন লাখ টাকা, ১৫ বছরের জন্য ৬ লাখ টাকা, ২০ বছরের জন্য ৯ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ১২ লাখ টাকা ফি দিতে হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রতি কবরের সাধারণ রেজিস্ট্রি বাবদ ২০০ টাকা ফি থাকলেও বর্তমানে দফন বাবদ কোনো টাকা দিতে হয় না। সংস্থার মেয়র সাঈদ খোকন তার নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ফি মওকুফ করে দিয়েছেন। এছাড়া সংস্থার আওতায় অসচ্ছল নাগরিকদের মৃতদেহ তার স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিনা খরচে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দেওয়া হচ্ছে।-ইত্তেফাক