যে কারণে শেখ হাসিনা এত আত্মবিশ্বাসী

যুগবার্তা ডেস্কঃ বিএনপির কোণঠাসা অবস্থা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ‘অপরিহার্যতা’ই আগামীতে আবারো ক্ষমতায় আসার বিষয়ে আওয়ামী লীগকে অধিক আত্মবিশ্বাসী করেছে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উন্নয়ন ভিশন’ জনগণ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া তার ব্যক্তিগত সততা ও সাহসিকতার কারণেই তিনি অধিক আত্মবিশ্বাসী। সরকারের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত তথ্য পান। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন- আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে।
শনিবার দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দেয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ২০২০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জম্মশতবার্ষিকী পালন করবে। টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মবিশ্বাসের মূলে কী- তা নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা হয় মানবকণ্ঠের। আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষ্য- জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেখ হাসিনা যেভাবে বাংলাদেশের ইমেজ ও তার নেতৃত্বকে তুলে ধরছেন- আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেতারাও শেখ হাসিনার সঙ্গে ভবিষ্যতে কাজ করতে চাইছেন।
বিভিন্ন জরিপে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে- সরকারের কাছে এমন তথ্য থাকার পরও প্রধানমন্ত্রীর এমন আত্মবিশ্বাসের হেতু নিয়ে আওয়ামী লীগের বেশ ক’জন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আরো এক বছর বাকি। প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণাতেই দলের সব এমপি যেভাবে নির্বাচনী এলাকায় সময় দিচ্ছেন- আগামী এক বছর এর ধারাবাহিকতা থাকলে, জনগণ তার প্রতিনিধিকে হাতের নাগালে পেলে নিশ্চিতভাবেই নির্বাচনে ভালো ফলাফল হবে। এটাই শেখ হাসিনার নেতৃত্ব- সঠিক সময়ে তিনি সঠিক বার্তা দিয়েছেন দলের এমপিদের। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। যেসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর অবস্থা ভালো নয়; কিন্তু সরকারের উন্নয়নের প্রতি জনগণের আস্থা আছে- সেখানে জনগণের পছন্দের প্রার্থীর হাতেই নৌকা প্রতীক তুলে দেয়া হবে। সারাদেশে এমন অনেক প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে; বর্তমান এমপির বিরুদ্ধে এ পরিবর্তনকে জনগণ নিজেদের বিজয় মনে করবে। শেখ হাসিনার ওপর পুনরায় আস্থা জ্ঞাপন করবে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ভোটের হিসাবের বাইরেও বিভিন্ন ফ্যাক্টরকে সামনে রেখেই দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা অধিকতর আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন। টানা ক্ষমতায় থেকে দেশে যেমন বিভিন্ন বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন, তেমনি নিজ দলকেও সুসংহত করেছেন। দল ও সরকারে একক নেতৃত্ব অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে যে কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাকে বেগ পেতে হয় না।
দলীয় সূত্র জানায়, ১/১১তে শেখ হাসিনার পরিবর্তন যারা চেয়েছিলেন তেমন অনেককেই দল ও সরকারে জায়গা দিয়ে নিজের বশীভূত করেছেন শেখ হাসিনা। সভাপতিমণ্ডলীতে জায়গা দিয়েছেন অন্তত চারজনকে, ১/১১তে যাদের ভূমিকা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল। সে সময় একজন নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর দল থেকে কোনো বিবৃতি যায়নি, তিনিও দলের সর্বোচ্চ ফোরামে জায়গা পেয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আছেন তিনজন- ১/১১ সময়ে যাদের ভূমিকা শেখ হাসিনার রাজনীতির অনুকূলে ছিল না। আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে যেমন বহুধা বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন শেখ হাসিনা। ১/১১-পরবর্তী সময়েও সবাইকে এক কাতারে নিয়ে দলকে সুসংহত করেছেন। রাজনীতিতে নিজের দর্শন প্রতিষ্ঠা করে গড়ে তুলেছেন একনিষ্ঠ কর্মী বাহিনী। যার কারণে যে কোনো পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস হারান না শেখ হাসিনা।
শুধু নিজ দলই নয়; আওয়ামী লীগ নিজেদের বিরোধী প্রতিপক্ষ বলতে সংসদের বাইরের বিএনপিকেই মনে করে। টানা এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন রাজপথে অনেকটাই কোণঠাসা। আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষায়, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এখন ‘দেউলিয়া’। ঘরোয়া কর্মসূচি ছাড়া মাঠে কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না। বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত। কর্মীভিত্তিক এ সংগঠনটি এখন নির্বাচন কমিশনে নিষিদ্ধ। বিএনপির মতো জামায়াতে ইসলামীও দেশের রাজনীতিতে পর্যুদস্ত। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হঠাৎ আলোড়ন তোলা কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোও এখন সরকারের অনুকূলে। এ অবস্থায় রাজপথ কাঁপানোর মতো কোনো সামর্থ্য ও সুযোগ সরকারবিরোধীদের নেই বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থিদের মত পাল্টিয়ে কখনো তুমুল বামপন্থি হতে দেখা যায়। কখনো মধ্যম পন্থায় আসেন না। এই প্রথম শেখ হাসিনা কট্টর ডানপন্থি কোনো রাজনৈতিক দলকে নিজের কব্জায় নিতে পেরেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপির টানা ৯০ দিনের আন্দোলন নস্যাৎ করে দিয়েই ক্ষমতাসীনদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে ওঠে। হাতের নাগালে বিভিন্ন ইস্যু পাওয়ার পরও জনগণকে রাজপথে নামাতে না পারার কারণে সরকারের কাছে বিএনপির দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে আরো বেশি।
এর পাশাপাশি শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও সততা তার আত্মবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে দলের নেতারা মনে করছেন। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সততা ও সাহসিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু। বিশ্বব্যাংক তাদের উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। নিজেদের অর্থে এত বড় প্রকল্প গ্রহণ করার মতো সাহস এ দেশে শেখ হাসিনা ছাড়া কোনো নেতার নেই। সততা, সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা ও সাহসিকতাই শেখ হাসিনার আত্মবিশ্বাসের মূল জায়গা।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আত্মবিশ্বাসী বলেই শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরেছেন। যখন বঙ্গবন্ধুর খুনিরা অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছেন নিজের ওপর অগাধ আত্মবিশ্বাস থেকেই। এমন সাহসী সিদ্ধান্তের রাজনীতিক বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীতেই বিরল। আগামীতে ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, লুটপাটের কারণে বাংলাদেশের জনগণ বিএনপিকে বর্জন করেছে আর শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভিশন গ্রহণ করেছে। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতায় জনগণই শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চায়। আর বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতায় শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। এটাই প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিরোধী রাজনীতিক দলের কোণঠাসা অবস্থা, অভাবনীয় উন্নয়ন, দলের সুসংহত অবস্থার বাইরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও শেখ হাসিনা নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন। চলতি সপ্তাহে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে তিনি জাতিসংঘসহ শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চীনের সঙ্গে ওয়ান বেল্ট, ওয়ান ওয়েতে যুক্ত হচ্ছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, যুদ্ধজাহাজ ক্রয়সহ সামরিক সরঞ্জামাদি আমদানি, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে যুক্ত করে সবার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে চলেছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার ম্যানেজ করার ক্ষমতা অসাধারণ। সর্বশেষ ইউনেস্কো রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে সরকারের ব্যাপক তৎপরতায়। এ রকম অনেক বাস্তবতায় বিশ্বনেতারা এ অঞ্চলে তাদের রানিংমেট হিসেবে শেখ হাসিনাকেই চাইবেন। নিজের গৃহীত দৃষ্টিকাড়া সব উন্নয়ন, জনপ্রত্যাশা পূরণে দল ও সরকারে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার মানসিকতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় আবারো ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।-মানবকণ্ঠ