যে কারণে অভিজিতদের জীবন দিতে হয়!

18

আহমেদ জালাল : ওরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যেন গলাটিপে ধরছে। ওরাই কখনো কখনো ধর্মীয় লেবাজে সাম্প্রদায়িকতার কুট কৌশল চালিয়ে নানা ধরণের অপতৎপরতায় লিপ্ত। প্রকৃত ধর্ম মানুষে মানুষে সম্প্রীতির কথা শেখায়। পারস্পরিক হানাহানির কথা শেখায় না। এদেশে যারা ধর্ম প্রচার করেছেন, তারা অপর ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতার কথা বলেছেন, সেই বিষয়টি একালের ধর্ম ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোড়ন তোলে না। কারণ, ধর্মকে তারা বর্ম বানিয়ে বৈষয়িক ফায়দা লোটার জন্য এক ধরণের ব্যবসা করেন। বলা যায়-প্রায় প্রত্যোক ধর্মের মূলমন্ত্র মানবতা। আর মানবতাবিরোধীদের নির্মূল এবং উৎপাটনেই সাম্য, মৈত্রী ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ধর্ম নিয়ে যারা ফায়দা লুটছে তাদের কণ্ঠনালী থেকে মানবতা, শান্তি, সৌহার্দ্য, অসাম্প্রদায়িকতার বাণী কখনোই প্রকাশ পায়নি। ওদের আষ্টেপৃষ্ঠে অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, হীনম্মন্যতা। মধ্যযুগীয় ধ্যান ধারণা, কূপমুণ্ডকতা আর অর্বাচীনতায় এমনভাবেই আচ্ছন্ন যে, তাদের বদ্ধমূল ধ্যান ধারণা ও চিন্তা চেতনার বাইরেও যে বিশাল জগত রয়েছে, তা তাদের বিশ্বাসবোধ ধারণ করে না। এ দেশের জীবন দর্শনের অবিচ্ছেদ্য উপাদান ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা এবং সভ্যতা সংস্কৃতির মূলে আঘাত করার লক্ষ্য নিয়ে যারা উচ্চকণ্ঠ, তারা সমাজকে বিভাজনের, অস্থিতিশীলতার, অরাজকতার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিতে চায়। সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, সহনশীলতা, যুক্তিবোধকে অস্বীকার করে ধর্মাশ্রয়ী কথিত রাজনীতিকে বৈধরূপ দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কোনরকম যুক্তিতর্ক ছাড়াই প্রাচীন সংস্কার ও মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরার লোকও এ জগতে কম নয়। একাত্তরে ধর্ম ব্যবসায়ীরা পাকিস্তান হানাদারের সহযোগী হয়ে বাঙালী নিধন শুধু নয়, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ সবই চালিয়েছে ধর্মের নামে। এদের উত্তরসূরিরা স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার শুধু নয়, সশস্ত্র যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার সব মূলমন্ত্র উপড়ে ফেলে ধর্মের নামে ব্যবসা,সাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতিতে মত্ত। কোমলমতি শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা শ্রেনী পেশার মানুষকে বিভ্রান্তির আড়ালে রেখে মনোজগতে ধর্মীয় উগ্রবাদের চাষাবাদ করা হয় স্বাধের এই স্বাধীন বাংলায়! আর এসব কারণেই এই বঙ্গদেশে আজও মত প্রকাশের জন্য বিজ্ঞান মনস্ক লেখক অভিজিতদের জীবন দিতে হয়!!
অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল মত প্রকাশের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা, আর সে কারণে এ মামলার আসামিরা কোনো ‘সহানুভূতি পেতে পারে না’ বলে পর্যবেক্ষণ এসেছে আদালতের রায়ে। ১৬ ফেব্রুয়ারি (২০২১) মঙ্গলবার দপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। ছয় আসামির মধ্যে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পাঁচ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং উগ্রপন্থি এক জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন তিনি। বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, “অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য হল জন নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ ও নিরুৎসাহিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ না করতে পারে।”
প্রসঙ্গত : পদার্থবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ থাকতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি মুক্তমনা ব্লগ সাইট পরিচালনা করতেন তিনি। জঙ্গিদের হুমকির মুখেও তিনি ২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় অংশ নিতে দেশে এসেছিলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে জঙ্গি কায়দায় হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিৎ রায়। চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। ওই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে থাকেন মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও অধিকারকর্মীরা।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান, রণাঙ্গণের মুখপত্র ‘দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ’।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।