যেখানে লিখা আছে সমাজতন্ত্রের মুলমন্ত্র

ইন্দ্রানী সেনঃ বাবা, প্রথম কবে তোমার হাত ধরে হেটেছি মনে নেই। প্রথম কবে তোমায় বাবা বলে ডেকেছি তাও মনে করতে পারি না। শুধু মনে আছে যখন বানান করে পড়তে শুরু করি তখন এক রোদ্রদীপ্ত সকালে তুমি ছোট্ট কিন্তু ভারী চারটি বই হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলে পড়ার ফাঁকে পড়িস। সেই বইগুলো আর কিছু নয় মস্কোর প্রগতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বই অ,আ ক,খ যেখানে লিখা আছে সমাজতন্ত্রের মুলমন্ত্র। একদিন সন্ধ্যাবেলায় তোমার হাতধরেই যোগ দিয়েছিলাম শিশু সংগঠন খেলাঘরে। তোমার রাশভারী স্বভাবের আড়ালে ছিল সদাহাস্যময় বন্ধুত্বপূর্ণ পিতার নির্মলতা। তোমাকে প্রচন্ড ভয় পেতাম আবার খুব কাছের নির্ভর বন্ধুও তুমিই ছিলে। তোমাকে দেখেই আমি পুরুষ চিনেছি বাবা। সাংবাদিকতা পেশা আর সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর একজন রাজনৈতিক সংগঠক হওয়ার কারণে তুমি তেমন করে আমাদেরকে সময় দাওনি। তোমার কাছে পরিবার, জাগতিক ভোগ বিলাসের চেয়ে পেশাগত নৈতিক দায়িত্বপালন আর রাজপথের লড়াইটা যে অনেক বড়। মা সহ আমরা, তোমার সন্তানেরা কখনো তোমার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলিনি কেননা আমাদেরকে কখন যে তুমি তোমার লড়াই এর পথিক করে ফেলেছ তা টেরই পাইনি। আমার খুব মনে পড়ে যখন হবিগঞ্জের সরকারী বিকেজিসি স্কুলে তৃতীয় শ্রেনীর ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম, প্রচন্ড দারিদ্রতার কারণে প্রাইভেট শিক্ষক ছাড়া, সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করে নিজে নোট তৈরী করে পড়ে যখন দুটি লেটারসহ প্রথম বিভাগ পেয়ে এসএসসি পাশ করলাম তখন তোমার উজ্জ্বল চোখ, বুকের প্রশস্থ ছাতি আর ঠোঁটের কোণে পরিতৃপ্তির হাসি আমাকে মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস যুগিয়েছিল। কোন প্রতিকুলতাই আমাকে হার মানাতে পারেনি বাবা, তোমার কাছ থেকেইতো শিখেছি সকল বন্ধুর পথ অতিক্রম করে কিভাবে এগিয়ে যেতে হয়। ২০০৫ সালের এমনই এক শীতের রাতে তুমি যখন সঙ্গোপনে আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে না ফেরার দেশে তখনো আমি কাঁদতে পারিনি বাবা। তোমার অন্তিমযাত্রার খবরটি সবাইকে আমিই জানিয়েছিলাম যে। তোমার কথা ভেবে আমি আজও কাঁদতে পারিনা বরং তোমার অপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করার প্রত্যয়ে দৃঢ় হই। বাবা, তুমি যে স্বপ্ন দেখতে শোষণমুক্ত সমাজের, সে সমাজ আজো পাইনি আমরা। তোমার লড়াইটা আজও চলমান। আমরা হাটছি তোমারই পথে, শ্রমজীবি মানুষের মুক্তির লক্ষে। যেখানেই থাক ভাল থেকো বাবা। তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি বাবা।।-লেখকঃ একজন সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ