যদি বন্ধু যাইবার চাও —

22

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ আমাদের পরিবার ছিল গ্রামের ভিতর একটি বর্ধিষ্ণু পরিবার। আমার বাবা- মার সাত ছেলেমেয়ে, নাতিপুতিসহ ভারি সংসার। মাকে সংসার নিয়ে প্রায়শই হিমসিম খেতে হতো। তবে তার মুখে কোন দিন বিরক্তির ছাপ দেখিনি। সকালে উঠেই কেউ খাবে রুটি, কেউ গরম ভাত, কেউ ফেন- যাউ ভাত, কেউ খেতে চায় বাসি মাংস দিয়ে টক- ঝাল খিচুড়ি। একেক জনের একেক আবদার। সীমিত সামর্থের মধ্যে থেকেও মা আমার সবার আবদার মিটাতেন। কীভাবে যে মিটাতেন ভেবে বিস্মিত হই। হাসিমুখে সামাল দিয়েছেন পুরোটা সংসার। দম ফেলার ফুসরত পর্যন্ত তাঁর ছিলনা।

কালেভদ্রে মা তাঁর বাপের বাড়ি যেতেন। হাটুজল- নদী পেরিয়ে মাত্র দুই কিলোমিটার পথ। খুশিতে ডগমগ হয়ে আমিও মায়ের আঁচল ধরতাম। কহিনুর- শহিদুল আমার মামাতো ভাইবোন, ছোট বেলার খেলার সাথি। মামাবাড়ির আঙ্গিনায় পা দিতেই ওরা এসে হাজির হতো। দুজন দুই কাঁধে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে পুকুর পাড়ে নিয়ে যেত। লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ, মৌমাছির গুণগুণ আওয়াজ কানে ভেসে আসত। আঙ্গুল তুলে উঁকি মেরে দেখাত ঐ যে তেতুল গাছে ঘুঘুর বাসা, বাঁশঝাড়ে বকের ছানা মাথা তুলে আছে। মগডালে পাকা বেল, সিঁদুরে আম, আতাফল গাছের ডালে এখন প্রায়শই টিয়া বসে। এক নিমিষেই সব বলা- কওয়া- দেখা শেষ হয়ে যেত।
কত কসরত করে পিয়ারার দুই কালওয়ালা ডাল এবং সাইকেলের টিউব কেটে বাঁটুল বানানোর সেই প্রাণান্তকর চেষ্টা। ইটের গুড়ায় গাবের কস মিশিয়ে, চালের উপর রোদে শুকিয়ে বাঁটুলের গুটি বানানো। বাঁটুল- প্যান্টের পকেট ভর্তি গুটি নিয়ে দলবেঁধে খাল বিল, বনবাদাড়ে ছুটে বেড়ানোর কথা এখনো দিব্বি মনে পড়ে।

রাতেই কহিনুর বলে রেখেছে, খুব ভোরে উঠতে হবে- কাকডাকা ভোরে। আজ ছিল হাটবার, ভোরে হাটখোলা যেয়ে পয়সা কুঁড়াবো। ন্যাটা ঝাড়ুদার বিশা আসার আগেই যেতে হবে। পাই-আনা, সিকি-আধুলি যা পাই। পয়সা পেলে নরেন ঘোষের দোকানে এসে ছানা- ঘোল খাবো। যে কথা সেই কাজ। তখনো সূর্য উঠেনি। আধো অন্ধকারে ধুলা বালি,খড়কুটা সরিয়ে দৌড় ঝাঁপ দিয়ে পয়সা কুড়ানো আমার জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমি ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে পারছিলাম না। কহিনুরের ঈগল চোখ। দুচার পয়সা সেই পেয়েছে। আমি একটি কানা পয়সা পেয়ে লাফিয়ে উঠলাম। শহিদুল, হীরা, কহিনুর দৌড়ে এসে ঘিরে ধরলো আমাকে।
দেখি! দেখি পয়সা? কহিনুর হেসে কুটিকুটি। আরে ধুত্তুরি! এটা অচল পয়সা, এখন আর এ পয়সা চলেনা। আমি কী মনে করে মাটিতে ফেলে দিলাম। পয়সাটা মাটিতে গড়িয়ে গেল। বললাম পয়সা চলেতো— কহিনুরের আবারো সেকি হাসি।

বল্লার চাক ভেঙ্গে ডিম দিয়ে বড়শিতে মাছ ধরা। কাঠঠোকরা পাখির বাসায় হাত দিয়ে সাপের ছোবল থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া। ঢিল ছুড়ে আম পাড়া, কাঁদা ছিটিয়ে মাছ ধরা, ধুলাবালি মেখে খেলা করা, ঝাপ দিয়ে পুকুরে নামা কত স্মৃতি কত কথা মনে বাজে।

গুনার তারে দুই মাথায় দিয়াশলাই বক্সের খোল বেধে, কানে লাগিয়ে কহিনুর- সাহিদার গাওয়া পল্লীগীতির কথা ‘ও বন্ধু কয়া যাও, কয়া যাওরে — যদি বন্ধু যাইবার চাও, ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে —-‘
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০
লেক সার্কাস, ঢাকা।