যত্রতত্র পশুর হাট নয়

4

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহঃ আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের একটি পবিত্র ঈদুল আজহা। পশু কোরবানি দেওয়া ধর্মীয় বিধান। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে পশুর হাট বসবে। এই হাটে পশু কেনাবেচায় জনসমাগম হবে এবং এর মাধ্যমে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ঘটবে বলে অনেকেই বলেছেন। এটি সঠিক। কারণ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব না মানলে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। তাই কোরবানির হাটে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য যত্রতত্র হাট বসানো যাবে না। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে হাট বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক হাটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে ঝুঁকি কম থাকবে। তবে কোরবানির হাটের প্রয়োজনীয়তাও আছে। কারণ কোরবানির সঙ্গে শুধু ধর্মীয় বিধানই জড়িত নয়, এর সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতিও জড়িত। অনেক খামারি আছেন, যারা এই ঈদ উপলক্ষে বছরব্যাপী পশু লালন-পালন করেছেন, গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ আছেন, যারা একটি-দুটি গরু-ছাগল পালন করেন এই ঈদে বিক্রির জন্য। এতে যা আয় হয়, তাতে তাদের জীবন চলে বা অভাব কমে। আবার কোরবানির পশুর চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের কাঁচামালের জোগানের সিংহভাগ পূরণ করে, এই শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়েও বহু শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জড়িত। এমনকি পশুর হাটের আয়োজন, পশু বাড়িতে আনা, কোরবানি দেওয়া, কাটাকাটি করার সঙ্গেও বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে।

তাই শুধু ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে পশুর হাট বন্ধ করা যাবে না। তবে ঝুঁকি কমাতে ক্রেতা-বিক্রেতা, হাটের ইজারাদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকারকে যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। প্রয়োজনে মানতে বাধ্য করতে হবে। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে যত্রতত্র হাট বসানো বন্ধ করতে হবে। বড় ও খোলা জায়গায় হাট বসাতে হবে এবং বিক্রেতাদের দূরত্ব বজায় রেখে পশু নিয়ে বসতে হবে। যাতে ক্রেতাদের পক্ষে শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব হয়। অনেক সময় বিক্রেতারা তিন-চারজনকে সঙ্গে নিয়ে কোরবানির হাটে আসেন। এই প্রবণতা বাদ দিয়ে যত কম সম্ভব মানুষ নিয়ে হাটে আসতে হবে। ক্রেতারও একা হাটে গিয়ে যত দ্রুত সম্ভব পশু কিনে বাড়ি ফিরতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই আবশ্যিকভাবে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, মাথার ক্যাপ ও সম্ভব হলে গাউন পরতে হবে। অনেক ক্রেতা আছেন, যারা কয়েকটি হাট ঘুরে যাচাই-বাছাই করে পশু কেনেন, পশু নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন। এই প্রবণতা পরিহার করতে হবে। যারা একাধিক পশু কোরবানি দিতেন তারা এবার একটা কোরবানি দিন। বাকিগুলোর টাকা শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা কর্মহীন এবং অতিদরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে পারেন। এতে দরিদ্র মানুষগুলোর উপকার হবে। পশুর হাটে যেন অসুস্থ পশু না আনা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে, কোনো পশু অসুস্থ মনে হলে ক্রেতারা তার কাছে যেন না যান। আর গ্লাভস পরা ছাড়া পশুর গায়ে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। হাটের ইজারাদার যারা থাকবেন, তাদের দায়িত্ব থাকবে হাটে পর্যাপ্ত স্যানিটাইজার বা সাবান পানির ব্যবস্থা রাখা। যাতে ক্রেতা-বিক্রেতারা হাত পরিস্কার রাখতে পারেন। এ ছাড়া ইজারাদাররা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নিয়ে হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও বিষয়টি তদারকি করতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই মনে রাখতে হবে সুরক্ষা নিজের কাছে, নিজেও বাঁচতে হবে, অন্যকেও বাঁচাতে হবে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানলে ধর্মীয় বিধান ও জীবন দুটোই রক্ষা পাবে, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, এমন পরিস্থিতিতে আমরা আগে কখনও পড়িনি। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, সচেতন হতে হবে এবং নাগরিক দায়িত্বও পালন করতে হবে। সবার কাছে অনুরোধ থাকবে, এবারের ঈদে যে যেখানে আছেন, সেখানে থেকেই উদযাপন করুন। শহর ছেড়ে গ্রামে যাবেন না। আগের ঈদে দলে দলে মানুষ ঢাকা ছাড়ার কারণে গ্রামের অবস্থা খারাপ হয়েছে। এবারও যাওয়া-আসা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সুতরাং সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টা, করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি