ম্যারাডোনা ছিলেন ফুটবল মাঠের ‘চে’

14

স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন ‘সর্বকালের সেরা’ ফুটবলার দিয়েগো ম্যারডোনা। এইতো সেদিন ৬০তম জন্মদিন পালন করা এই কিংবদন্তি এখন অতীত হয়ে গেলেন।

ফুটবল মাঠে অবিশ্বাস্য সব কীর্তির জন্য ম্যারডোনাকে ভক্তরা ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে তার ভেতরের শয়তান তাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই যদি কারো সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী নেতা চে গেভারা/চে গুয়েভারার সঙ্গেই বোধহয় তার অনেক বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।

কেন চে’র সঙ্গে তুলনা? আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের এক ঘিঞ্জি বস্তি থেকে ফুটবলপাগল দেশকে বিশ্বকাপের গৌরব এনে দিয়েছেন ম্যারাডোনা। যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ গৌরবগাঁথা হয়ে থাকবে। অনেকটা একক নৈপুণ্যে তার এমন অবিশ্বাস্য অর্জনের জন্যই তাকে নিজ দেশের বিপ্লবী কিংবদন্তি চে’র সঙ্গে তুলনা করা হয়।

‘ফুটবলের আশীর্বাদ’ ম্যারাডোনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জিতিয়েছেন। আবার মাদকযোগের কারণে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের মাঝপথ থেকে বের করেও দেওয়া হয় তাকে। বছরের পর মাদকাসক্ত থাকা, অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ এবং মদ পান তার ক্যারিয়ারকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করতে দেয়নি। এমনকি অতিরিক্ত কোকেন গ্রহণের ফলে ২০০০ সালে প্রায় মরতেই বসেছিলেন তিনি।

ম্যারাডনাকে ২০০৮ সালে দেখা গেল আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে। মৃত্যুকে জয় করে ফেরা কিংবদন্তিকে সাদরে গ্রহণ করে আর্জেন্টাইনরা। যদিও তার অধীনে বিশ্বকাপে বাজে পারফর্ম করেছিলেন লিওনেল মেসিরা, তবু যে কয়দিন দায়িত্বে ছিলেন তার উৎসাহ এবং উদ্দীপনা ছিল দেখার মতো। প্রিয় শিষ্য মেসিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন তিনি।

কোচ হিসেবে ম্যারাডনা নিজের সব অভিজ্ঞতা ঢেলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলি ছোট হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পারেননি। ব্যর্থতা সঙ্গী করে বিদায় নিতে হয় তাকে। তবে ফুটবলবোদ্ধাদের অনেকের মতে, ম্যারাডোনার ফুটবল দর্শন ও জ্ঞান গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা।

বল পায়ে রীতিমত ম্যাজিশিয়ান ছিলেন ম্যারাডোনা। দ্রুতগতি এবং নির্ভুল পাসের জন্য বিখ্যাত ছিলেন তিনি। তার খেলোয়াড়ি দক্ষতার কারণে অনেকে তাকে সর্বকালের সেরার তালিকায় ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের চেয়েও এগিয়ে রাখেন। আর্জেন্টিনায় তাকে ‘এল দিয়োস’ বা ঈশ্বর হিসেবে উপাসনাও করেন অনেক ভক্ত।

১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ জেতার পেছনে ম্যারাডোনার অবদান কোনোদিন ভুলতে পারবে না আর্জেন্টাইনরা। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দুটি অবিশ্বাস্য গোল ফুটবলভক্তদের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। এর একটা তো ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে বিখ্যাত। আর ইংল্যান্ডের অর্ধেক খেলোয়াড়দের ড্রিবল করে যে গোলটি করেছেন তা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে অমর হয়ে থাকবে।

ফুটবলের প্রতি ম্যারাডোনার ভালোবাসা একদম শৈশব থেকেই। বুয়েনস এইরেসের যে বস্তিতে বেড়ে ওঠেছেন তিনি, সেখানে প্রতি ৮ শিশুর ৫ জনই কারখানার শ্রমিক ছিল। তার মা দালমা তাকে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা দেওয়ার সময় চার্চের মেঝেতে তারার প্রতিচ্ছবি দেখে ভেবেছিলেন ছেলে বড় হয়ে অ্যাকাউন্টেন্ট হবে। কিন্তু ওপরওয়ালার চাওয়া ছিল একেবারেই ভিন্ন।

শৈশবে প্রথমবার যে ফুটবল পেয়েছিলেন তা বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেন ম্যারাডোনা। সেই থেকে ফুটবল তাকে অনেক কিছু দিয়েছে। আবার কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু। খ্যাতির চূড়ায় থাকা অবস্থায় মাদকের সঙ্গে সখ্যতার কারণে ১৯৯১ সাল থেকে তার জীবন উল্টো পথে হাঁটতে থাকে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ চলাকালীন ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে ১৫ মাস নিষিদ্ধ হন তিনি।

৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার ‘খুদে জাদুকর’ ম্যারাডোনার ব্যক্তিত্ব চুম্বকের মতো আকর্ষণীয়। কুঁকড়া চুল এবং আগ্রাসী মুখভঙ্গির সঙ্গে ঠোঁটকাটা স্বভাবের কারণে সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে তার কদর ছিল অনেক। তার চারপাশে চাটুকারও জুটে গিয়েছিল অনেক। ফলে বিতর্ক ছিল তার নিত্যসঙ্গী। তার ছবি তার বিতর্কিত কাণ্ডকীর্তি ছিল মিডিয়ার কাছে হটকেকের মতো।

১৯৯৭ সালে পেশাদার ফুটবলকে বিদায় বলার পর কার্যত ভেঙে পড়েন ম্যারাডোনা। পরের কয়েক বছর তিনি মাদকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। যার ফলে ২০০০ সালে একবার মৃত্যুর খুব কাছে চলেও গিয়েছিলন। পরে ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কিউবায় চিকিৎসা শেষে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় ছিলেন তিনি। সেখানে তিনি অনেকটা সময় কাটান কিউবার কিংবদন্তি বিপ্লবী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে। তার পায়ে প্রয়াত কাস্ত্রোর একটি ট্যাটুও আঁকা ছিল। আর হাতে ছিল স্বদেশী বিপ্লবী চে গুয়েভারার ট্যাটু।

আর্জেন্টিনার মিডিয়া সবসময় ম্যারাডোনার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকতো। বিশেষ করে ২০০৫ সালে গ্যাস্ট্রিক বাইপাস অপারেশন থেকে ওজন কমানো এবং ২০০৭ সালে শরীরে মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহলের উপস্থিতির কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সবকিছু নিয়েই সরগরম ছিল মিডিয়া। মাদক ও অ্যালকোহল বিশেষজ্ঞরা ম্যারাডোনার এই আসক্তিকে ‘স্লো মোশন সুইসাইড’ আখ্যা দিয়েছিলেন।

কিন্তু ম্যারাডোনা ঠিকই ফিরে এসেছিলেন। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তার মধ্যে যে উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল তাতে আর্জেন্টাইনরা ফের বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু একঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গড়েও কোনোমতে ২০১০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পার হয় তার দল। পরে কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে শেষ হয় অভিযান। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত, মেক্সিকোর ক্লাব ঘুরে এবং সর্বশেষ নিজ দেশের ক্লাব হিমনেশিয়া লা প্লাতায় থিতু হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এরপর থেকে ফের মদে আসক্তি তাকে শেষ করে দিল।

ম্যারাডোনার জীবন ছিল বিতর্কময়। ইতালিতে চিকিৎসা করাতে গেলে তার প্রিয় ট্রেডমার্ক হিরের কানের দুল নিয়ে যায় দেশটির ট্যাক্স বিভাগ। তার কাছে পাওনা ট্যাক্সের অর্থ পরিশোধের জন্য এমনটা করা হলেও চিকিৎসা নিতে আসা ম্যারাডোনা তাতে বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। ২০১০ সালে তার নিজের পোষা কুকুর তার ঠোট কামড়ে দিলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। হাঁটুর সমস্যার কারণে তার বিখ্যাত গতিও অনেক আগেই উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু এত বিতর্ক সত্ত্বেও তার প্রতি ভক্তদের ভালোবাসা এতটুকও কমেনি। চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত শুধুমাত্র তার উল্লেখ করেই বহু আর্জেন্টাইন বন্ধুত্ব করে ফেলেন।

ম্যারডোনার নামে চার্চ নির্মাণও বহু পুরনো ঘটনা। এসব চার্চে ১০টি বিধি পালন করা হয়। তার জার্সি নম্বরও ছিল ১০। এই ১০টি বিধির একটি হলো, নিজের নামের মাঝের অংশ ‘দিয়েগো’ রাখা এবং নিজের প্রথম সন্তানের নামও রাখতে হবে ‘দিয়েগো’।

কেন ম্যারাডোনার প্রতি আর্জেন্টাইনদের এত ভালোবাসা তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। চরম আর্থিক সংকটে পড়ার পাশাপাশি ১৯৮২ সালে ব্রিটিশদের কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধে হার মিলিয়ে একটা সময় আর্জেন্টিনার অবস্থা ছিল বেহাল। হতাশায় ডুবতে বসা নিজ দেশের জনগণের জন্য ম্যারাডোনা ছিলেন একপ্রকার প্রতিষেধক।

ম্যারাডোনাকে নিয়ে বুয়েনস এইরেস ইউনিভার্সিটি এবং ম্যারাডোনা বিশেষজ্ঞ পাবলো আলাবারকেস বলেছিলেন, ‘সমষ্টিগতভাবে ম্যারাডোনা আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমরা যা হতে পারতাম তিনি হলেন তার প্রতীক। ‘

বুয়েনস এইরেসের এটর্নি মার্সেলো পসে বলেন, ‘তাকে সবসময় ক্ষমা করা হবে। ‘বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম