মোদের গরব মোদের আশা! আ-মরি বাংলা ভাষা!!

10

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন: বাঙালী জাতির সবচেয়ে দূর্ভাগ্য হলো কষ্টে পাওয়া কিংবা কষ্ট ছাড়াই পাওয়া দূর্লভ জিনিসও হেলায় হারিয়ে ফেলা কিংবা হাতছাড়া করা। এ যাবত গর্বভরে অহংকার করার মত যত বিষয় বাঙালী হাতে পেয়েছে তার প্রতিটি হাতছাড়া করেছে। কিংবা করেছে বিতর্কিত অথবা মূল্যহীন। তালিকাটি বেশ লম্বা। কোনটা রেখে কোনটা বলবো! আমার শোনিমের দাবী, সব না হোক, অন্তত কয়েকটা বলতেই হবে। শোনিম ছোট মানুষ। দাবীও ছোট। কিন্তু উত্তর তো ছোট নয়; উত্তর অনেক বড়।

তখনও আমি বড় হইনি। বাচ্চা পোলাপাইন বলা চলে। সারাদেশ রাজ্জাক ফাটিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজ্জাক মানে নায়ক রাজ রাজ্জাক। তিনি বাংলার হৃদস্পন্দন। বিনোদন জগতের একচ্ছত্র অধিপতি। আবালবৃদ্ধবনিতা; সব বয়সীদের কাছে প্রবল জনপ্রিয়। যুবাকুলের ফ্যাশন আদর্শ, যুবতীদের স্বপ্নপুরুষ। রেডিও কিংবা সিনেমায় রাজ্জাক একটি নাম, একটি আগুন। তিনি যেখানেই, সেখানেই জ্বলজ্বল করেন। রাজ্জাক মানেই হিট ছবি, রাজ্জাক মানেই উপচেপড়া মানুষের ঢল।

এসবের পরেও মিডিয়ায়, মানে পেপার পত্রিকায় রাজ্জাক ততবড় কেউ নন। অন্তত ভারতের উত্তম কুমারের কাছে তো ননই। কিসের রাজ্জাক, কিসের কি? উত্তম হলেন নায়কের নায়ক, মহানায়ক। আরো কত কি। ছোট বলে তেমন বুঝতাম না। তবে বড়দের মুখে নানান তর্ক শুনতাম রাজ্জাক আর উত্তম কুমারকে নিয়ে। তারা গর্ব করতেন উত্তমকে নিয়ে, আর শান্তি পেতেন নিজের জিনিস রাজ্জাককে পেঁচিয়ে এবং পঁচিয়ে।

কাউকে পঁচাতে না পারলে আমাদের পেটের ভাত হজম হয় না। রুনা কিংবা সাবিনাও এর স্বীকার হয়েছেন। তারা দুজনাই বাংলার আকাশে ঝড় তুলেছেন সবে। এদুজনাকে ছাড়া রেডিও টিভি বিশেষ করে চলচ্চিত্র অচল। লোকমুখে তাদের দুজনার গান; দুজনার জয়জয়কার। চলচ্চিত্র বলতেই সাবিনা, রুনা। একের পর এক হিট গান দিয়ে যাচ্ছেন। যেমনি গানের কথা, তেমনি তার সুর। এ দুইয়ে একাকার হয়ে তাদের গলায় যেন সুরের ধারা বইতো। বড় সুমধুর সেই সব সুর। একজনের আহ্লাদি এবং পাখিডাকা মিষ্টি কন্ঠ, অন্যজনের কলিজায় চাপলাগা রোমান্টিক গলা।

বড়ই গর্র্ব করার মত। কিন্তু হায়! দেখতাম এখানেও কেচাল। আলোচনার জায়গায় সমালোচনাই বেশি। আরে ধুর! এইসব আবার গলা! গলা হইলো নুরজাহানের। আহারে নুরজাহান! সে কি ভরাট সুর! দরাজ গলা! কি যে সর্বনাশটা হইলো! পাকিস্তানও গেল, গেল নুরজাহানও। তয়, লতামুংগেশকর আর আশা ভোঁসলেও খারাপ না। ফাডাফাডি গলা। আইজকাইল কী পেনপেনানি হুনি হারাদিন সাবিনা গো গলায়। হেগো কাছে এরা আন্ডাবাচ্চা। কিছুই না।

কিছুই না শুনতে শুনতে সত্তরের দশক পার করলাম। আসলো আশির দশক। আশির দশক হলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে পাড়াপাড়ির দশক। কোনভাবেই হুমায়ুনকে বড় লেখক মানতে রাজী নয় আমাদের লেখক এবং সমালোচক মহল। প্রথমে সবাই একাট্টা, হুমায়ুনকে সাহিত্যিক হিসেবেই মানা যাবে না। তাদের কথা একটাই। লিখে জনপ্রিয়তা পাওয়া আর সাহিত্যিক হওয়া এক জিনিস না। হুমায়ুনের লেখায় রস আছে কিন্তু রসদ নেই। সাহিত্যের রসদ। সাহিত্যে রসদ দরকার।

এইসব পন্ডিতদের ভাষায়, যে সাহিত্য পড়লে পোলাপানেও বোঝে, সেটা আবার সাহিত্য হয় কেমনে!! সাহিত্য হবে লৌহের মত কঠিন। কঠিন কঠিন শব্দের বোধগম্যহীন ভাবার্থ। যতই পড়া হোক না কেন, এর অর্থ বোঝা যাবে না। বুঝবে কেবলই বোদ্ধাজন। অনেকটা আর্ট বা কলাশিল্পের মত। কাগজে কালি ঘষে ঘষে এমনই এক শিল্প দাঁড়াবে, যা শিল্পী নিজে ব্যাখ্যা না দিলে কারো বাপের সাধ্য নেই বোঝার।

কিছু কিছু জিনিস আছে যা বেশি বোঝা কিংবা বোঝার চেষ্টা করাটাও আবার ঠিক না। বোঝার বিষয়টা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেলে সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ভেঙে যায় সমাজ। সমাজ ভাঙা বিষয়টা জাতি ভাঙারই নামান্তর। গেল কিছুদিন আগেও ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙ্গালীর এক হবার একমাত্র উৎসব ছিল ১লা বৈশাখ। কৃষকের নবান্নের উৎসব। ব্যবসায়ীর হালখাতা। বাচ্চাদের পিঠাপুলির। এসবই এখন বিতর্কিত। নানামতের নানা কথা আছে বৈশাখ নিয়ে।

এদেশে বৈশাখ, রবিঠাকুর আর বাংলা ভাষাকে বিতর্কিত করার সুইচটা টিপে গেছেন কায়েদ এ আজম। বাংলাদেশের জন্যে একটাও ভাল কাজ এই লোকটা করতে না পারলেও সর্বনাশ যা করার সবটাই করে গেছেন। সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা মোটে কয়েকটি জাতির নিজস্ব বর্ষ আছে। ক্যালেন্ডার আছে। বাঙালী তার মধ্যে একটি গৌরবের জাতি। অথচ বাঙালীর এই গর্বকে খর্ব করার কাজটা বাংলা তথা পাকিস্তানের জাতির জনক হিসেবে করেছেন।

পাকিস্তানের জাতির জনক হয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার মূল অনুঘটকই ছিলেন আজম সাহেব। তারপরও আজও তাকে পাকিস্তানের জাতির জনক মানতে এদেশের একটি শ্রেণীর মন পিসপিস করে। সংখ্যায় তারা অগণিত। তারা এখনো কায়েদ এ আজমকে পাকিস্তানের জাতির জনক ভাবতে ভীষন পছন্দ করেন এবং শ্রদ্ধা ভরেই করেন। কিন্তু যত আপত্তি সব বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর প্রশ্ন আসলেই তারা জাতির জনক জিনিসটাকেই মানতে চান না। ইস্যুটিকে বিতর্কিত করার জন্যে ইব্রাহিম (আঃ) কে টেনে আনেন। একটা ধর্মীয় ফ্লেভার দেবার চেষ্টা করেন। বাঙ্গালী জাতি আর মুসলিম জাতিকে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে ফেলেন।

মজার ব্যাপার হলো, মুসলিম হয়েও পাকিস্তানের জাতির জনক হিসেবে কায়েদ এ আজমকে মানেন তারা। তখন মুসলিম জাতিরপিতা ইব্রাহিম (আঃ) এর কথা মাথায় থাকে না। আবার তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ককেও মানেন। কেবল মানতে পারেন না নিজ দেশের বঙ্গবন্ধুকে। অথচ বাঙ্গালী তথা বাংলাদেশের গর্র্ব করার মত তিনটি বিষয়ের একটি হলো বঙ্গবন্ধু। যার নামে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে চেনে। যিনি বাঙ্গালী জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। করেছেন গর্বিত। এনেছেন দেশের স্বাধীনতা।

এদেশের গর্ব করার মত দ্বিতীয় বিষয় হলো স্বাধীনতা। ওরা এই স্বাধীনতা কথাটিকেও বিতর্কিত করার অবিরাম চেষ্টা করেই চলেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়টিকে এখনও বলেন গন্ডগোলের বছর। বলার চেষ্টা করেন, “দরকার ছিল না এই স্বাধীনতার। আগেই ভাল ছিলাম।” এ নিয়ে ঠাট্টামশকরা কিংবা হালকা রসিকতা কম করেননি এদেশে। প্যারোডিও করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের গান নিয়ে প্যারোডি হতো। প্রচন্ড জনপ্রিয় ছালাম ছালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে গানটির প্যারোডি করে গাইতো, “ছিলাম ছিলাম ভালই ছিলাম পাকিস্তানের আমলে।”

তখন জিয়াউর রহমানের আমল। অনেকের সাহস ছিল। এখন এসব করার সাহস কারোর নেই। তবে কৌশল আছে। কৌশলে বাংলার সর্বোচ্চ এই অর্জনকে বিসর্জনের ধান্ধা করে। লক্ষ্য একটাই; স্বাধীনতাকে বিতর্কিত করা। শহীদের রক্তে স্বাধীনতা এসেছে; এটা তারা মানে। কিন্তু কোনভাবেই সেই সংখ্যা ৩০ লাখ হিসেবে মানতে রাজী নয়। তারা বিশ্বাসই করতে পারে না সারা বাংলায় নয় মাসে ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। তবে তারা এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এবং করাতে চেষ্টা করে, শাপলা চত্বরে একরাতে হেফাজতের লাখলাখ শহীদ হয়েছেন।

এ নিয়ে তাদের মনে বড় জ্বালা। জায়গা পেলেই পুট্টুত করে জ্বালা প্রকাশে দেরী করেন না। এসবে দুঃখেরও অন্ত নেই তাদের। বিলাপেরও শেষ নেই। বিলাপ করেন বাংলা ভাষায়। করবেনই তো। কারণ বাংলা মাতৃভাষা। বাঙ্গালীর বুক উঁচিয়ে গর্র্ব করার মত ভাষা। অথচ এই মাতৃভাষা নিয়েও তাদের গর্ব তো দূরের কথা; তৃপ্তিও নেই। আছে দুঃখ। তুচ্ছতাচ্ছিল্যে ভরা মনোকষ্ট। কষ্টটা প্রকাশ করতে পারেন না বটে, তবে কৌশলে ক্ষতি করার চেষ্টা করেন।

বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছে একদেশে সমন্বয়হীন তিন ধরণের শিক্ষা পদ্ধতি। বাংলা মিডিয়ামের সাধারণ স্কুল, ইংরেজী স্কুল এবং মাদ্রাসা। পারস্পরিক সমন্ময়হীন তিনটি মিডিয়াম। তিন মিডিয়ামের এই শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে করুণ অবস্থা হয়েছে বাংলার। সাধারণ স্কুলে বাংলায় চমৎকারভাবে সবকিছু হলেও ইংরেজী মিডিয়াম এবং মাদ্রাসায় বাংলার অবস্থা বড়ই বেতাল। এই দুই মিডিয়ামে শিক্ষার্থীগণ ভাল ভাল অনেক কিছুই শেখে। কেবল ভাল করে শিখতে পারে না মাতৃভাষা বাংলাকে।

এ জন্যেই বাংলা এখন আর বাংলায় নেই। জগাখিচুরীমার্কা ভাষা হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত উচ্চারণে এখন বাংলাভাষা চর্চা হচ্ছে। একপক্ষ বাংলার মাঝে খুব কৌশলে ইংলিশ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। একপক্ষ উর্দু। আর নিরপেক্ষতার দাবীদারগণ দিচ্ছেন আরবী ঢুকিয়ে। বাংলা ল্যাংগুয়েজ হলো ওপেন সোর্স। যার যা মনে চায়, বাংলাকে নিয়ে তাই করছেন। মানে খেলা করছেন।

এভাবে তারা খেলতে পারেন না। কেননা শহীদদের রক্তে অর্জিত এই ভাষা আমার গর্ব, আমার অহংকার। ভাষার মাসে একুশকে সামনে রেখে আমাদের একটু হলেও এসব নিয়ে আত্মবিশ্লেষনের প্রয়োজন আছে। এটা সময়ের দাবী। একুশের দাবী। কেননা একুশই আমাদের গাইতে শিখিয়েছে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী! আমি কি ভুলিতে পারি!!!