মেননকে হত্যা প্রচেষ্টার ৩০ বছর পূর্ণ হলেও আততায়ীরা অধরাই রয়ে গেলো!

সৈয়দ আমিরুজ্জামান :

“মেননের বুলেট বিদ্ধ বুক …
গুমরে উঠেছে হাহাকারে অার্ত বাংলাদেশ,
মেননের বুলেট বিদ্ধ বুক …
নূয়ে পড়ছে লজ্জায় অামার পতাকা,
মেননের বুলেট বিদ্ধ বুক …
রক্তে আবার ভিজে গেল অামার স্বাধীনতা,
আমি মেননের গুলিবিদ্ধ ঝাঁঝরা
বুকের মতো সাধারণ একজন।
আমি মেননের সুতীর দীনের মতো সাদা পাঞ্জাবীর
নি:শঙ্ক মুক্তির শেষ হাতছানি।
আমি মেননের গুলিবিদ্ধ বুকের জখম থেকে
জন্ম নেই বারবার নতুন মেনন।”

১৭ আগস্ট ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেননকে হত্যা প্রচেষ্টার ৩০ পূর্ণ হলেও আততায়ীরা অধরাই রয়ে গেছে। অথচ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে অাসার জন্য এবং সামাজিক ন্যায্যতা-সমতা প্রতিষ্ঠাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনগণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রয়োজনেই এর একটা ফয়সালা হওয়া জরুরী।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এ দিনটিকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী দিবস’ পালন হিসেবে পালন করে আসছে।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় ও মৌলভীবাজারসহ সারাদেশে জেলা-উপজেলা শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপি’র শাসনামলে ১৯৯২-এর ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় পার্টি অফিসের সামনে কমরেড রাশেদ খান মেননকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। মৃতবৎ কমরেড মেননকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর সিএমএইচ-এ লিভারে অপারেশন করা হয় এবং অবস্থার উন্নতি না হলে তাকে লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে পুনরায় অপারেশন করা হয়। পাঁচমাস লন্ডন ও ব্যাংককে চিকিৎসা নেবার পর ১৯৯৩ এর ১০ জানুয়ারী বিমান বন্দরে বিপুল সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে এই ৩০ বছরেও তার ঐ হত্যাপ্রচেষ্টার বিচার হয়নি। আততায়ীরা অধরাই রয়ে গেছে। অন্যদিকে একই সময়কালে চুয়াডাঙার কুলবিলা গুচ্ছগ্রাম, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা হয় যার বিচার আজও হয়নি।
রাশেদ খান মেননের হত্যা প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐ সময়ে দেশব্যাপী যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তার জন্য পার্টি ও তিনি নিজে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু দেশে সন্ত্রাস নির্মুল হয় নাই পক্ষান্তরে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চলছে।জননিরাপত্তার স্বার্থেই এটা বন্ধ হওয়া দরকার।”
পার্টির তরফ থেকে এই হত্যা চেষ্টার পিছনে সেই সময় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ একটি দায়সারা তদন্ত করে কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করে। পরে পার্টির তরফ থেকে পুনঃতদন্তের দাবির প্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তের পদক্ষেপ নেয়া হলেও কোন কাজ হয়নি। পুলিশের দায়েরকৃত ঐ মামলা সম্প্রতি বিচারের জন্য উঠলেও তার পরিণতি নেয়ার কোন সম্ভাবনা নাই।
রাশেদ খান মেননের হত্যা চেষ্টায় সারাদেশে সৃষ্ট তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভের মুখে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিএনপি সরকার রাশেদ খান মেননের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ার কথা প্রচার করলেও পরিবার ও পার্টি সহকর্মীদের উদ্যোগেই তার চিকিৎসা হয় এবং এ কারণে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে তাকে তার বাড়ি বিক্রি করতে হয়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রকাশ্যে গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার অপচেষ্টা, পরের বছর, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডেও ১৫ আগস্টের আদর্শিক কুশীলবরা জড়িত।
আবার ১৫ ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলির সম্পৃক্ততার বিষয়টি দলিল-দস্তাবেজসহ প্রমাণ করার জন্য তদন্ত কমিশন গঠন করা জরুরী। গোয়েন্দা অনুসন্ধান এবং একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমেও বিষয়টি বেরিয়ে আসতে পারে। ঘটনা দুটির পরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে অবস্থাগত ও ধারণাগতভাবে এটি আন্দাজ করা যায় যে, দুটি ঘটনায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা একই সমান্তরালে অবস্থান করছিল। একই কুশিলবরা ১৯৯২ সালের ১৭ অাগস্ট বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেননকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়েছিল। এ হত্যাচেষ্টার অামরা বিচারে চাই। এখনো দেশি বিদেশি চক্রান্ত চলছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্জিত বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শন ও ধারাকে নস্যাৎ করার জন্য। জন্যগণের সামগ্রিক প্রয়োজনেই এ ধারা রক্ষায় পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।”
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের এই দিনে সন্ধ্যায় পার্টি কার্যালয়ের সামনে রাশেদ খান মেননকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলী করা হয়েছিল। দেশে- বিদেশে চিকিৎসা ও দেশবাসীর ভালবাসা আর দোয়ায় তিনি জীবন ফিরে পান এবং এখনও মানুষের পাশে থেকে রাজনীতি করছেন।
১৯৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা রাশেদ খান মেনন তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। জনগণের মেনন ফিরে আসেন জনগণের মাঝে। বিমান থেকে নেমে সরাসরি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিশাল গণসংবর্ধনায় যোগ দেন এবং মেহনতি মানুষের অতলস্পর্শী ভালোবাসায় সংবর্ধিত হোন। রাশেদ খান মেনন বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনীতি গ্রামবাংলার কোটি কোটি গরিব খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের মুক্তির রাজনীতি – শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ার রাজনীতি।
শোষণ বঞ্চনা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার, জনগণের সামগ্রিক মুক্তির জন্য নিবেদিত প্রাণ রাজনীতির এক বাতিঘর কমরেড রাশেদ খান মেনন। তাঁর পিতা বিচারপতি আব্দুল জব্বার খানের কর্মস্থল ফরিদপুরে ১৯৪৩ সনের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃভূমি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ থানার বাহেরচর-ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামে।
ষাটের দশকের তুখোর ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন বাষট্টির আয়ুববিরোধী সামরিক শাসন ও শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে আসেন। তারপর নিরন্তর দুর্গম কণ্টকাকীর্ণ পথ চলা। যে পথ চলায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি কোনো শক্তি। মেনন মৃত্যুকে কখনো ভয় করেননি আজও করেন না। ১৯৬৩-৬৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহ-সভাপতি (ভিপি) ও ‘৬৪-৬৭ সালে পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। বাষট্টি সালে নিরাপত্তা আইনে প্রথম কারাবন্দী হওয়ার পর ‘৬৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন মেয়াদে নিরাপত্তা আইন, দেশরক্ষা আইন ও বিভিন্ন মামলায় কারাবরণ করেন। ‘৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে ছাত্র সমাজের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুখ্যাত মোনেম খানের আগমনকে বিরোধীতা করতে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন ও পরে সুপ্রীম কোর্টের রায়ে ঐ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলে জেল থেকে এম.এ পরীক্ষা দেন। ‘৬৭-৬৯ জেলে থাকাকালীন অবস্থায় তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি ক্যান্টনমেন্টে নীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দেশের বাইরে তার যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে কাজ করেন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সমিতিতে যোগ দেন ও সন্তোষে ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলনের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০-এর বাইশে ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের দাবি করায় এহিয়ার সামরিক সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ও তার অনুপস্থিতিতে সামরিক আদালতে সাত বছর সশ্রম কারাবাস ও সম্পত্তির ষাট ভাগ বাজেয়াপ্তর দণ্ডাদেশ প্রদান করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আত্মগোপনে যান ও স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণের কাজ শুরু করেন।
পচিশে মার্চ পল্টনের শেষ জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পচিশে মার্চের কালরাতের গণহত্যার পর তিনি আর এক মুহূর্ত দেরী না করে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজ শুরু করেন এবং পরে ভারতে গিয়ে সকল বামপন্থী সংগঠনকে নিয়ে ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয় কমিটি’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে প্রবাসী সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরে এবং দেশের অভ্যন্তরে কেন্দ্র স্থাপন করে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
১৯৭৪-এ ভাসানী ন্যাপ থেকে বেরিয়ে এসে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ইউপিপি) গঠিত হলে তার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৮-এ ইউপিপি সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগ দিলে রাশেদ খান মেনন ইউপিপি ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গঠন করেন এবং ১৯৭৯ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৮২ জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে রাশেদ খান মেনন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ঐ সামরিক শাসনবিরোধী প্রথম বিবৃতিটি যা পরবর্তীকালে পনের দল গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে তার রচয়িতাও ছিলেন তিনি। ‘৮৩-এর মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের কারণে তাকে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে চোখ বেঁধে সামরিক ছাউনির নির্জন সেলে আটক রাখা হয়।
পাঁচদল নেতা হিসেবে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ঐক্য পুনঃস্থাপনে রাশেদ খান মেনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পাঁচদল, সাত দল ও আট দলের ঐতিহাসিক তিন জোটে’র ঘোষণার ভিত্তিতে ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাহীর পতন হয়। ১৯৯১-এর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাশেদ খান মেনন পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য সংসদের ‘বিশেষ কমিটি’ তে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সংসদে তিনি জামাত-শিবিরের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক তৎপরতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সশস্ত্র আক্রমণ, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী তৎপরতা, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর কাছে সরকারের নতজানু নীতি, কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে পাটকলের কাঠামোগত সংস্কারের নামে পাট শিল্পের ধ্বংস সাধন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে লুটপাটের অর্থনীতিক নীতি অনুসরণের এবং দৃঢ় বিরোধীতা, কৃষক, খেতমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের স্বপক্ষে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করেন। সংসদের বাইরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন সংগঠিত করতেও তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
এই সব মিলিয়ে রাশেদ খান মেনন সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণের টার্গেটে পরিণত হন এবং তার বিরুদ্ধে জামাত-শিবিরসহ ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর পক্ষ থেকে আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২-এর ১৭ আগস্ট নিজ পার্টি কার্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ করে তাকে হত্যার চেষ্টা হয়। প্রথমে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও পরে লন্ডনে কিংস কলেজে দু’বার অস্ত্রোপচার হলে তিনি জীবনে বেঁচে যান।
রাশেদ খান মেনন গুলিবিদ্ধ হলে সারা দেশে যে অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্য দিয়ে তার প্রতি দেশবাসীর ভালবাসার বিশেষ প্রকাশ ঘটে। দেশবাসীর দেয়া রক্ত, দোয়া, আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছার বরকতে তিনি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। এই সময় তিনি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জাতীয় সংগ্রামেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৮ সালে বিকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগার দল গঠন করে বিভিন্ন জাতীয় ও অর্থনৈতিক, শ্রমজীবী মানুষের ইস্যুতে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর মধ্যে তেল-গ্যাস-বন্দর জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য জাতীয় কমিটি গঠন, গ্যাস বিদেশে রপ্তানি ও চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধে ঐ জাতীয় কমিটির উদ্যোগে দেশব্যাপী লং মার্চ সংগঠিত করে গ্যাস রপ্তানি প্রতিরোধ করেন।
২০০১ সালে বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু করলে তিনি তার বিরুদ্ধে অন্যান্যদের নিয়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। জোট সরকারের প্রশ্রয়ে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে তার বিরুদ্ধেও প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে ওয়ার্কার্স পার্টি। বিএনপি-জামাত জোটের দু:শাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে প্রথমে এগার দল ও পরে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপসহ চৌদ্দ দলের আন্দোলন গড়ে তোলেন। চৌদ্দ দলের ৩১ দফা নির্বাচনী সংস্কার ও ২৩ দফা ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়নে তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই জননেত্রী শেখ হাসিনা ঐ নির্বাচনী সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরলে তা জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নির্বাচনে তিনি ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই সংসদের তিনি কার্যউপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিরও তিনি সদস্য।
তিনি এ বছর গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়ার বিদেশীদের দেয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদকে ভূষিত হয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার সুপ্রীম পিপলস এসেম্বলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁকে এই পদকে ভূষিত করেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সুং-এর জন্মশতবর্ষ পালনের জন্য অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উৎসবের শেষ দিনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার সুপ্রীম পিপলস এসেম্বলীর ভাইস-প্রেসিডেন্ট উ সুংহুক তাকে এই পদক গলায় ঝুলিয়ে দেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও গবেষণার কাজ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা, বিশেষ করে জাতীয় দৈনিকসমূহে তার নিয়মিত কলাম লেখায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তার ঐ কলামসমূহ একত্রিত করে এ পর্যন্ত পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে কমরেড রাশেদ খান মেননের আত্মজীবনীর প্রথম পর্ব ‘এক জীবন : স্বাধীনতার সূর্যোদয়’।
ব্যক্তি জীবনে রাশেদ খান মেনন ১৯৬৯-এর মে মাসে তার ছাত্র আন্দোলনের সহকর্মী লুৎফুন্নেছা খান বিউটিকে বিয়ে করেন। লুৎফুন্নেছা খান বিউটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং এর সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর হিসেবে অবসর নিয়েছেন। কন্যা ড. সুবর্ণা খান ক্যান্সার সেলের ওপর পিএইচডি করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত। পুত্র আনিক রাশেদ খান আইনের ছাত্র।
রাশেদ খান মেনন রাজনৈতিক বিভিন্ন সভা, সম্মেলন ও সেমিনার উপলক্ষ্যে ভারত, নেপাল, গণচীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপের জার্মানী, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, ফ্রান্স, বুলগেরিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন।
রাশেদ খান মেনন ৬০-এর দশকের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ. ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা রাখার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশন ৮ অক্টোবর ২০০৮ সনের রাজধানীর মগবাজার চৌরাস্তা হতে বাংলামটর রোড পর্যন্ত এই সড়কের নাম রেখেছে “রাশেদ খান মেনন সড়ক”।
২০১২ সনের ১৩ সেপ্টেম্বর মহাজোট সরকারের পক্ষ থেকে রাশেদ খান মেননকে মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব দেয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে অবশ্য দেশের কী পরিস্থিতিতে সরকারে যোগ দিয়েছিলেন, তা সকলেই অবগত। দেশের সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেয়ার বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচনকালীন সরকারে ২০১৩ সালে তাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে পুনরায় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানেও তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
রাশেদ খান মেনন রাজনীতিক হিসেবে সর্বজনপরিচিত। সম্প্রতি লেখালেখির জন্যও তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন। ছাত্রআন্দোলনের প্রচারপত্র, বিবৃতি আর বিভিন্ন সংকলন প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই লেখার শুরু। রাজনীতির প্রয়োজনেই বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন তিনি। এখন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিকগুলোতে নিয়মিত লিখে চলেছেন।
জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ২১ দফার ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায্যতা-সমতা প্রতিষ্ঠাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনগণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও জনগণের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন এই অবিসংবাদিত নেতা। হত্যা প্রচেষ্টার ৩০তম বার্ষিকীতে মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেনন তোমার প্রতি অভিবাদন এবং রেড স্যালুট।

-লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।