মৃত্যুকূপে ঢাকার জীবন

শাখাওয়াত হোসাইনঃ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ এবং ২০০৮ অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জরুরি সিঁড়ি ও অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি দৃশ্যমান রাখা আবশ্যক। বনানীর এফআর টাওয়ার ১৯৯৬ সালের ইমারত নির্মাণ বিধি অনুযায়ী অনুমোদন নেওয়া হলেও জরুরি সিঁড়ি ও অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।

২০০৮ সালের ৩১ আগস্ট ভবনটিতে আগুন লাগার পরও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কারোর। আগুন বা অন্য কোনো দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তি ব্যবহারে ভবন মালিককে বাধ্য করতে পদক্ষেপ নিতে পারেনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ফায়ার সার্ভিস এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
গত বৃহস্পতিবার বনানীর এফআর টাওয়ারে ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু রাজধানীর ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দুই কোটি মানুষ রয়েছে ঝুঁকিতে। ঢাকার বেশির ভাগ ভবনে নেই অগ্নিনির্বাপণের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। রাজধানীবাসীকে অগ্নিনির্বাপণ ও দুর্যোগ মোকাবেলায় দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিরও রয়েছে অপ্রতুলতা।

রাজউকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ভবন আছে ২২ লাখের মতো। এসব ভবনের মধ্যে ৮৪ শতাংশ একতলা। বাকি তিন লাখ ৫২ হাজার একতলার বেশি।

১০ তলার বেশি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণের যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে—এই মর্মে ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায়। ভবনের দুই পাশে কমপক্ষে ছয় ফুট ফাঁকা জায়গা রাখারও আবশ্যকতা রয়েছে সর্বশেষ ইমারত নির্মাণ বিধিমালায়। কিন্তু যেসব ভবনের অনুমোদন ২০০৮ সালের আগে নেওয়া হয়েছে সেগুলোকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করতে কোনো ধরনের কর্মসূচি নেই রাজউকের। আবার ১০ তলার কম উঁচু ভবনের অনুমোদন নিয়ে আইন লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণকারীদের আইনের আওতায় আনার নজিরও নেই সংস্থাটির। এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না তা মনিটর করা হয় না ফায়ার সার্ভিস বা রাজউকের পক্ষ থেকে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, রাজধানীর ৮০-৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেই। বাহিনীটি জরিপ চালিয়ে অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ এই তিন ক্যাটাগরিতে ঢাকার ভবনগুলোকে বিভক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘রাজধানীর ১০-২০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে একটি দল কাজ করছে। যারা কমপ্ল্যায়েন্স ঠিক করতে ব্যর্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, ‘পুরাতন ইমারত নির্মাণ বিধি অনুযায়ী অনুমোদন দেওয়া ভবনে আগুন নির্বাপণের ঘাটতি রয়েছে। তবে নতুন আইন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়া ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় না। যেসব ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

জানা যায়, ঢাকার কোনো কোনো ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণের নামমাত্র যন্ত্রপাতি থাকলেও তা ব্যবহার করতে জানে না ওই সব ভবনের বাসিন্দারা। এফআর টাওয়ারের বেশ কয়েকটি ফ্লোরে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকলেও তা ব্যবহার করতে পারেনি ভবনটিতে আটকে পড়া মানুষজন। অগ্নিনির্বাপণ বা দুর্যোগকালীন করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রশিক্ষণের অভাবে যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে অজ্ঞ বেশির ভাগ নগরবাসী। তাদের সচেতন করতে রাজউক বা সিটি করপোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে কোনো প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে না।

এফআর টাওয়ারের ১৪ তলায় আটকে পড়া ডার্ড গ্রুপের কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এফআর টাওয়ারে দুটি অগ্নিকাণ্ডের তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়েছি আমি। ভবনের কয়েকটি ফ্লোরে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকলেও ব্যবহার করতে পারেনি কেউ। কারণ এসংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ কারো ছিল না। ’

জানা যায়, রাজধানীতে বিভিন্ন দাতা সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। এসবের মধ্যে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), সিডস এশিয়া ও জার্মান রেড ক্রিসেন্টের সহযোগিতায় দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ডিএনসিসি এলাকায় গত দুই বছরে বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির ৪৫০ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবককে অগ্নিনির্বাপণের প্রশিক্ষণ দিয়েছে সিডস এশিয়া। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় তাদের কোনো কর্মসূচি নেই।

সিডস এশিয়া বাংলাদেশের প্রধান মিহারু সাতো বলেন, ‘আমরা জাইকার অর্থায়নে একটি প্রকল্পের আওতায় শুধু ডিএনসিসির কমিউনিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। ডিএসসিসি এলাকায় আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই। ’

জানা যায়, ডিএসসিসি এলাকায় জার্মান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া কোনো সংস্থা আগ্রহ দেখালে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে। প্রতিবছর গার্মেন্ট এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দেড় লাখের মতো ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয় বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। তবে রাজউকের পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপণ বা দুর্যোগ মোকাবেলায় কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে আগুনের ঝুঁকিতে আছে ঢাকার দুই কোটির বেশির মানুষ।-কালেরকন্ঠ