মির্জা ফখরুলের আসন শূন্য ঘোষণা

বিনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্ধারিত সময়ে শপথ না নেয়ায় বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে জাতীয় সংসদের বৈঠকে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেছেন।

তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ নেয়ার কথা। কিন্তু তিনি অসমর্থ (শপথ না নেওয়ায়) হওয়ায় তার আসনটি শূন্য হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল।

এদিকে সকালে এক আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল দাবি করেন, দল সিদ্ধান্ত বদলেছে বলেই নির্বাচিত চারজন এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর দলীয় সিদ্ধান্তেই আমি শপথ নেয়া থেকে বিরত থেকেছি। এটা দলের ‘কৌশলেরই’ অংশ। আমি শপথ নেয়ার জন্য কোনো চিঠি দিইনি, কোনো সময় চাইনি।

এদিকে ফখরুলের আসন শূন্য ঘোষণা করে স্পিকার বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৯ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ীদের শপথ নেয়ার সুযোগ ছিল। অথবা এই সময়ের মধ্যে শপথ নিতে সময় চেয়ে চিঠি দেয়ার সুযোগ ছিল বিজয়ীদের জন্য।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথও নেননি, শপথের জন্য সময় চেয়ে চিঠিও দেননি। তাই সংবিধান অনুযায়ী তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হল।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির মোট ছয়জন প্রার্থী জয়ী হন। এদের মধ্যে পাঁচজনই শপথ নিয়েছেন। ফখরুলকে ছাড়াই বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করবেন তারা।

সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে, যদি (ক) তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন : তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন।’

সংবিধানের এই বিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ৩০ জানুয়ারি। এই হিসাবে সোমবার ৯০ দিন পূর্ণ হয়। শেষ দিনে এসে বিএনপির চারজন শপথ নেন।

কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে শপথ নেননি। এ অবস্থায় স্পিকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসন শূন্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন। মঙ্গলবার রাতেই সংসদে তিনি বিষয়টি অধিবেশনে সদস্যদের অবহিত করেন।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির ছয়জনসহ দলটির নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন আরও দু’জন। নির্বাচনের পরপরই ভোটে ব্যাপক অনিয়ম এবং কারচুপির অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

পুনর্নির্বাচনের দাবি জানানোর পাশাপাশি তারা শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গণফোরামের দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মেদ গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন।

তাকে অনুসরণ করে গণফোরামের প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত দলটির আরেক নেতা মোকাব্বির খান গত ২ এপ্রিল শপথ নেন। গত ২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার শপথ নেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির মো. জাহিদুর রহমান।

শপথ গ্রহণের সময়সীমার শেষ দিনে (সোমবার) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বিএনপির বাকি চারজনও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

শপথ নেয়া এই চারজন হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম এবং বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন।

দলীয় সিদ্ধান্তেই শপথ নেইনি -মির্জা ফখরুল : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দল সিদ্ধান্ত বদলেছে বলেই নির্বাচিত চারজন এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর দলীয় সিদ্ধান্তেই আমি শপথ নেয়া থেকে বিরত থেকেছি। এটা দলের ‘কৌশলেরই’ অংশ।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন ‘আওয়াজ’-এর এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, কয়েকটি চ্যানেল এবং কিছু কিছু পত্রিকায় বলা হচ্ছে, আমি শপথ নেয়ার জন্য সময় চেয়েছি, আবেদন করেছি। এটা একেবারে ডাহা মিথ্যা। আমি কোনো চিঠি দিইনি, কোনো সময় চাইনি। এখন আপনারা (গণমাধ্যম) আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমার দল সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, তাহলে আমি শপথ নিলাম না কেন? এটাও আমার দলের সিদ্ধান্ত। এটা আমাদের কৌশল, সেই কৌশলে আমি শপথ নিইনি। আমি শপথের জন্য কোনো চিঠি দেইনি।

শপথের বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত বদলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমানে বিশ্বে রাজনীতির যে ধারা চলছে, তাতে সব সিদ্ধান্ত একেবারে চূড়ান্ত হয়ে থাকবে, স্থবির হয়ে থাকবে- এটা সবসময় ‘সঠিক নয়’ বলেই তারা বিশ্বাস করেন।

ন্যূনতম যে সুযোগটুকু আছে সংসদে কথা বলার, সেই সুযোগটিকে কাজে লাগানোর জন্য আমরা সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা নিয়ে অনেকে অনেক রকম কথা বলছেন। তবে আমরা বিশ্বাস করি, এ সিদ্ধান্তটা খুব খারাপ নয়। আমাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় যুক্তি যেটা- এই সামান্যতম যে স্পেসটা রয়েছে, সেই স্পেসটাকে ব্যবহার করা।

ফখরুল ইসলাম বলেন, গতকাল (সোমবার) থেকে রাজনীতি খুব গরম হয়ে উঠেছে। কারণ বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। বলা যেতে পারে এটি নিঃসন্দেহে একটা চমক, ইউ টার্ন।

আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল ৩০ তারিখের যে নির্বাচন হয়েছে, সেটা কোনো নির্বাচন হয়নি। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে যে নির্বাচনের ভোট ২৯ তারিখের রাতে চুরি হয়ে গেছে, জনগণের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে নির্বাচন হয়েছে, তখন জনগণের যে ক্ষোভ ছিল, সেই ক্ষোভের ধারাবাহিকতায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শপথ গ্রহণ করব না। কিন্তু একটি কথা আমরা বিশ্বাস করি, কোনো সিদ্ধান্তই যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকবে, এটা সবসময় সঠিক নয়।

যারা এখন বিএনপির সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন তাদের উদ্দেশে ফখরুল বলেন, অনেকে অনেক কথা বলতে পারেন। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, কোনো কিছু স্ট্যাটিক বা স্থির নয়, পরিবর্তন হয়। সময়ের প্রয়োজনে সেই সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন হয়।

এই সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা, সময়েই তা প্রমাণ হবে- এমন মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা বিশ্বাস করি এই সিদ্ধান্তটা সঠিক সিদ্ধান্ত। এখন অনেকে বলতে পারেন তাহলে আগে কেন গেলেন না? আগে করিনি বলে এখন যে করব না তার তো কোনো মানে নেই। আগে আমরা নিইনি বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে, এখন আমরা নিচ্ছি বাস্তবতার প্রেক্ষিতে।

সিদ্ধান্তের পেছনে সমঝোতা নেই উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি সমঝোতা করলে অনেক আগেই সমঝোতা করতে পারত। খালেদা জিয়া যদি সমঝোতা করতেন তাহলে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না। এ কথাগুলো আপনাদের মনে রাখতে হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কখনোই নীতির প্রশ্নে ‘আপস করেননি’ দাবি করে ফখরুল বলেন, আমরা সেই দল, যারা খালেদা জিয়ার সেই নীতিকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চলেছি।

সমালোচকদের উদ্দেশে ফখরুল বলেন, আমরা বাস্তবতা সামনে রেখে চলছি, আমরা অন্ধের মতো চলছি না। আমরা দেখছি যে, বাস্তবতাগুলো কি। দেখেশুনে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ৪-৫ জন আছেন তারা সংসদে গিয়ে কথা বলবেন। তার প্রমাণ আপনারা দেখেছেন গতকালই (সোমবার), হারুন সাহেব (হারুনুর রশীদ) সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে সব কিছু স্পষ্ট হয়ে এসেছে।

সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নয়, বরং সংসদের ভেতরে-বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন গড়ে তুলতেই বিএনপি সংসদে গেছে বলে দাবি করেন দলের মহাসচিব।

বিএনপি মহাসচিবকে উদ্দেশ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যদি সমঝোতা হয় তাহলে সেই সমঝোতাটা খোলাখুলি বলেন, কী সমঝোতা হয়েছে?

আমি সবার কাছে বলতে চাই, আমাদের লড়াই ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। আপসকামিতায়-সহযোগিতা-সহমর্মিতায়-সমঝোতায় আপনি জিততে পারবেন না। সমঝোতা হয়ে থাকলে বিএনপি তার ভাগেরটা এখনও বুঝে পায়নি বলেও মনে করছেন তিনি।

বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগেই তো আপনারা কাজ সেরে ফেলেছেন। খেলতে বসে দাবার চাল দিয়ে দিয়েছেন, এবার ওই পক্ষ চাল দেবে। আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।

‘উন্নয়নের মৃত্যুকূপে জনজীবন ও নুসরাত একটি প্রতিবেদন’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়াজের সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। বিলকিস জাহান শিরিনের পরিচালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, আওয়াজের প্রধান সমন্বয়নকারী অধ্যাপিকা শাহিদা রফিক, সৈয়দা ফাতেমা সালাম, ফরিদা ইয়াসমীন, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, রফিকা আফরোজ, রাশেদা ওয়াহিদ মুক্তা, সায়মা বেগম, সাদিয়া হক প্রমুখ।-যুগান্তর