মিঠুন চাকমার স্ত্রী-সন্তানের ছবিটি দেখে চোখে পানি এসেছে

53

ফজলুল বারীঃ মিঠুন চাকমা আমার ফেসবুক বন্ধু ছিল। কখনো সামনাসামনি দেখা হয়েছে কিনা মনে নেই। ফেসবুক খুঁজে দেখি ২০১১ সালে মিঠুন আমার সংগে প্রথম যোগাযোগ করে। লামায় তখন একটি ঘটনা ঘটেছে। লামার কিছু সাংবাদিকের নাম্বার চেয়ে মিঠুন আমার সংগে যোগাযোগ করে। আমি বান্দরবানের সিনিয়র সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মনু ভাইর সংগে যোগাযোগ করতে বলি। মিঠুন জানায় মনু ভাইর নাম সে শুনেছে। কখনো দেখা বা যোগাযোগ হয়নি। এরপর আমি তাকে বিপ্লব রহমানের নাম্বার দেই। মিঠুন জানায় বিপ্লবের তার কাছে আছে। এরপর আর অনেকদিন যোগাযোগ হয়নি।
২০১৭ সালে আবার যোগাযোগ করে মিঠুন। রামগড়ের একটা ঘটনা জানায়। মিঠুন আমাকে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক কিছু লেখা ঝুঁকিপূর্ন। আমি তাকে বলি যা ঝুঁকিপূর্ন মনে করবে তা আমাকে লিখে দিও। আমি আরও খোঁজ নিয়ে তা লিখবো। রামগড়ের ঘটনা সে আমাকে লিখেও দিয়েছিল। মিঠুন যে ইউপিডিএফ’এর সংগে যুক্ত ছিল তা আমাকে কখনো বলেনি। আমি কখনো জিজ্ঞেসও করিনি। আমার কাছে আর দশজনের মতো সে একজন আদিবাসী পাহাড়ি সংগ্রামীই ছিল। জন্মভূমিতে যারা স্বাধীনতাবিহীন বনচিত এক জনগোষ্ঠি।
আমার সেই মিঠুনটা খুন হয়ে গেলো । মিঠুনের ঘটনা আমি আমার এক পাহাড়ি বন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। আমার এই বন্ধু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সংগে জড়িত। সে বললো ইউপিডিএফ’এর নতুন যে গ্রুপ গড়ে উঠেছে তাদের হাতে খুন হয়েছেন মিঠুন। ইউপিডিএফ যারা গড়েছিলেন তাদের আমরা চিনতাম জানতাম। শান্তি চুক্তি আলোচনার অনেক আগে থেকে এই ছেলেমেয়েরাই আমাদের বিজু উৎসবে পাহাড়ে যেতো । সন্তু লারমারা তখন আমাদের কাছে অচেনা অদেখা অনেক দূরের মানুষ। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেনস ফোরাম এসব সংগঠনের ব্যানারে এরাই তখন আমাদের আদিবাসী পাহাড়িদের আনন্দ বেদনা স্বপ্ন প্রত্যাশার ইতিবৃত্ত শুনিয়েছেন। আবার খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তি বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে একটি প্রতিবাদের মাধ্যমে ইউপিডিএফ এর আত্মপ্রকাশ সেখানেও আমি ছিলাম।
সন্তু লারমারা তখন বলেছিলেন এরা পাহাড়ে শান্তি চুক্তি বিরোধী সেনাবাহিনীর সৃষ্টি। মি: লারমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম একটা গণতান্ত্রিক সমাজে পাহাড়ে কী পাহাড়িদের একাধিক সংগঠন থাকতে পারেনা? তিনি এরসংগে একমত হননি। তখন বুঝতে পারি সন্তু লারমাও কতোটা গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন! এরমাঝে সন্তু লারমাদের জনসংহতি সমিতিও ভেংগেছে। ইউপিডিএফও ভেংগেছে। সোজা হিসাবে আমরা দেখছি এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে মারছে! কেউ নেপথ্যে থেকে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলছে কিনা তা কেউ দেখছেনা ভাবছেনা। পাহাড়ে পাহাড়িদের মধ্যে এমন অনৈক্য হানাহানি চললে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলনেওয়ালাদেরইতো লাভ।
মিঠুন চাকমার স্ত্রী-সন্তানের ছবিটি দেখে চোখে পানি এসেছে। মিঠুন যেদিন খুন হয়েছেন সেদিন তার বাচ্চাটির জন্মদিন ছিলো। সেদিনই সেই বাচ্চাটি পিতৃহীন হয়ে গেলো । মিঠুন হত্যাকান্ডের বিচার আমি কারো কাছে চাইবোনা। পাহাড়ি নেতাদের বলবো আপনাদের মধ্যে যারা হানাহানি বাঁধিয়ে রাখছে, তাদের কলের পুতুল হয়ে খেলছেন আপনাদের যারা, এই সুযোগে যারা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলছে তাদের যদি চিনে বুঝে সচেতনভাবে চলতে না পারেন তাহলে আপনাদের হাতে পাহাড়িরা কতোটা নিরাপদ? প্লিজ পাহাড়ি নেতারা আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটুন। পাহাড়িদের শত্রু চিনতে না পারলে কিন্তু মিঠুন চাকমাদের প্রান হারানো চলতেই থাকবে। জেগে ওঠো পাহাড়ের প্রিয় প্রজন্ম আমার সব।-লেখক: সাংবাদিক