মশা ঠেকাবে কে

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকাতায় আছি,’- ঈশ্বর গুপ্তের ব্যঙ্গ কবিতার লাইনগুলো মনে এলো সাইফুল ইসলাম রতনের কথা শুনে। নিজেকে মাইজভাণ্ডারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া চা-বিক্রেতা রতন অবশ্য বলছিলেন, শুধু মশার কথাই- ‘রাতে তো কামড়াচ্ছেই, দিনেও রেহাই দিচ্ছে না।’ রতনের চায়ের দোকান রাজধানীর শিল্পাঞ্চল তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে। এ এলাকার ফুটপাতের অনেক দোকানেই দিন-রাত মশার কয়েল জ্বলে। যদিও ফলাফল শূন্য।

পথের ধারে রতনের চায়ের দোকান। পাশেই একটি রিকশা গ্যারেজ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে ছিলেন কয়েকজন রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। তাদেরই একজন হাজারীবাগের মোবাশ্বের আলী বললেন, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ভাঙা রাস্তা, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা; এবার বাড়ছে মশার উপদ্রব। মোবাশ্বের আরও জানালেন, একটু আগে তিনি দুই যাত্রীকে নিয়ে এসেছেন রায়েরবাজার থেকে। আসতে আসতে তারা বলাবলি করছিলেন ২০ তলার ওপরেও চলছে মশার উপদ্রব। এমনকি বিমান ছাড়তেও নাকি দেরি হয়েছে মশার কারণে।

২০ তলার ওপরে মশার উপদ্রবের তথ্যে অতিশয়োক্তি থাকতে পারে। তবে মশার জন্য গত বৃহস্পতিবার যে শাহজালাল বিমানবন্দরে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড্ডয়নে দুই ঘণ্টা দেরি হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের সুবাদে তা এর মধ্যে অনেকেই জেনেছেন।

আগে অপরিচ্ছন্ন, জলাবদ্ধ, নিচু ও বস্তি এলাকায় মশার বাড়বাড়ন্ত থাকলেও এখন ঢাকাজুড়ে শুরু হয়েছে মশার দাপট। নগরীর পরিপাটি অংশ গুলশান, বনানী, বারিধারাও আর মশকমুক্ত নয়।

সংখ্যায় বেড়েছে, খুঁজছে খাবার : জাহাঙ্গীররগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাসার মশা ও তার বিচরণের ওপর দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, সারা পৃথিবীতে অন্তত সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। বাংলাদেশে পাওয়া গেছে ১২৩ প্রজাতির মশার অস্তিত্বের সন্ধান। একটি প্রজাতি ছাড়া বাকি সবগুলোই রক্তচোষক। এসব প্রজাতির আবার শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই রক্তখেকো।

কয়েক বছর আগেও ভবনের উঁচুতলায় মশা ছিল না। কিন্তু অতিষ্ঠ ঢাকাবাসী জানাচ্ছেন, ২০ তলাতেও নাকি মশার উপদ্রব দেখা দিয়েছে। কবিরুল বাসার জানান, খাবারের অভাবেই দিন দিন ওপরের দিকে ছুটছে মশা। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ঢাকায় আবর্জনা ও জলাবদ্ধতার কারণে মশার প্রজনন ক্ষেত্র দিন দিন বাড়ছে। সংখ্যায় বেড়ে চলেছে তারা। খাদ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতাও বাড়ছে তাদের ভেতর। মশার খাবার সংগ্রহের বিচরণ ক্ষেত্র এক কিলোমিটার। আশপাশে খাবার খুঁজে পেলে সে যায় না অন্য কোথাও। তবে খাদ্যের অনুপাতে সংখ্যায় বেড়ে যাওয়ায় মশা এখন ওপরের দিকে ছুটছে।

নিধন ও জন্মনিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ করপোরেশনের ওষুধ : মশার প্রজননে আদর্শ তাপমাত্রা ১৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ মৌসুমের তাপমাত্রাও তেমন। শীতের অনাবৃষ্টি, নগরীর ঘিঞ্জি পরিবেশ, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন, খাল-জলাশয়ের বদ্ধ পানি, ডোবা-নালার যত্রতত্র কচুরিপানা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব- সব মিলিয়ে মশার প্রজননের উর্বর ও অনুকূল পরিবেশ এখন ঢাকাজুড়ে। মশা মারতে কিংবা এর ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণে’ সিটি করপোরেশনের যেসব ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তাও নেই বললেই চলে।

মশা নিধনে চলতি বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) বরাদ্দ ২০ কোটি টাকা। ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন সমকালকে বলেন, মশক নিধনে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার দক্ষিণের সর্বত্র এ প্রোগ্রাম চলবে। মশক নিধনের ওষুধ কেনার দায়িত্বে রয়েছে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। ওষুধ কেনা নিয়ে আগে যেসব অভিযোগ শোনা যেত, তা আর এখন নেই। অবশ্য ডিএনসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মশার ওষুধ ছিটিয়েও তেমন ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

সিটি করপোরেশন ঠিকমতো মশার ওষুধ ছিটায় না- নগরবাসীর এমন অভিযোগের জবাবে উত্তরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমদাদুল হক ও দক্ষিণের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ সালাহউদ্দিন বলেন, মশার ওষুধের কোনো সংকট নেই। ওষুধের মানও যথেষ্ট নিশ্চিত হয়ে সংগ্রহ করা হয়।

দুই সিটি করপোরেশনেরই প্রয়োজনীয় মশার ওষুধ তিন বছর ধরে সরবরাহ করছে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড ও বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। ওষুধ কেনার পর আইসিডিডিআরবি, খামারবাড়ি ও পরিবেশ অধিদপ্তর ওষুধের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করে। এর পর দক্ষিণ সিটিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ওষুধ সংরক্ষণ করা হলেও উত্তর সিটিতে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের তত্ত্বাবধানে ওষুধ দিয়ে দেওয়া হয়। মশা মারার ওষুধ ছিটাতে হয় সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলা। সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে লার্ভিসাইডিং ওষুধ ছিটাতে হয়। সন্ধ্যায় ছিটাতে হয় এডাল্টিসাইডিং ওষুধ।

আবারও চিকুনগুনিয়ার আতঙ্ক : গত বছর রাজধানীতে ঘরে ঘরে মানুষ আক্রান্ত হয় চিকুনগুনিয়ায়। হাসপাতালেও ছিল চিকুনগুনিয়া রোগীর ঢল। বিশেষজ্ঞদের মত, শুস্ক মৌসুমের শুরুতে মশকনিধন করতে না পারায় চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে ছিল নগরজুড়ে। এবারও একই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদিও হাত গুটিয়ে বসে আছে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তবে দুই সিটি করপোরেশনই আজ বুধবার থেকে মশকনিধনে মাঠে নামার কথা জানিয়েছে।

গত বছরের চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়েছিল এপ্রিলে। এবারও তেমন হবে কি-না, তা নিয়ে শঙ্কিত সবাই। গত বছর গর্ভাবস্থায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন রামপুরার সুমাইয়া আফরিন। এখন তার মেয়ের বয়স ১০ মাস। তিনি ভয়ে আছেন, এবার তার সন্তান আক্রান্ত হবে না তো! সব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দিনের বেলাতেই বাচ্চাকে মশা কামড়িয়ে ছোট্ট শরীর লাল করে দিয়েছে বলে জানান তিনি।

করপোরেশনের দাবি, দু’বেলা মশার ওষুধ ছিটানো হয়। তবে বনশ্রীর বাসিন্দা রুহুল ইসলাম রানা জানালেন, সকাল-সন্ধ্যা কোনো বেলাতেই তিনি মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেননি। সপ্তাহ দুয়েক ধরে মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, কোনো প্রতিরোধকেই কাজ হচ্ছে না।

মগবাজারের পেয়ারাবাগের গৃহবধূ নিশাত সাবেরা বলেন, পাঁচতলায় থাকেন। তার পরও শীত শেষ হতে না হতেই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তারা। দিলু রোডের বাসিন্দা তৃষ্ণা বেগম উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, সাধারণ মশার কামড় খেয়ে না হয় একটু ব্যথা পেলাম। এডিস মশা কামড়ালে তো জীবন নিয়েই টানাটানি শুরু হবে। ভয়ে মা-বাবারা শিশুসন্তানকে সারাদিনই বিছানায় মশারির মধ্যে রাখছেন বলে জানান তিনি।

এখন ঢাকায় যে কিউলেক্স মশার উৎপাত চলছে, তাতে মারাত্মক কোনো রোগের ঝুঁকি কম। তবে গত দুদিনের বৃষ্টির কারণে এডিস মশার উপদ্রব বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাসার জানান, এসব মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর ও জিকা ভাইরাসজনিত রোগ হয়।

নেই সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ :মশকনিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হটলাইন চালু করেছে। হটলাইন নম্বর : ০১৯৩২৬৬৫৫৪৪। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ নম্বরে কল করা যাবে।

তবে এত উদ্বেগজনক একটি সমস্যায় নেই কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক উদ্যোগ। বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই বাসাবাড়ির ফুলের টব, ডাবের খোলা, যানবাহনের টায়ারে পানি জমে। ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িতে জমে থাকা পানিতেও বিস্তার ঘটে মশার। অতীতে এ সময় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হতো। মেয়র-কাউন্সিলররা মশক নিধনে নামতেন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিও এ কাজে সম্পৃক্ত হতেন। পাড়া-মহল্লার ক্লাব, সংগঠনগুলোও অগ্রণী ভূমিকা রাখত। সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ার পর এ ধরনের উদ্যোগ আর দেখা যায়নি। নগরবাসী মশায় অতিষ্ঠ হলেও মশা মারতে হাত লাগায়নি।-সমকাল