মনু নদের বালু কত যে মধু!

যুগবার্তা ডেস্কঃ মৌলভীবাজারে মনু নদ থেকে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মনু নদের দুই পার।

আসন্ন বর্ষায় ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে নদের তীরবর্তী এলাকাসহ অনেক গ্রাম। এরই মধ্যে সদর উপজেলার শাহবন্দর এলাকায় নদতীরে কয়েকটি বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক।
মনু নদের তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানায়, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা নামে-বেনামে নদের বিভিন্ন অংশ লিজ নিয়ে শক্তিশালী বোমা মেশিন, বাল্কহেড মেশিন দিয়ে নদের তলদেশ ও তীরের পাশ থেকে বালু তুলছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে নদের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও তীরবর্তী এলাকা। ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট-মৌলভীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শতাধিক গ্রাম।

মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০-এর ৪ নম্বর ধারার (খ)-তে বলা হয়েছে, সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারাজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকার সর্বনিম্ন এক কিলোমিটার দূর থেকে বালু তুলতে হবে। কিন্তু মনু নদে এর কিছুই মানা হচ্ছে না। যে যার মতো করে নদের যেখান থেকে ইচ্ছা বালু তুলছে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা থেকে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে সদর উপজেলার শেষ প্রান্ত শেরপুর পর্যন্ত মনু নদে ২০টি স্থান বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে এলাকা ঘুরে এমনও দেখা গেছে, যে ঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে বালু না তুলে এর দুই পাশের কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে মেশিন দিয়ে বালু তুলছে ইজারাদাররা।

এলাকাবাসী জানায়, বালু উত্তোলনকারীদের বেশির ভাগ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না বা প্রতিবাদ করতে পারছে না। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তাঁদের ওপর নির্দেশ রয়েছে বালু উত্তোলন স্থানের (পয়েন্ট) নাম দেওয়া যাবে, তবে কার কাছে কোন ঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে তা বলা যাবে না।

মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের শাহবন্দর এলাকায় বালু নদ থেকে বালু তোলায় তীরে কয়েকটি বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। দিন দিন বড় হচ্ছে ফাটলগুলো। এতে সামনের বর্ষায় মহাসড়কে ভাঙন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আখাইলকুড়া ইউনিয়নের নতুন ব্রিজের নিচ থেকে মেশিনের মাধ্যমে বালু তুলে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের নবনির্মিত ভবনের আশপাশ ভরাট করা হচ্ছে। নদের চৈত্রঘাট থেকে মনুরমুখ পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বালু তোলায় ভাঙনের হুমকির মুখে আছে চাঁদনীঘাট, সাবিয়া, বলিয়ারভাগ, বালিকান্দি, ডেউপাশা, শ্রীরামপুর, শাহবন্দর, ধৌপাশা, দুর্লভপুর, মমরুজপুর, আশিয়া, কনকপুর, দলিয়া, ঘাঘুটিয়া, নলদাড়িয়া, দামিয়া, বাড়ন্তী, বেকামুড়া, সম্পাসী, থানাবাজার, ইসলামপুর, কামালপুর, মিরপুর, কাজিরবাজার, পাঠানটুলা, নাদামপুর, ঘোড়াখাল, সরকারবাজার, ফতেপুর, সাধুহাটি, শাহবাদ ও শেরপুর গ্রাম। বালু উত্তোলনে নিয়োজিত কয়েকটি স্থানের শ্রমিকদের কাছে খোঁজ নিলে তারা ইজারাদারের নাম জানে না বলে জানায়। শ্রমিকরা বলে, তাদের নদে মেশিন লাগিয়ে বালু ওঠাতে বলা হয়েছে; তারা সে অনুযায়ী কাজ করছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন বাপার মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ স ম ছালেহ সোহেল বলেন, ‘মনু নদ ছাড়াও জেলার অন্য নদী এবং ছড়াগুলো থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করায় জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, আমরা এমনটিই প্রত্যাশা করি। ’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আলম খান বলেন, ‘যারা বাল্কহেড মেশিন দিয়ে বালু তুলবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকটি মেশিন জব্দ করেছি। অভিযান চালানোর জন্য প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেলে দ্রুত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’-কালেরকন্ঠ