ভ্রান্ত আমি, শ্রান্ত আমি; ক্লান্ত অবশেষে! আর কতকাল থাকতে হবে হীরক রাজার দেশে!!

44

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার তো আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে সারতে পারিনি, অমনি তার পটাপট উত্তর। চোখটা বড় বড় করে মুখের উপর ঠাসঠাস করে দেয়া উত্তর। যেন উত্তরটা দেয়ার জন্যে আগে থেকেই রেডী ছিল। কথাগুলো ঠোঁটের একেবারে কোণে বসে ছিল; “আমি বিয়া করার লাইগ্যা পাগল ক্যান্? সত্যি জানবার চান? ভাবছেন, খুব ভাল্লাগে? সখে? জি না! এইহানে সখেরও কিচ্ছু নাই; ভাল্লাগারও কিচ্ছু নাই। আছে ঠ্যালা। ঠ্যালায় পইরা বিয়া করুম।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল। মনে হলো এই জগত সংসারের প্রতি মেয়েটির অনেক ক্ষোভ; অনেক অভিমান। নাহলে এতটা রসকষবিহীন কথা তার বলার কথা না। “রিক্সায় কইরা দুইজনে যাইতেছিলাম। পার্কে না; মার্কেটে। আবার হুডটাও ঢাইক্যা না; পূরাডা ফালাইয়া যাইতেছিলাম। বিশ্বাস করেন, ছ্যাড়াডার হাতটাও যদি ধরতাম! তাও না। হেরপরও খালি রাস্তায় পাইয়া রিকসা থামাইয়া যা তা কইলো। কাবিননামা আছে কিনা দেখবার চাইলো। আমরার দেশে মাইয়াগো বিয়া ছাড়া আর কোন উপায় নাই। রাস্তায় নামলেই সব দেখবার চায়। আর ধরে। মাইয়া মানুষ পাইলেই ধরে। বেডারা রাস্তার পাশে খাড়াইয়া যহন মুতে তহন ধরে না। ধরে আমরারে।”
কথাগুলোর মাঝে চরম খ্যাদোক্তি আছে। আছে তথাকথিত ভদ্র সমাজের মুখোশের আবডালে অভদ্রতার নির্লজ্জ উপখ্যান। আছে ন্যায় বিচার ব্যবস্থার বিপরীতে বিচারহীনতার চরম অব্যবস্থা। আছে নারীপুরুষ লিংগ বৈষম্যের কঠিন পরাকাষ্ঠ। এসব ওরা দেখেও না; খোঁজেও না। খোঁজে রাস্তায় চলা মেয়েদের কাবিননামা। জায়গা মত হাত দেবার মুরোদ নেই। আছে বেজায়গায় হাত দেবার কাপুরুষমূলক স্বভাব। ধর্ষণকারীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। ইভটিজাররা এখনো শিস দেয়। ওরা ওখানে হাত দেয় না। হাত দেয় অবলার দিকে।
সবলার দিকে নয়। সবলরা খুবই সবল। শক্তিশালী এবং সাহসী। সাহস না থাকলে কি জনারণ্যে নেংটু হয়ে হিসু করে! রাস্তায় কোথায়ও একটু ভিজা জায়গা দেখলেই জিপারে টান দেয়। অবশ্য এই কাজটা একটু হলেও আবডালে করে। কিন্তু বাকী সব করে প্রকাশ্যে। সবখানেই করে। অফিস আদালতে, মাঠে ময়দানে সবখানেই নেংটু হয়। নেংটু হয়ে ব্যাংকের টাকা মেরে খায়। কী খায় না? সুদ খায়; ঘুষ খায়। বীরদর্পেই খায়। কোন লজ্জাশরম নেই।
বরং সম্মান আছে। সম্মানীত অতিথি হিসেবে সভা সমাবেশের বড় চেয়ারটা পায়। সমিতি আর কমিটির প্রধান হয়। প্রধান কোথায় হয় না! এই সমাজে যে যত বড় দূর্নীতি করে সে তত বড় সামাজিক পদ পায়। তাদের ভাবসাবই আলাদা। তাদের গলাও বড়; গলার জোরও বড়। তাই তাদের প্রটেকশনের বহরও বড়। প্রটোকল সব সময় ব্যস্ত তাদেরকে নিয়েই। তাদেরকে সেবা দেয়া নিয়েই। টেকনাফের বাবাদের পুরো দল হাসতে হাসতে আত্মসমর্পণ করে জেলে গেল। পুরো প্রটেকশন নিয়েই গেল। দল তো নয়, যেন একটা পরিবারই গেল। কেবল বাইরে রইলো বড় বাবা; বদু বাবা।
বদু বাবা বাইরে থেকে বাকীরা সবাই ভিতরে গেলেই বা লাভ কি? দু’দিন আগেও তিনি আইন প্রণেতা ছিলেন। ক্ষমতাধর সাংসদ। তার ঘরের প্রায় প্রতিটি মানুষ ইয়াবা ব্যবসায়ী। অথচ তিনি জানেন না! পাঁচটি বছর গলা ফাটিয়ে বলে গেলেন তিনি ইয়াবা জিনিসটাই চেনেন না। এটাও বিশ্বাস করতে হয়। তবে এমনি বড় বাবাদের ওরা বিশ্বাস করে এবং দেখেও না দেখার ভান করে। শুধু দেখে রাস্তাঘাটের অবলা মেয়েদের। আর দেখতে চায় তাদের বৈবাহিক পরিচয়; দেখতে চায় বৈধ কাবিননামা।
তবে তারা কেবল কাবিননামাই চায় না। গাড়ীর কাগজপত্রও চায়। মোড়ে মোড়ে চায়। বিশেষ করে মাইক্রোবাসের কাগজ। রাস্তায় কোন মাইক্রোবাসকে ওরা হাত জাগিয়ে থামালো তো কর্মসারা। যত কাগজপত্রই দেখান, গাড়ী আর পাবেন না। বিশেষ রাষ্ট্রীয় কাজের নামে গাড়ী রিকুইজিশান হবে। মিনিমাম তিনদিন ড্রাইভারসহ গাড়ী তাদের হেফাজতে থাকবে। রাষ্ট্রীয় কাজে যে একেবারেই ব্যবহƒত হবে না তা নয়। একআধটু ব্যবহৃত হবে। তবে পারিবারিক সব কাজেই বেশী ব্যবহৃত হবে। বাসার বাজার করা, স্কুলে বাচ্চা আনা নেয়া করা। গিন্নীর বাপের বাড়ি যাওয়া। কোনটাই বাদ থাকবে না।
বেশীদিন আগের কথা নয়। মফস্বলে আমাদের অফিসিয়াল একটা মাইক্রোবাস ধরা পড়লো। উপজেলা শহর। ঢাকার খুব দূরেও নয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্ম সেরে দিনশেষে ক্লান্ত অফিসাররা ঢাকায় ফিরছিলেন। জলদি ফেরার তাড়াও ছিল। গ্রামের আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ ধরেই তারা আসছে। হঠাৎ নির্জন রাস্তায় ওদের দু’জনার চারটি হাত উঁচু হয়ে গেল। প্রথমে ধমকি ধামকি। ঢাকার গাড়ী মফস্বলে কেন! গাড়ীতে এত পুরুষ লোক কেন? মতলব কি?
কী সেলুকাস! মতলববাজরাই নিরীহ জনগণের মতলব খোঁজে।
তবে এ যাত্রায় খুঁজেও সুবিধে করতে পারেনি। সব প্রশ্নের পটাপট উত্তর পাওয়াতে চুপসে গেলেন। অগত্যা আর কী করা! কাগজপত্র দেখলেন। মহা মুশকিল। সবই তো ঠিকঠাক। তারপরও ছাড়েন না। বসিয়ে রাখলেন। অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। অবশেষ হুকুম হলো। উপর থেকে হকুম এলো। গাড়ী রিকুইজিশান করা হয়েছে। বিশেষ রাষ্ট্রীয় কাজে রিকুইজিশন। কিচ্ছু করার নেই। সব প্যাসেঞ্জার রাস্তায় নামিয়ে ড্রাইভারসহ গাড়ী রেখে দিলেন তাদের নিজেদের জিম্মায়।
এতো গেল হাইওয়ের গল্প। এবার শুনুন রেলওয়ের উপাখ্যান। বাংলাদেশ রেলওয়ের গফরগাঁও স্টেশন। খুবই নামীদামী এবং পরিচিত স্টেশন। ঢাকামুখী সন্ধ্যার তিস্তা ট্রেন ধরার জন্যে আমরা তিনজন যাত্রী অপেক্ষায় আছি। আর আছে আমাদেরকে বিদায় জানাতে আসা গোটা দশেক লোক। ট্রেন এলো। টিকিটের নাম্বার অনুযায়ী আমরা নির্ধারিত বগীর সামনে। কিন্তু বগীর দরজা খোলে না। দরজা লক। ওঠার জোঁ নেই। ভিতরে খোলার লোকও নেই।
আমাদের শত চেচামেচি চিৎকার কারো কানেই যেন পৌঁছে না। এদিকে সময় যায়। বগীর জন্যে নির্ধারিত রেলওয়ের ষ্টাফ হাওয়া। সে কিছুক্ষণের জন্যে কোথায়ও লুকিয়ে আছে। টেনটা ছাড়লেই মুখ বের করবে। পূর্ব পরিকল্পনা মাফিকই সব হচ্ছে। আমাদের তো মহাবিপদ ঘন্টা বাজতে লাগলো। আমরা একবার বগীর পেছনের দরজা, আর একবার সামনের দরজায় দৌঁড়াদৌঁড়ি করছি। দুটো দরজাতেই একই অবস্থা। এবার ট্রেন প্রায় ছেড়েই দেবে। অগত্যা খুব জোরে দৌঁড়ে পরপর চারটে বগীর পরের বগীতে কোনমতে লাফিয়ে উঠলাম।
উঠলো সফরসংগী মহসিন এবং শিবলী। ওদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। অবশ্য তাকাতাকির সময়ও নেই। সামনে এগুতে হবে। ভিতর দিয়ে একে ওকে ঠেলেঠুলে মানুষজন মাড়িয়ে নিজের বগীতে আসার চেষ্টা করতে হবে। খারাপ করলাম না। একে ওকে পারিয়ে মাড়িয়ে পরপর দু’বগী পারও হয়ে গেলাম। আর খেলাম গালি। যে যেভাবে পেরেছে গালি দিয়েছে। দেয় দিক; তবুও পৌঁছে গেলাম নিজেদের বগীর ঠিক আগের বগীতে।
দূর্ভাগ্য! কে জানতো ওটা পাওয়ার কার। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বিকট আওয়াজে জেনারেটর চলছে। হাঁটার রাস্তা খুবই সরু। তবে প্রচুর লোকজন আছে। কেউ বা দাঁড়িয়ে, কেউ বা মেঝেতে বসে। সামনে এক কদম হাঁটা দুস্কর। এদিকে জেনারেটরের গরমে নাভিশ্বাস উঠেছে। তারপরও বাঁচার চেষ্টা। সবাইকে টপকে কোনমতে আমাদের বগীর ভেতরের দরজায় পৌঁছানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। কিন্তু বিধি বাম। এখানের দরজাও ভেতর থেকে লক করা। শত ধাক্কাধাক্কির পরও কেউ খোলে না। ভাবলাম জীবন প্রদীপ আজকে নিভেই যাবে। পাওয়ার কারের প্রচন্ড গরমে ঢাকা হয়ত পৌঁছাবো। তবে নিষ্প্রাণ দেহে।
হঠাৎ দরজার চিপায় বগীর ষ্টাফকে আবিষ্কার করলাম। ধরা খেয়ে ও ব্যাটা কাঁচুমাচু করে লক খুলে আমাদেরকে ভিতরে নিল। ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে যাওয়া আমাদের সিটে যারা বসে ছিলেন অবস্থা বেগতিক দেখে তারাও তরতর করে সিট ছেড়ে দিল। ওদের আজকের ব্যবসা শেষ। দারুণ ব্যবসা। আমাদের সিট বিক্রি করে অন্য যাত্রীদেরকে বসিয়ে দিয়েছে। আর বগীর দরজা লক করে রেখেছে যেন আমরা ট্রেনেই উঠতে না পারি।
শত ভ্রান্তির পাহাড় ডিঙিয়ে সিটে বসে শান্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলাম। এক নতুন জীবনের নিঃশ্বাস। মনে হল মহা বাঁচা বেঁচে গেলাম। জানালা দিয়ে বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া কিচ্ছু দেখা যায় না। তবুও দেখার চেষ্টা করছি। নাহ, কিছুই দেখা যায় না। শুধু আমার শোনিমের মুখটা ছাড়া আর কিচ্ছু দেখছি না। ট্রেন চলছে তার নিজস্ব গতিতে। ঝিকির ঝিকির করেই চলছে। প্রচন্ড ক্লান্ত আমি সিটে পুরো গা এলিয়ে দিয়েছি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে; আর গলা যাচ্ছে শুকিয়ে। একটু পানি দরকার। ঢকঢক করে খাবার জন্যে ঠান্ডা পানি। একেবারে বরফে ভেজানো হিম শীতল ঠান্ডা পানি।-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।