ভাষাসংগ্রামী তকীয়ূল্লাহ্ আর নেই

যুগবার্তা ডেস্কঃ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র ভাষাসংগ্রামী কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ্ আর নেই। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ১০মিনিটে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বেশ কয়েকদিন তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

কমরেড তকীয়ূল্লাহর মরদেহ হাসপাতাল থেকে বেলা ৩টায় তাঁর বাসায় এবং পরে বিকেল ৪টায় সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তিভবনে আনা হয়। সেখানে কাস্তে-হাতুড়ি খচিত কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা দিয়ে প্রয়াতের মরদেহ ঢেকে দেওয়া হয়। কমরেডের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটি ও বিভিন্ন কমিটি, বাংলা একাডেমি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, যুব ইউনিয়ন, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, গেরিলা ১৯৭১ ফাউন্ডেশন, সাপ্তাহিক একতাসহ বিভিন্ন দল, সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
মুক্তিভবনে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুľামান খান ও কমরেড তকীয়ূল্লাহর মেয়ে সাংবাদিক শান্তা মারিয়া। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আব্দুল্লাহ্ ক্বাফি রতন।

কমরেড তকীয়ূল্লাহর জ্ঞানতাপস ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর চতুর্থ পুত্র আবুল জামাল মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ্। ভাষা আন্দোলনকে যাঁরা সংগঠিত করেছেন এবং এই আন্দোলনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ্ তাঁদের অন্যতম। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ এবং এলএলবি পড়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন অফিসার হিসেবে নিয়োগের জন্য ইন্টারসার্ভিস সিলেকশন বোর্ড (আইএসএসবি) কর্তৃক তিনি বাঙালি হিসেবে প্রথম নির্বাচিত হন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি।
১৯৪৯ সালে রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার জন্য তকীয়ূল্লাহ্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। তাঁর নামে হুলিয়া জারী হওয়ায় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ভাষার অধিকারসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা ছিল। তিনি তখন কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির প্রকাশ্য টিমের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৬-৫৮ সালে যুবলীগ কার্যনির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী ছিলেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রæয়ারি ˆস্বরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আবার গ্রেপ্তার হন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তফাľল হোসেন মানিক মিয়া, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রমুখের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৬ নম্বর সেলে বন্দী ছিলেন। পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে বিভিনś ধরনের গবেষণায় আত্ননিয়োগ করেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সূচিত ও বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যাপক সংস্কার করেছেন মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ্। বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত এই বর্ষপঞ্জি বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। তকীয়ূল্লাহ্ প্রস্তাবিত পদ্ধতিতেই ১৪০২ বঙ্গাব্দ থেকে বাংলা সনের বর্ষপঞ্জির দিন তারিখ গণনা করা হচ্ছে। তিনি চার হাজার বছরের বাংলা, ইংরেজি ও হিজরি ক্যালেন্ডার ˆতরি করেছেন। তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনী লিখেছেন সেই সঙ্গে আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিকাশ সম্পর্কে লেখালেখি করেছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনার প্রথম তালিকাটি তাঁরই করা।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের যে চারটি মাত্র আলোকচিত্র পাওয়া যায় তা কমরেড তকীয়ূল্লাহর তোলা। তাঁর আত্মজীবনী ‘পলাতক জীবনের বাঁকেবাঁকে’ ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়।
১৬ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ্ মৃত্যুবরণ করেন।