বেদখল ৪ হাজার একর জমি

18

রাজীব আহাম্মদঃ ব্রিটিশ শাসনামলের বেঙ্গল রেলওয়ে থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল ভূসম্পদ পেয়েছে রেলওয়ে। তাই দীর্ঘ কয়েক দশকে বেদখলের খপ্পরেও পড়েছে এ প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দলনেতা; ব্যবসায়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকারি সংস্থার নামও রয়েছে এর দখলদারের তালিকায়। রেলওয়ের হিসাবে, সংস্থাটির ৬১ হাজার ৮৬০ একর জমির তিন হাজার ৮৪১ একর জমি বেদখল হয়ে গেছে। গায়েব হয়েছে এক হাজার ৮৪১ একর জমি। কোনো দলিল-নথিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এসব জমির। সরেজমিন চিত্র আরও খারাপ। রেল কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন, তাদের হিসাবে যত, বাস্তবে এর চেয়েও বেশি জমি দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। এগুলো উদ্ধারে নেই রেলের তৎপরতা। নদীর জমি ও সড়ককে দখলমুক্ত করতে অভিযান চললেও, এ কাজে পিছিয়ে রেল। কালেভদ্রে উচ্ছেদ অভিযান হলেও, উদ্ধার করা জমি ফের দখল হয়। উচ্ছেদ অভিযান ও আইনি লড়াই দুই জায়গাতেই পিছিয়ে এ সংস্থা।

রেলের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। তবে নব্বইয়ের দশকে অনেক রেলপথ ও স্টেশনে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিত্যক্ত এসব সম্পদ দখল হয়েছে বেশি। রেলের জমি ‘বিক্রি’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

রেলের জমিকে আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে শেলটেক কনসালট্যান্ট লিমিটেডকে জরিপের কাজ দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে জরিপ প্রতিবেদন দেয় শেলটেক। রেলের নথিতে জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৮৬০ একর হলেও শেলটেক জরিপে মিলেছে ৫৯ হাজার ৭৫৫ একর। এক হাজার ৮৭১ একর জমির কোনো দলিল-নথি পাওয়া যায়নি। তবে শেলটেকের কাজে সন্তুষ্ট নয় রেলওয়ে। নতুন পরামর্শক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে রেলের সূত্র জানাচ্ছে, দখলদাররা ‘হারিয়ে যাওয়া’ এক হাজার ৮৪১ একর জমির দলিল, পর্চা ও নথি গায়েব করেছে। এর সঙ্গে রেলের কর্মকর্তারাও জড়িত। তারাই রেলের ভূ-সম্পত্তির দলিল অফিস থেকে গায়েব করে ফেলেছেন। আর দখলদাররা নিজেদের নামে জমি রেকর্ড করে নিয়েছে।

রেল যেসব সম্পত্তি ইজারা দিয়েছিল, সেসবেরও একটি বড় অংশ বেহাত হয়েছে। কৃষিকাজের জন্য ইজারা দেওয়া রেলের জমি ব্যবহূত হচ্ছে বাণিজ্যিক কাজে। সেখানে বহুতল ভবন, মার্কেট নির্মিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামেও দখল হয়েছে রেলের জমি। রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব। তাই চাইলেও জমি উদ্ধার করা যায় না। দখলদাররা মামলা করে, আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে দখল পোক্ত করেছে।

রেলের জমি নিয়ে কত মামলা চলছে, তার তথ্য মেলেনি ঢাকার রেল ভবনে। তবে ভূ-সম্পদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা ধারণা দেন, মামলার সংখ্যা হাজারের বেশি। মামলা পরিচালনাতেও রয়েছে সমস্যা। রেলের আইনজীবীরা মামলা পরিচালনার জন্য দৈনিক মাত্র ৩২ টাকা সম্মানী পান। ভালো উকিলরা তাই রেলের হয়ে মামলা লড়তে চান না। আদালতে দখলদারদের পক্ষ নেন- এমন গুরুতর অভিযোগও রেলের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, শুধু জমি নয়; রেলের আরও বিপুল সম্পদ রয়েছে। রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, জলাশয়সহ বিপুল ভূ-সম্পদ। এগুলো রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রেলের জমি দখল করে কেউ পার পাবে না। রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভাষ্যও একই রকম, যদিও মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন নেই। একজন সাবেক মন্ত্রী চট্টগ্রামে রেলের জমি দখল করে কারখানা করেছেন। উদ্ধারে গিয়েও জমি দখল করতে পারেনি রেল। তিন বছর ধরে চলছে সাবেক মন্ত্রীর কারখানা।

রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘রেলের জমি দখল করলেও কেউ হজম করতে পারবে না। যখন রেলের প্রয়োজন হবে, তখন ঠিকই জমি উদ্ধার করা হবে।’ সরকারের অন্যান্য সংস্থার চেয়ে রেলের জমিই কেন বেশি দখল হয়- এ প্রশ্নে সচিব জানান, কিছু রেললাইন বন্ধ হওয়ার পর সেখানকার জমি পতিত পড়ে ছিল। এ সুযোগে জমি বেদখল হয়েছে। রেলপথের পাশেও রেলের বিস্তর পতিত জমি রয়েছে। সেগুলোও খালি পেয়ে দখল করে দখলদাররা। কিন্তু কেউ শেষ পর্যন্ত পার পায় না।

ঢাকাতেও বেপরোয়া দখলদাররা : সারাদেশের মতো ঢাকায়ও বেদখলে চলে গেছে রেলের অনেক জমি। কমলাপুর স্টেশন নির্মাণের আগে যেখানে ঢাকার প্রথম রেলস্টেশন ছিল, সেই ফুলবাড়িয়া স্টেশনের তিন দশমিক ৯৭ একর জমি বেদখল হয়েছে। চার দশকেও তা উদ্ধার করা যায়নি।

গত ১৯ জুন ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সভায় জানানো হয়, এ জমি নিয়ে তিনটি মামলা ছিল। একটি মামলার রায় রেলের পক্ষে এসেছে। আরও দুটি মামলা চলছে। মামলা নিষ্পত্তি হলে জমিটি সিটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যাবে। তবে রেলের উপপরিচালক (ভূ-সম্পদ) আবিদুর রহমান বলেছেন, ফুলবাড়িয়ার এ জমিতে রেলের আইকনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে রেলের নথি বলছে, এ জমি নিয়ে পাঁচটি মামলা চলছে। সব মামলাই রেলের বিরুদ্ধে দখলদারদের করা। মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি বা পরিস্থিতি জানাতে পারেননি রেলের আইন শাখার কর্মকর্তারা। রেল সচিব বলেছেন, মামলার গতি বাড়াতে আইনজীবীদের সম্মানী বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে দৈনিক ৩২ টাকার সম্মানী বেড়ে কত হবে, তা এখনও ঠিক করা হয়নি।

দখল কমেছে উড়াল সড়ক নির্মাণে : রাজধানীতে রেললাইনের দুই পাশের দখল সম্প্রতি কমেছে। তবে এর কৃতিত্ব রেলের নয়। বিমানবন্দর থেকে চিটাগং রোড পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেডওয়ের নির্মাণ কাজ চলছে। রেলের পাশ দিয়ে এবং ওপর দিয়ে এ উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণ কাজের জন্য রেলের দুই পাশের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। গেন্ডারিয়া স্টেশন থেকে পদ্মা রেল সংযোগের কাজ শুরু হয়েছে। এ কারণে সেখানেও দখল কমেছে।

তবে বিমানবন্দর স্টেশন এলাকা পার হলে ভিন্ন চিত্র। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশেই বহু স্থাপনা দেখা যায়। কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ লাইনের দুই পাশেও অবৈধ দখল টিকে রয়েছে। রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হাবিবুর রহমান বলেছেন, রেললাইনের দুই পাশে অবৈধ দখল ট্রেন চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ট্রেন কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারছে না।

সবচেয়ে বেশি বেদখল পাকশীতে : রেলের জমি বেদখলের ঘটনা ঢাকার বাইরে বেশি। পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল- এ দুই অঞ্চলে বিভক্ত রেলের কার্যক্রম। পূর্বাঞ্চলের অধীনে রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ। পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগ।

রেলের মোট ৬১ হাজার ৮৬০ একর জমির মধ্যে তিন হাজার ৮৪১ একর জমি বেদখল রয়েছে। এ হিসাবও দুই বছর আগের। অনেকেরই ধারণা, বর্তমানে এ পরিমাণ আরও বেড়েছে। উপপরিচালক আবিদুর রহমান জানিয়েছেন, জমির হিসাব হালনাগাদ করার কাজ চলছে। শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

আগের হিসাবে ব্যক্তি পর্যায়ের দখলকারীর কব্জায় রয়েছে দুই হাজার ৮২৮ একর জমি। বেদখল জমির তালিকা করলেও দখলদারদের নাম-ঠিকানার তালিকা করেনি রেল। তাই জানা যায়নি, দখলদারদের তালিকায় কারা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়েছে পাকশী বিভাগে। এ বিভাগে রেলের জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৫২০ একর। বেদখল হয়েছে দুই হাজার ৪৭০ একর। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল করেছে ৩৫২ একর জমি। ব্যক্তি পর্যায়ের দখলদারদের কব্জায় রয়েছে দুই হাজার ৫৮ একর জমি। পাকশী বিভাগে রেলের অব্যবহূত জমির পরিমাণ ছয় হাজার ৬৩৭ একর। তবে সমকালের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, অব্যবহূত জমির একটি বড় অংশ বেদখল হয়ে গেছে, যা রেলের নথিতেও নেই।

পাকশী বিভাগের ছয় হাজার ২৪৩ একর জমি ইজারা (লাইসেন্স) দিয়ে রেখেছে রেল। পাঁচ হাজার ১৮৭ একর জমি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কৃষিকাজের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, কৃষিকাজে জমি নিয়ে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন তোলা হয়েছে। মাছ চাষের জন্য ইজারা নেওয়া হাজার কোটি টাকার জলাশয় ভরাট করে ঘর তোলার ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে।

ঢাকা বিভাগে রেলের জমির পরিমাণ ১৭ হাজার ১৬৯ একর। এর মধ্যে তিন হাজার ৩৯৩ একর জমি ইজারাদারদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। বেদখল জমির পরিমাণ ৬৮৪ একর। লালমনিরহাট বিভাগে জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৮৯৮ একর। বেদখল জমি ৫১৮ একর। চট্টগ্রাম বিভাগের সাত হাজার ২৭১ জমির মধ্যে বেদখল ১৬৯ একর।

সারাদেশে রেলের ১৪ হাজার ৪৭৩ একর জমি ইজারা দেওয়া রয়েছে। অব্যবহূত পড়ে রয়েছে ১০ হাজার ৮৪৩ একর। জমি ইজারা বিষয়ে আগের নীতিমালা সংশোধন করছে রেল। ইতিমধ্যে এর খসড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন জানিয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে, এমন জমি আর ইজারা দেওয়া হবে না। রেলের জমি রক্ষায় নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে।-সমকাল