বুঝতে গেলে ঘটে কিছু থাকতে হয়

15

ডাঃ হারুন উর রশিদঃ সংকটের অর্থনীতি কথাটা দু এক বার শুনেছি। অর্থনীতির ছাত্র না হওয়ায় তেমন বুঝিনি। গুগলেও খোজার চেস্টা করেছি,তেমন বুঝনি,কারন বুঝতে গেলে ঘটে কিছু থাকতে হয়। তার পরও মনে হল দু-এক কথা লিখি, কারন আমরাও এখন সংকটে ।আর বেশির ভাগ মানুষের অর্থনীতির জ্ঞান আমার মত,অর্থাৎ ঐ আম বয়ান।

করোনা নিয়ে আলোচনা জানুয়ারির শুরুতেই। তখন আমি ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে। ১ ফেব্রুয়ারী আমাদের রেজিস্ট্রার ডা: কামরুন নাহার কেয়া নোভেল করোনা ভাইরাসের উপরে সকাল সাড়ে ৮টায় সিএমইতে একটা বক্তব্য উপস্থাপন করেন, ঐ দিনই ১১টায় ঢাকা মেডিকেল একই বিষয়ে যে বক্তব্য প্রদান করে তার একটা লিখিত কপি পাই। ওদের লিখিত কপিতে একটু বেশি তথ্য থাকায় ওটা পরবর্তীতে আমরা নানা ভাবে ব্যবহার করি। আইইডিসিআরও কতগুলি তথ্য ও প্রস্তুতির কথা টেলিভিশনে প্রতিদিনই আসতে থাকে। মনে হচ্ছিল তারা প্রস্তুত, কিন্তু ৮ মার্চের পর দেখা গেল তাদের প্রস্তুতি নাই বললেই চলে। যখন সাধারন ছুটি প্রদান করে তখন অদ্ভুত কতগুলো ঘটনা চোখে পড়ে। মানুষ যখন বুঝতে পারে আর্থিক কারনেই এই শহরে থাকার কোন উপায় নেই তখন তারা তরিঘরি করে এই শহর ছাড়তে শুরু করে, আমরা এই আচরন অসচেতনতা বলে অপবাদ দেই। হঠাৎ করেই শহরটা ফাঁকা হয়ে যায়। যে রিক্সা চালক এখানে থেকে যায় তাদের কোনো যাত্রী নেই, সবাই খবরের কাগজ নেওয়া বন্ধ করায় হকারেরা বেকার হয়ে যায় ;অনুরূপ ভাবে গৃহস্থালি কাজের কর্মী, ধোপা,নাপিত, জুতা পোলিশের কর্মী ইত্যাদি নানা পেসার মানুষ বেকার হতে থাকে। স্কুল বন্ধ, অন্য দিকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের আয় কমেছে, তাই প্রাইভেট টিউটররা বেকার,খুদে কারখানার মালিকরা পথে বসেছে,করপোরেট অফিসের অনেক কর্মীর চাকুরীই নেই,এই সংখাটা বাড়তেই থাকে। তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এখন কাজ পেলেও প্রথমে নাটাইয়ের মত শহর-গ্রাম-শহর করেছে। পরিবন শ্রমিকদের অবস্থা প্রথমে করুন হলেও এখন তারাই মালিক দের পক্ষ হয়ে মানুষের গলা কাটছে। করোনার মধ্যেই ২৬টি রাস্ট্রায়াত্ব পাটকল শ্রমিকের চাকুরী চলে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া যাবে পাট চাষী ও পাট ব্যবসায়িদের উপর। কৃষকরা তাদের ফসল বিক্রি করতে না পারায় প্রথমে তারাও বিপদে ছিলো। প্রবাসী শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে দেশে ফেরত আসে। তাদের উন্নাসিক আচরণ ও প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইন না করার দায় গুনছে আজ সমগ্র জাতি। স্বাস্থ্য কর্মীদের অবস্থা খুবই নাজুক। কিছু চিকিৎসক ও নার্সের নতুন চাকুরী হয়েছে বা যেসমস্ত ডাক্তাররা প্রাইভেট প্রাকটিস ধরে রেখেছে তাদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। কিন্তু একটু সিনিয়র চিকিৎসকরা করোনার কারনে চেম্বার থেকে ছিটকে পরেছে, তাদের আয় শুন্যের কোটায়। হাসপাতালে যে স্বাস্থ্য কর্মীরা কাজ করেছে তাদেরও নানা সমস্যা, এর মধ্যে সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব,নিন্ম মান, ইত্যাদি তাদেরকে অনেক ভুগিয়েছে। তবে সবচেয়ে করুন অবস্থা বেসরকারি হাসপাতালের কর্মীদের; হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো সুরক্ষা পোশাক প্রদান করে নাই, বেতন কমিয়েছে,ছাটাই করেছে। এধরণের হাসপাতালের সংখ্যা অনেক,বেশিরভাগ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের কোনো সার্ভিস রুল না থাকায় মালিক পক্ষের দিক থেকে আচরন অনেকটা প্রভু ভৃত্যের মত, যথেচ্ছা বেতন কমাচ্ছে,যখন খুশি ছাটাই করে দিচ্ছে। শুনলে অবাক হবেন তাদের প্রদান করা হয় বেতনের তিনভাগের একভাগেরও কম। তাই অনেকে বাড়ি ছেড়ে মেসে চলে গেছে। অনেক পত্রিকার কর্মীরদের চাকরি ছাটাই করা হয়েছে। এ রকম বহু মানুষ একেবারে পথে বসে গেছে, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান অনেক নীচে নেমে গেছে।

এর অন্য চিত্রও আছে। কারখানা মালিকেরা পেয়েছে কোটি কোটি টাকার প্রনোদনা। কিন্তু সেই পুরানো রোগ, শ্রমিকদের বেতনের প্রদানে নানা অনিহা।গায়ে আঁচড়ও লাগেনি। কতগুলো হাসপাতালের পোয়াবারো, সরকারের কাছে থেকে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছে, রোগীদের থেকে ভুতুড়ে বিল গ্রহন,টেস্ট না করেই টাকা নিয়েছে কত কি! আবার প্রবাসী বাংলাদেশিরা মিথ্যা সার্টিফিকেট নিয়ে ইতালি গিয়ে উড়োজাহাজ থেকে নামতেই পরেনি, আবার ফেরত চলে আসছে। দেশে তৈরি নিম্ন মানের সুরক্ষা পোশাকে বিদেশি সিল লাগিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা,৫০০ টাকার চশমার দাম ধরা হয়েছে ৫০০০ টাকা।চিকিৎসা কর্মীদের থাকা -খাবার বিল হয়েছে আকাশ ছোয়া। ৮০০০ টাকার অক্সিজেন সিলিন্ডার ৩০০০০টাকা,বানিজ্যিক অক্সিজেন বিক্রি করা হয়েছে মেডিকেল অক্সিজেন হিসেবে। ঔষধ ব্যবসায় পোয়াবারো, কারখানার মালিক থেকে খুচরো দোকানের রমরমা অবস্থা। পাড়ার মুদি দোকানের বিক্রিও বেড়েছে। ভুয়া স্যনিটাইজার, মাস্ক,গ্ললভ্স দেদারসে বিক্রি হয়েেছে। কালো টাকা অর্থাৎ চুরির টাকা সাদা করতে দেবার ফলে আবাসন ব্যবসার আরো বার বাড়ন্ত।তেলের দাম কম থাকার পরেও বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
ঢাকা শহর থেকে পঞ্চাশ হাজারের বেশি পরিবার ভাড়া বাড়ি ছেড়ে গ্রামে যেতে বাধ্য হয়েছে।অন্য দিকে পানি- বিদ্যুৎ ইত্যাদির সব ভুতুরে বিল মানুষের হাতে প্রদান করা হয়েছ।এই অব্যবস্হার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। তাদের সীমাহীন অবহেলা,সমন্বয়হীনতার ফলেই দেশের আজ এই অবস্হা। তাই একদিকে হাজার হাজার মানুষ পথে বসছে অন্যদিকে সম্পদশালী হচ্ছে অল্প কয়েকজন মানুষ মাত্র, অংকের হিসেবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ লক্ষ মানুষ দরিদ্র থেকে হত দরিদ্রে পরিনত হবার দায় কার!-লেখকঃ একজন অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।