যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজধানীর গুলশানে গত মাসে সন্ত্রাসী হামলার পর নিরাপত্তা উদ্বেগে পূর্বনির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল ও স্থগিত করেছেন তৈরি পোশাক খাতের অনেক ক্রেতা প্রতিনিধি। এ পরিস্থিতিতে বিদেশীদের আশ্বস্ত করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয় সরকার। কূটনৈতিক পাড়াসহ বিদেশীদের যাতায়াত রয়েছে এমন সব স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ফলে কিছুটা আস্থা নিয়ে আবারো বাংলাদেশে আসা শুরু করেছেন বিদেশী ক্রেতারা। তবে সেক্ষেত্রে তাদের দেয়া হচ্ছে বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরা।
৮ আগস্ট ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন বাংলাদেশের পোশাকপণ্যের ক্রেতা তুরস্কের এক নাগরিক। তার গন্তব্য ছিল পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান টেমাকস ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডের বারিধারার কার্যালয়। গন্তব্যে পৌঁছতে তাকে দেয়া হয় বিমানবন্দর থেকে গুলশান পার্ক রোড পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা। শিল্প পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টর ও চার কনস্টেবলসহ মোট পাঁচজনের দল তাকে এ বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরা দেয়।
পরের দিন ৯ আগস্ট একই প্রতিষ্ঠানে আসেন তুরস্কের আরেকজন ক্রেতা প্রতিনিধি। তাকেও আগের জনের মতো শিল্প পুলিশের চারজনের একটি দল বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরা দিয়েছে। কাজ শেষে ১১ ও ১২ আগস্ট বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এ দুই বিদেশী। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত পুরো সময়টায় শিল্প পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরায় যাতায়াত করেন তারা।
জানা গেছে, গত ২১ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান শিল্প পুলিশের সহযোগিতায় বিদেশী ক্রেতাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে তাদের মূল লক্ষ্য— ক্রেতাদের ভেতরকার উদ্বেগ দূর করে নিরবচ্ছিন্ন ব্যবসা পরিচালনা। আলোচ্য সময়ের মধ্যে শিল্প পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরা সেবা গ্রহণকারীরা ছিলেন যুক্তরাজ্য, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। বাংলাদেশে তারা টেমাকস ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড, নেক্টস সোর্সিং লিমিটেড, কটন বাংলাদেশ লিমিটেড, মোহাম্মদী গ্রুপ, জিন্নাত কমপ্লেক্স লিমিটেড ও স্টুডিও টেক্সের কার্যালয়ে এসেছিলেন ব্যবসায়িক কাজে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেয়া এ বিশেষ প্রহরায় ক্রেতা প্রতিনিধিরা বেশ খুশি বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক। তিনি বলেন, ক্রেতারা বাংলাদেশে বিমানবন্দরে আসার পর থেকে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থায় নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। ক্রেতাদের আগমনের বিষয়ে আগে থেকে যোগাযোগ করে রাখলে বিজিএমইএর সহায়তায় এ সেবা পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে আসা ক্রেতা প্রতিনিধিদের এরই মধ্যে এ সেবা দেয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় তারা খুবই সন্তুষ্ট। প্রত্যাশা করছি, আগামী দিনগুলোয় নিরাপত্তা প্রহরায় ব্যবসায়িক সফরের প্রয়োজন পড়বে না।
দেশে ব্যবসার কাজে আসা বিদেশীদের পাশাপাশি এখানে বসবাসরত বিদেশীরাও আছেন নিরাপত্তা নজরদারিতে। শিল্প অধ্যুষিত আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে কারখানা আছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। এর মধ্যে পোশাক কারখানার সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এসব কারখানায় কর্মরত প্রায় চার হাজার বিদেশী নাগরিক। সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরও শিল্প পুলিশের নিরাপত্তা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
শিল্প পুলিশের আওতাধীন এলাকাগুলোর কারখানায় কর্মরত বিদেশী নাগরিক আছেন ২ হাজার ১৪৬ জন। এরা সবাই রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেডের) বাইরে স্থাপিত কারখানায় কাজ করেন। শিল্প পুলিশের আওতাভুক্ত মোট তিনটি এলাকায় আছে ইপিজেড। এ ইপিজেডগুলোয় কাজ করেন মোট ১ হাজার ৭২১ জন বিদেশী নাগরিক। এ হিসাবে মোট ৩ হাজার ৮৬৭ জন বিদেশী নাগরিক শিল্প পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা নজরদারির মধ্যে রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক আবদুস সালাম বলেন, শিল্প পুলিশের আওতাধীন কারখানাগুলোয় কর্মরত আছেন অনেক বিদেশী। এরা প্রায় সবাই বস্ত্র ও পোশাক কারখানায় কাজ করেন। এসব কারখানায় কর্মরত প্রায় চার হাজার বিদেশী নাগরিকের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এদের সবাই বিশেষ নিরাপত্তা নজরদারির আওতায় আছেন। এছাড়া যেসব ক্রেতা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসছেন, খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আমরা তাদের বিশেষ নিরাপত্তা সেবা দিচ্ছি। কোনো ক্রেতা বাংলাদেশে এলে বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ ত্যাগের আগ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।
শিল্প পুলিশ চট্টগ্রামের আওতায় বিভিন্ন শিল্পে কর্মরত বিদেশী আছেন ১ হাজার ২২১ জন। গুলশানের ঘটনার পর তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে। গত এক মাসে বিশেষ প্রহরায় সেবা দেয়া হয়েছে অর্ধশতাধিক বিদেশী প্রতিনিধি ও ক্রেতাকে। এ সেবা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইয়াংওয়ান গ্রুপ এবং বিএসআরএম স্টিল মিলস লিমিটেডও রয়েছে বলে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, তাদের আওতাধীন এলাকায় যেসব কারখানা বিদেশীদের জন্য বিশেষ প্রহরা সেবা নিয়েছে, তার মধ্যে আছে বসুন্ধরা পেপার মিলস, মেঘনা ঘাট পাওয়ার স্টেশন এবং সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন। এ সেবার আওতায় থাকা বিদেশীর সংখ্যা ১৩৫। এছাড়া রূপায়ণ টাউনে প্রায় ২০০ বিদেশী বসবাস করেন, যারা বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত। তাদেরও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
শিল্প-কারখানাগুলোয় কর্মরত বিদেশীদের মধ্যে কেউ কেউ থাকেন শিল্প এলাকার ভেতর। আবার অনেকে শিল্প এলাকার বাইরে বসবাস করেন। এদের বেশির ভাগই কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প পুলিশ এদের সবার দেশ, কর্মস্থল, আবাসস্থলসহ সার্বিকভাবে তাদের গতিবিধির ওপর বিশেষ নজর রাখছে। বিদেশীরা কর্মস্থলে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে প্রয়োজন মনে করলে তারা শিল্প পুলিশের নিরাপত্তা সহযোগিতা চাইতে পারছেন। শিল্পাঞ্চলের বাইরে মেট্রোপলিটন শহরে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রেও বিশেষ সহযোগিতা সমন্বয় করছে শিল্প পুলিশ।
বিজিএমইএ সহসভাপতি ফেরদৌস পারভেজ বিভন বলেন, বিজিএমইএর সমন্বয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত ৩০ জন বিদেশী ক্রেতাকে বিশেষ নিরাপত্তা সেবা দেয়া হয়েছে। এছাড়া লিয়াজোঁ ও বায়িং মিলিয়ে দুই শতাধিক কার্যালয়ে বিশেষ নিরাপত্তা নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৭ বিদেশী নাগরিকসহ মোট ২০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নয়জনই ছিলেন ইতালির নাগরিক। তারা পোশাক খাতের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত নয় ইতালীয়র একজন হলেন ক্রিশ্চিয়ান রোসি। তৈরি পোশাক খাতের কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। তার সহকর্মী মারকো তোনডাটও নিহত হয়েছেন ওই হামলায়। হামলায় নিহতদের আরেকজন হলেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্টুডিও টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাদিয়া বেনেদিত্তো।
এ ঘটনায় তার সঙ্গে মারা গেছেন বন্ধু আডেলে পুগলিসি, যিনি আরেকটি পোশাকের বায়িং হাউজের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক। ওইদিন নিহত ক্লদিও চাপেলিও যুক্ত ছিলেন পোশাক বাণিজ্যের সঙ্গে। হত্যাকাণ্ডের শিকার মারিয়া রিবোলিও বাংলাদেশে একটি বায়িং হাউজ পরিচালনা করতেন।
গুলশান হামলার পর অনেক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধিদের পূর্বনির্ধারিত সফর পিছিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইতালির পিত্জা ইতালিয়া ও ভারতের মন্টি কার্লো। সফর বাতিল করেছে জাপানভিত্তিক ইউনিক্লো। নিরাপত্তা জোরদার করতে পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৪০-৫০টি কার্যালয়ের তালিকাও দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ খাতের বিদেশী ক্রেতাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরার ব্যবস্থা করেছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে কার্যালয় রয়েছে, এমন একাধিক পোশাক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিশেষ নিরাপত্তা সেবার বিষয়ে কেউই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও বাড়তি সতর্কতার নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তারা।
জানতে চাইলে পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শিল্পাঞ্চলে খুব বেশি বিদেশী কাজ করেন না। তার পরও নিরাপত্তা জোরদারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলায় বিদেশী হত্যার প্রেক্ষাপটে ক্রেতাদের বিমানবন্দরে আসার পর থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা সেবা দেয়া হচ্ছে। অনেকে এ সেবা নিশ্চিত করেই বাংলাদেশে আসছেন।