বিএনপির সংস্কারপন্থীরা নির্বাচন শেষে উধাও

তারিকুল ইসলামঃ একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে ফেরেন সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েক নেতা। সে সময় অনেকটা তড়িঘড়ি করে তাদের দলে যোগদান করানো হয়। এদের মধ্যে ৯ জন দলীয় মনোনয়নও পান। কিন্তু নির্বাচন শেষে দু’চারজন ছাড়া সংস্কারপন্থীদের বেশির ভাগ নেতাই উধাও। কোনো সভা কিংবা দলের কোনো কর্মসূচিতেও তাদের দেখা যায় না। এমনকি তাদের সঙ্গে এলাকার নেতাকর্মীদেরও যোগাযোগ নেই। সুদিন ভেবে দলে ফিরলেও এখন দুর্দিনে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। অবশ্য সংস্কারপন্থীদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলেন, পদ-পদবি ছাড়া কাজের ক্ষেত্র খুবই সীমিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, পদ-পদবি ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচি তেমন পালন করা যায় না। দলেও কোনো ভূমিকা রাখা যায় না। দলের মধ্যে এসব নেতার পরিচিতি নিশ্চিত করতে পারলে, দায়িত্ব দেয়া হলে তারা সহজে কাজ করতে পারবেন। তবে অনেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

সংস্কারপন্থী কয়েক নেতা জানান, দায়িত্বশীল পদ-পদবি ছাড়া সক্রিয়ভাবে কাজ করা কঠিন। ইচ্ছা করলেই কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। এলাকায় কাজ করতে গেলে কোন্দলের সৃষ্টি হতে পারে। পদ-পদবি না থাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও অংশ নেয়ার পরিস্থিতি থাকে না। নিজেদের সম্মান বাঁচানোর জন্যই এড়িয়ে চলতে হয়।

ওয়ান-ইলেভেনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ২৫ জুন বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দলের অভ্যন্তরে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব দেন। তার ওই প্রস্তাবকে দলের ১২৭ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপি সমর্থন দেন। যারা সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেফতারের আগে সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন, দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে বহিষ্কার করেন। তবে দলের পঞ্চম ও সর্বশেষ ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে সংস্কারপন্থী নেতাদের অনেককে পদ-পদবি দেয়া হলেও একটি অংশকে দলের বাইরে রাখা হয়।

অন্য কোনো দলে যোগ না দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি হাইকমান্ডের ওপর আস্থা রেখেছেন- এমন ১৪ জন সংস্কারপন্থী নেতাকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলে সক্রিয় করা হয়। গত বছরের ২৫ অক্টোবর তাদের গুলশান কার্যালয়ে ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলে কাজ করার জন্য নির্দেশ দেন হাইকমান্ড।

এসব নেতার মধ্যে ছিলেন- জয়পুরহাটের সাবেক এমপি আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান, নওগাঁর সাবেক এমপি আলমগীর কবীর, নরসিংদীর সাবেক এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, বগুড়ার সাবেক এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (জিএম সিরাজ), সাবেক এমপি ডা. জিয়াউল হক মোল্লা, গাইবান্ধার সাবেক এমপি শামীম কায়সার লিংকন, সুনামগঞ্জের সাবেক এমপি নজির হোসেন, নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি আতাউর রহমান আঙ্গুর, রাজশাহীর সাবেক এমপি আবু হেনা, পটুয়াখালীর সাবেক এমপি শহীদুল আলম তালুকদার, বরগুনার সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম মনি, ঝালকাঠির সাবেক এমপি ইলেন ভুট্টো, বরিশালের সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন, যশোরের মফিকুল হাসান তৃপ্তি (বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়) এবং সাবেক হুইপ পিরোজপুরের সৈয়দ শহীদুল হক জামাল। এদের মধ্যে আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান (জয়পুরহাট-২), আলমগীর কবীর (নওগাঁ-৬), সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল (নরসিংদী-৪), জিএম সিরাজ (বগুড়া-৫), নজির হোসেন (সুনামগঞ্জ-১), আবু হেনা (রাজশাহী-৪), শহীদুল আলম তালুকদারের স্ত্রী সালমা আলম (পটুয়াখালী-২), জহিরউদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে (যশোর-১) দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। নুরুল ইসলাম মনিকে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য করা হয়।

সূত্র জানায়, নির্বাচনের পর থেকে দলে ফিরিয়ে আনা সংস্কারপন্থীদের বেশির ভাগ নেতা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নেই। মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের মধ্যে জহিরউদ্দিন স্বপনকে দলের প্রতিটি কার্যক্রমে দেখা যায়। নিজ নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের নামে মামলা পরিচালনা থেকে শুরু করে নির্যাতিত নেতাকর্মীদেরও সহযোগিতা করছেন। একইভাবে কেন্দ্রের ও নিজের নির্বাচনী এলাকায় দলীয় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকছেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এর বাইরে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, নজির হোসেনও নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করছেন।

তবে মনোনয়ন পাওয়া অন্যরা একেবারেই নিষ্ক্রিয়। কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও তারা থাকছেন না। নিজেদের নির্বাচনী এলাকার মামলা-হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের সহযোগিতাও করছে না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তার সুচিকিৎসার দাবিতে দলটির চলমান আন্দোলনেও এসব নেতার কোনো সরব ভূমিকা নেই। এলাকার রাজনীতি থেকেও দূরে সরে আছেন তারা।

পটুয়াখালী-২ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদফতর সম্পাদক মুনীর হোসেন। তিনি বলেন, এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে সব সময় আমার যোগাযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে দলে ফিরিয়ে আনা হয় শহীদুল আলম তালুকদারকে। পরে আমার আসন থেকে তার স্ত্রী সালমা আলমকে দল মনোনয়ন দেয়। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার পক্ষে এলাকায় কাজ করেছি। কিন্তু নির্বাচন শেষে তারা ঢাকায় চলে গেছেন। তাদের সঙ্গে এলাকার নেতাকর্মীদের যোগাযোগ নেই। কয়েকদিন আগে জেলার নির্বাহী কমিটির বৈঠকেও ছিলাম। নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখে সব সময় তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কারপন্থী এক নেতা বলেন, এক যুগ সময়ের ব্যবধানে দলের নেতৃত্বের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাদের অনেক কর্মী এখন নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে। অন্যদিকে তার কোনো পদ-পদবিই নেই। এ অবস্থায় কাজ করাটা জটিল। তবে বিএনপির আদর্শের রাজনীতিতে তারা সক্রিয় রয়েছেন। সময়-সুযোগ এলে এবং দল থেকে কোনো দায়িত্ব দেয়া হলে আমরা তা পালন করব।

তবে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, যার কাজ করার ইচ্ছা থাকে তাকে কোনোভাবেই আটকিয়ে রাখা যায় না। তাকে কেউ আটকাবেও না। তিনি বলেন, তিনি নিজেও ১০ বছরের বেশি সময় দলের বাইরে ছিলেন। এখন দলে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এলাকায় কাজও করছি। কেউ তাকে কোনো বাধা দেয় না। দলের জন্য কাজ করতে শুধু পদ-পদবিই অপরিহার্য বলে আমি মনে করি না।

এদিকে সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে আনাকে দলে থাকা কট্টরপন্থী নেতারা ভালো চোখে দেখেননি। তারা এখন সংস্কারপন্থীদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন। কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত বিএনপির এক কেন্ত্রীয় নেতা বলেন, সংস্কারপন্থীরা সুবিধাবাদী। যা হাইকমান্ডকে আমরা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের কথাই প্রমাণ হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, এখনও সংস্কারপন্থী বেশ কয়েকজন নেতা বিএনপির বাইরে রয়েছেন। দলে কট্টরপন্থীদের বাধার কারণে এক সময়ের হেভিওয়েট এসব নেতাকে দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেডএ খান, মোফাজ্জল করিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাহ মো. আবুল হোসাইন, সাবেক এমপি এসএ সুলতান টিটু, সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শাহিদুজ্জামানসহ আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। এর মধ্যে এসএ সুলতান টিটুকে শিগগিরই দলে ফেরানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।-যুগান্তর